ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

পুঁজিবাদী ক্ষমতায়নের বিরুদ্ধ কণ্ঠস্বর

পুঁজিবাদী ক্ষমতায়নের বিরুদ্ধ কণ্ঠস্বর
×
×

ছবি-সংগৃহীত

আবু সাঈদ তুলু

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১৩:৪৪ | আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১৩:৫০

রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ অত্যন্ত বহুল পঠিত একটি নাটক। বাংলাদেশের মঞ্চে রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’র অসংখ্য প্রযোজনা হয়েছে। প্রযোজনাগুলোয় নাটকটির নানা ব্যাখ্যা উপস্থাপিত হয়েছে। সম্প্রতি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রামা অ্যান্ড থিয়েটার ফোরাম নতুন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে নাটকটি মঞ্চে উপস্থাপন করেছে। যন্ত্র সভ্যতার বিপরীতে প্রাণশক্তির জয়গানমূলক প্রচলিত ব্যাখ্যার বাইরে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নাটকে পুঁজিবাদী ক্ষমতা ও শোষণের বিরুদ্ধে বিপ্লবের জাগরণকে প্রধান করে তুলেছে। নাটকটির নির্দেশনায় ছিলেন শ্রেয়শ্রী সরকার। ১৪ অক্টোবর ঢাকার শিল্পকলা একাডেমিতে নাটকটির প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। নান্দনিক দৃশ্যকল্প, বৈচিত্র্যপূর্ণ চলনবিন্যাস, আলোর মায়া, প্রতীকী উপকরণ ও বিশ্বাসযোগ্য অভিনয়ে নাটকটির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠেন উপস্থিত দর্শক।    

১৩৩১ বঙ্গাব্দে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ নাটকটি প্রকাশিত হয়েছিল। প্রথমে নাটকের নাম ছিল ‘যক্ষপুরী’। পরে নাম পাল্টে রাখা হয় ‘নন্দিনীর পালা’। ছাপার আগে চূড়ান্ত নাম দেওয়া হয় ‘রক্তকরবী’। রবীন্দ্রনাথের এ নাটকটি একটু ব্যতিক্রমী। গীতিনাট্য-কাব্যনাট্য ধারার আঙ্গিকের ছাপ কাটিয়ে এ নাটকটি প্রথা বিরোধিতার কথা বলে। যখন বিশ্বব্যাপী যান্ত্রিক সভ্যতায় অস্থির, ঠিক তখনই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ নাটকটি যান্ত্রিকতার বিপরীতে মানুষের প্রাণের কথা-আত্মার আনন্দের কথা ঘোষণা করেছেন। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি একমাত্র এ নাটকটিই রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় শান্তিনিকেতনে মঞ্চস্থ হতে পারেনি। সে নিয়ে প্রচণ্ড খেদ ছিল রবীন্দ্রনাথের মনে। সে সময় এ নাটককে ‘উচ্চাঙ্গ’, ‘দুর্বোধ্য’, ‘তত্ত্বনাটক’, ‘অবোধ্য’ ইত্যাদি বলে সবাই পরিত্যাগ করেছিল। 

