ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

‘চরিত্রের ভেতর নিজেকে খুঁজি’

‘চরিত্রের ভেতর নিজেকে খুঁজি’
×
×

নাজিফা তুষি

এমদাদুল হক মিলটন

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:০১

| প্রিন্ট সংস্করণ

আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার, ওটিটিতে পুরোনো সিনেমার নতুন যাত্রা, আর মুক্তির অপেক্ষায় একাধিক কাজ–সব মিলিয়ে সময়টা নাজিফা তুষির জন্য বিশেষ। তবে সাফল্যের হিসাব কষে নয়, চরিত্রের প্রতি ভালোবাসা আর নিজের কাজটুকু ঠিকঠাক করার তাগিদেই এগিয়ে যেতে চান এই অভিনেত্রী। লিখেছেন এমদাদুল হক মিলটন

এক দশক আগে বড়পর্দায় যাত্রা শুরু করেছিলেন তুষি। তখন তাঁর সামনে ছিল অভিনয়ের নতুন জগৎ, অচেনা অভিজ্ঞতা আর নিজেকে আবিষ্কারের সুযোগ। সেই যাত্রার প্রথম সিনেমা ‘আইসক্রিম’ মুক্তির দশ বছর পর জায়গা করে নিয়েছে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকিতে। এর মধ্যে বদলেছে সময়, বদলেছে তুষির অভিনয়ের পরিসরও। ‘হাওয়া’ দিয়ে দর্শকের ব্যাপক মনোযোগ পাওয়া এই অভিনেত্রী এখন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কারজয়ী শিল্পী। সামনে রয়েছে নতুন সিনেমা ‘আন্ধার’ ও ওয়েব সিরিজ ‘অ্যানি’। পাশাপাশি ঈদে মুক্তি পাওয়া ‘প্রেশার কুকার’ও এসেছে ওটিটিতে। কাজ শেষ করেছেন এন রাশেদ চৌধুরীর ‘সখী রঙ্গমালা’ নামে সাহিত্যনির্ভর একটি সিনেমার। সব মিলিয়ে তাঁর ক্যারিয়ারে এখন পুরোনো কাজ ফিরে দেখার সময় যেমন এসেছে, তেমনি সামনে এগিয়ে যাওয়ারও নানা উপলক্ষ তৈরি হয়েছে।

পুরোনো কাজ, নতুন সময়
২০১৬ সালের ২৯ এপ্রিল প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিল নির্মাতা রেদওয়ান রনির ‘আইসক্রিম’। এই সিনেমার মধ্য দিয়ে বড়পর্দায় অভিষেক হয় তুষির। এক দশক পর সিনেমাটি চরকিতে মুক্তি পাওয়ায় নতুন করে দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। ক্যারিয়ারের সাম্প্রতিক অধ্যায়ে গুরুত্ব পাচ্ছে নতুন চরিত্র, ভিন্নধর্মী গল্প এবং অভিনয়ের নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। প্রথম সিনেমা থেকে শুরু করে পরবর্তী কাজগুলোতে তাঁর পথচলা দেখলে বোঝা যায়, পর্দায় উপস্থিতির চেয়ে চরিত্রের ভেতরে নিজেকে কতটা মেলে ধরা যায়, সেই চেষ্টাই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ‘হাওয়া’ সিনেমায় গুলতি চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক পরিচিতি পান তুষি। এরপর কাজের সংখ্যা বাড়িয়ে ফেলার বদলে বেছে বেছে চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনীত কাজের তালিকায় যেমন রয়েছে দর্শকপ্রিয় সিনেমা, তেমনি রয়েছে প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে নির্মিত গল্পও। এই বেছে চলার মানসিকতা তাঁকে একেকটি কাজে ভিন্নভাবে হাজির হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

‘রইদ’-এ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
তুষির সাম্প্রতিক অর্জনের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মেজবাউর রহমান সুমন পরিচালিত ‘রইদ’ সিনেমার জন্য আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পাওয়া। কানাডার মোজাইক ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের দ্বাদশ আসরে সিনেমাটি মোট তিনটি বিভাগে পুরস্কার জেতে। ‘রইদ’-এ ‘সাদুর বউ’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন তুষি। গ্রামীণ প্রেক্ষাপট, সম্পর্কের জটিলতা এবং রহস্যময় আবহে নির্মিত সিনেমাটিতে তাঁর চরিত্রটি ছিল প্রচলিত নায়িকাসুলভ উপস্থিতির চেয়ে আলাদা। চরিত্রটির অনুভূতি, জীবনযাপন ও অন্তর্গত টানাপোড়েন পর্দায় ফুটিয়ে তোলার মধ্য দিয়ে অভিনয়ের আরেকটি দিক সামনে এনেছেন তিনি। আন্তর্জাতিক উৎসবে এই স্বীকৃতি তুষির ব্যক্তিগত অর্জন হলেও এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পুরো সিনেমার কলাকুশলীদের শ্রম। পুরস্কারটি তাঁর কাজের আন্তর্জাতিক পরিচিতি বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের সিনেমার প্রতিও মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। আসছে অস্কারের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বিভাগে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন হিসেবেও পাঠানো হয়েছে সিনেমাটি।
‘রইদ’-এর জন্য আন্তর্জাতিক উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পাওয়াকে আনন্দের ও অনুপ্রেরণার বলে মনে করেন তুষি। তাঁর ভাষ্য, পুরস্কারের প্রত্যাশা নিয়ে কখনও কাজ করিনি; বরং চরিত্রটি যথাযথভাবে পর্দায় তুলে ধরা আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অভিনয়ের মাধ্যমে সেই চরিত্র দর্শক ও বিচারকদের স্বীকৃতি পেলে তা বাড়তি আনন্দ যোগ করে। এই অর্জন অভিনেত্রী হিসেবে তাঁর দায়বদ্ধতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলেও মনে করেন তুষি। তাঁর প্রত্যাশা, অভিনয়ের এই সুন্দর সময় ও কাজের স্বীকৃতির ধারাবাহিকতা সামনেও অব্যাহত থাকবে। 