রবীন্দ্রনাথের প্রত্যাশা ছিল শিলংয়ের জিৎভূমিতে বসে লেখা; যার চরিত্রকে ভিত্তি করে নন্দিনী চরিত্রের চঞ্চলতা ও প্রাণোচ্ছ্বল নির্মাণ করছেন– সেই শ্রীমতি রানু মুখোপাধ্যায় অভিনয় করবেন। তা আর হয়ে ওঠেনি। বিশ্বভারতীতে শিশির ভাদুড়িকে দায়িত্ব দিয়েও নাটকটি মঞ্চায়ন সম্ভব হয়নি। পরে ‘দ্য টেগোর গ্রুপ’ প্রথমবারের মতো অভিনয়ের চেষ্টা করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণের পর ১৯৪৭ সালে দেবব্রত বিশ্বাস কলকাতায় প্রথম নাটকটি মঞ্চায়ন করেন। এতে রাজার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শম্ভু মিত্র। সেই শম্ভু মিত্রের পরিচালনায় কলকাতার বহুরূপী নাট্যদল নাটকটি ১৯৫৪ সালে মঞ্চে নিয়ে আসে। পরে তারা অডিও সিডি প্রকাশ করে। কলকাতায় বাদল সরকারও ভিন্ন আঙ্গিকে ‘রক্তকরবী’ প্রযোজনা করেছিলেন। বাংলাদেশে ড্রামা সার্কেল, বাংলা একাডেমি থেকে শুরু করে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, চট্টগ্রামের তির্যক, প্রাঙ্গণেমোর, নাগরিক নাট্যাঙ্গনসহ অসংখ্য দল মঞ্চ প্রযোজনা করেছে। বর্তমানে ঢাকার মঞ্চে তিনটি নাট্যদল নিয়মিত এ নাটকটি মঞ্চায়ন করে যাচ্ছে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এ নাটকটি নির্মাণ করেছে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে, ভিন্ন সম্পাদনায়। রবীন্দ্রনাথের রচিত নাটকটি শুরু হয়েছে কিশোরের সংলাপে, নন্দিনীর সঙ্গে দেখার মধ্য দিয়ে। কিন্তু ব্র্যাকের এ নাটকটি সম্পাদিত হয়ে পরিবেশকে প্রধান করে শোষক, ক্ষমতা ও মুক্তির লড়াই বিশ্বকে কেন্দ্র করে।  নান্দনিকবোধে অনেকটা মার্কসবাদী শিল্পদৃষ্টি। যেখানে রাজা পুঁজিবাদী শোষকের প্রতীক, সর্দার সামন্তশ্রেণি আর নন্দিনী মুক্তির প্রতীক। যক্ষপুরী আধুনিককালের দাসত্বের ঘেরাটোপ। নির্দেশক শ্রেয়শ্রী সরকার অদৃশ্য ক্ষমতার কাঠামো, শোষণ-নিপীড়ন, ভোগবাদ ও ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার ভেতর দিয়ে যেন সমকালীন বাংলাদেশের সমাজ-বাস্তবতাকে দেখাতে চেয়েছেন।
এ নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র নন্দিনী। অন্ধকারের ভেতরে জীবনের আলো। প্রাণহীন শোষিত মানুষের মুক্তির প্রতীক। তাই তো অধ্যাপক বলেন, ‘সকালে ফুলের বনে যে আলো আসে তাতে বিস্ময় নেই, কিন্তু পাকা দেয়ালের ফাটল দিয়ে যে আলো আসে সে আরেক কথা। যক্ষপুরে তুমি সেই আচমকা আলো।’ নন্দিনী ভয়ডরহীন। পৌষের ডাকের মতো নন্দিনী রাজাকেও অন্ধকার গহ্বর থেকে বের করতে চায়। কিন্তু রাজা কি যাবে? সে তো ভয়ংকর রূপেই থাকতে চায়। কারণ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে গেলে আড়ালে থাকতে হয়, ভয়ংকর থাকতে হয়।  অন্যদিকে ফাগুলাল ও তার স্ত্রী চন্দ্রা সবাই মদ্যপ। রাজার ঘানি টানা ছাড়া তাদের আর কোনো কাজ নেই আর বিশু পাগল সবাইকে গান শোনায়। যক্ষপুরীতে ঢুকলে সবার হাঁ বন্ধ হয়ে যায়, তখন জঠরের মধ্যে যাওয়ার একটি পথ ছাড়া আর পথ নেই। এখানে মানুষের পরিচয় মানুষ নয়, মানুষ মানেই সংখ্যা। ‘তিনশ একুশ-ঙ’ পাড়ার মোড়ল। শোষক ও শোষিতের দ্বান্দ্বিক বাস্তবতাই যেন এখানে প্রবল।

নন্দিনীর মানবিক আলোড়নে বিপ্লব ঘটে যায় যক্ষপুরীতে। একসময় বন্দিশালাকে ভাঙতে এগিয়ে আসে ফাগুলাল, বিশু, চন্দ্রা, গোকুলসহ খোদকদল সবাই। রাজাও উপলব্ধি করেন এ আমাদেরই তৈরি করা শৃঙ্খল। রাজা বলে উঠেন ‘তোমাতে আমাতে দুজনে মিলে কাজ করতে হবে। একলা তোমার কাজ নয়।’ তখন পুঁজি সমাজ-সভ্যতা, ঘেরাটোপ যেন ভাঙতে শুরু করে। সংগীতে ছিলেন রবিউল ইসলাম শশী, পোশাক পরিকল্পনায় সাদিয়া নিশা, সহকারী নির্দেশনায় জেরিন চাকমা। অভিনয় করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থী–নাফিসা জান্নাত, প্রজ্ঞা পারমিতা সাহা, তরিকুল আলম জীম, শুভ জ্যোতি চক্রচর্তী, পূর্ণিমা দাস প্রীতি, সাফওয়ান ফাদলুল্লাহ, মো. তামজিদ ইসলাম, রওনক জামান লামিয়া, আসফিয়া হক, সাবরিনা বিনতে জাফর, নিশাত তাসনিম ফারিহা, তাজবীদ মুহতাসিম, মো. তামজীদ ইসলাম, দিহান চৌধুরী প্রমুখ। নৃত্য, গীত, বাদ্য, অভিনয়ে অনবদ্য এক নাট্য প্রযোজনা। 

আরও পড়ুন

×