‘প্রেশার কুকার’, ‘অ্যানি’ ও ‘আন্ধার’ 
চলতি বছরের ঈদুল ফিতরে মুক্তি পাওয়া রায়হান রাফীর ‘প্রেশার কুকার’ও এখন দর্শক দেখতে পারবেন ঘরে বসে। ঢাকার নাগরিক জীবনের চাপ, সামাজিক দ্বন্দ্ব এবং নারীর ব্যক্তিগত সংগ্রাম নিয়ে নির্মিত সিনেমাটিতে চার নারীর জীবনকে পাশাপাশি তুলে ধরা হয়েছে।
অন্যদিকে, ‘রেহানা মরিয়ম নূর’খ্যাত নির্মাতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের মিনি সিরিজ ‘অ্যানি’তে দেখা যাবে তুষিকে ভিন্ন এক পরিস্থিতিতে। ডিস্টোপিয়ান গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র অ্যানি একজন নার্স, যিনি পাঁচ ভাইবোনকে মানুষ করার সংগ্রাম করেন। রহস্যময় এক রোগের বিস্তারে পুরুষদের মধ্যে নারীদের প্রতি ঘৃণা ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হন তিনি। 
জার্মানির কোলনে সেরিয়েনক্যাম্প ফেস্টিভ্যালের ‘উইমেন ইন সিরিজ’ বিভাগে সিরিজটির বিশ্ব প্রিমিয়ার হয়েছে। এবার বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য আইস্ক্রিনে মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে এটি। 
তুষির আগামীর কাজের তালিকায় রয়েছে রায়হান রাফী পরিচালিত ‘আন্ধার’। সিনেমাটি এখন মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এতে ‘নদী’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। নিজের অভিনীত চরিত্রটি নিয়ে আগে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তুষি জানিয়েছিলেন, এটি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় চরিত্রগুলোর একটি। চরিত্রটির মধ্য দিয়ে নানা ধরনের আবেগ নিয়ে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সিনেমাটি নিয়ে প্রত্যাশার কথা জানিয়ে তুষি আরও বলেন, ‘প্রতিটি সিনেমা যখন করি, তখন ভালো লাগা নিয়ে করি। শুটিংয়ের পর সব সিনেমার প্রতিই ভালোলাগা, ভালোবাসা থাকে। তাই কোনো সিনেমা নিয়ে আমি চিন্তিত নই; বরং ফুরফুরে মেজাজে থাকি। আমি আমার কাজটি যথাযথভাবে করার চেষ্টা করি। তারপরে তা ছেড়ে দিই দর্শক-শ্রোতার ওপর। তারা ভালো লাগলে দেখবেন, খারাপ লাগলে সেটি নিয়ে কথা বলবেন। সিনেমাটি নিয়ে আমি বেশ আশাবাদী’। 

সাফল্যের চেয়ে কাজের আনন্দ
তুষির ক্যারিয়ারে জনপ্রিয়তা এসেছে, এসেছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও। তবে তাঁর সাম্প্রতিক কাজগুলোতে চোখ রাখলে দেখা যায়, পরিচিতির বৃত্তে আটকে থাকার বদলে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে নিজেকে পরীক্ষা করার চেষ্টা করছেন তিনি। কখনও গ্রামীণ জীবনের রহস্যময় এক নারী, কখনও নাগরিক জীবনের চাপে থাকা মানুষ, আবার কখনও সহিংস ভবিষ্যতের মুখোমুখি এক নার্স–চরিত্রের এই বৈচিত্র্য তাঁর অভিনয়যাত্রাকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। প্রথম সিনেমার ওটিটি মুক্তি থেকে আন্তর্জাতিক পুরস্কার, ‘ প্রেশার কুকার’-এর নতুন দর্শকপ্রাপ্তি থেকে ‘আন্ধার’, ‘অ্যানি’ ‘সখী রঙ্গমালার’ জন্য অপেক্ষা–সবকিছুর মধ্যে রয়েছে তাঁর কাজের বিস্তৃত পরিসর। তবে সাফল্যের পরবর্তী ধাপ নিয়ে বড় কোনো ঘোষণা বা হিসাবের বদলে তুষির মনোযোগ নিজের কাজের দিকে। 
দর্শক তাঁর অভিনয় পছন্দ করছেন–এটিই তাঁর কাছে বড় পাওয়া। তিনি বলেন, ‘চরিত্রের ভেতর নিজেকে খুঁজি। আগামীতে আরও নানান ধরনের চরিত্রে কাজ করতে চাই।’ 

আরও পড়ুন

×