ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ট্রাম্পের বাড়াবাড়ির অভিযান

ট্রাম্পের বাড়াবাড়ির অভিযান
×

ছাবেদ সাথী 

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৫ | ০৭:৫৯

ক্যালিফোর্নিয়ার ম্যাকআর্থার পার্ক থেকে সোমবার যেসব পরিবার পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল, তাদের কাছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সর্বশেষ আইসিই (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) অভিযানটি সামরিক আগ্রাসনের মতোই মনে হয়েছে। এই অভিযান পরিচালনায় ছিল ৯টি ফেডারেল সংস্থা, ন্যাশনাল গার্ড, স্থানীয় পুলিশ এবং এক ডজনের বেশি সাঁজোয়া সামরিক যান। এমন অভিযান লস অ্যাঞ্জেলেসের শান্তিপূর্ণ পার্কে একেবারেই বেমানান।

অভিযানে অংশ নেওয়া সংস্থাগুলো মনে করেছিল, তারা কোনো সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। ঘটনাস্থলের ছবিতে দেখা গেছে, ফেডারেল এজেন্টরা ক্যামোফ্লাজ যুদ্ধবাহিনীর পোশাকে সাঁজোয়া ট্রাক থেকে বেরিয়ে আসছে, আর হতবাক সাধারণ মানুষ ভয়ে তাকিয়ে আছে। আইসিই এমনকি অভিযানের একটি বাহারি, যুদ্ধধর্মী নামও দিয়েছে: ‘অপারেশন এক্সক্যালিবার’।

ম্যাকআর্থার পার্ক থেকে পাওয়া এই আতঙ্ক-জাগানিয়া চিত্র আমেরিকান জনগণের কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে এসেছে। ক্রমবর্ধমান মানুষ, এমনকি অনেক রিপাবলিকান ভোটারও এখন দেখতে পাচ্ছেন ট্রাম্পের অভিযান আকারে যেমন বিশাল, তেমনি আগ্রাসী ও ব্যয়বহুল, অথচ বাস্তবে খুব একটা নির্বাসন ঘটছে না।

মে মাসের আগেও বেশির ভাগ আমেরিকান আইসিই সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা রাখতেন। এখন এ সংস্থা মনে করিয়ে দেয় কালো গাড়ি, মুখোশধারীদের দল এবং ‘অলিগেটর আলকাট্রাজ’-এর দৃশ্য। এজেন্টরা নিজেদের পরিচয় দিতে অস্বীকৃতি জানায়, আর মাগা (মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন) আন্দোলন তাকে উৎসাহিত করে। এর ফলে বহু আমেরিকানের চোখে আইসিই এখন ট্রাম্পের ‘ব্যক্তিগত গুন্ডাবাহিনী’। মানুষ জানে, ঠিক কার কারণে আইসিই এভাবে লাগামহীন হয়ে উঠেছে।

সাম্প্রতিক ছয়টি জনমত জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পের অভিবাসননীতির জনপ্রিয়তা ভেঙে পড়েছে। রিপাবলিকানদের ঐতিহ্যগত শক্তিশালী ইস্যুতে এখন ভোটারদের মধ্যে তারা ৩ পয়েন্ট পিছিয়ে। জনপ্রিয়তায় এমন পতন সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল ২০০৬ সালে, যখন ডেমোক্র্যাটরা এটি কাজে লাগিয়ে কংগ্রেসের উভয় কক্ষ দখল করে নেয়। ট্রাম্পের এই ভুল পদক্ষেপ যেন সেই ইতিহাসকেই পুনরাবৃত্তির পথে নিয়ে যাচ্ছে।

জুন ২৯-এ নিউইয়র্ক টাইমসকে ক্যার্ডিনাল রবার্ট ম্যাকএলরয় বলেন, ‘বেশির ভাগই পরিশ্রমী, সৎ মানুষদের দেশ থেকে বের করে দেওয়ার পদক্ষেপে বহু বিশপ এবং ধর্মীয় নেতা রীতিমতো ক্ষুব্ধ। বাস্তবতা দিন দিন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।’

অন্য রক্ষণশীলরাও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, এসব অভিযানে বহু নিরপরাধ মানুষও ধরপাকড়ের শিকার হচ্ছেন। ‘আর স্ট্রিট ইনস্টিটিউট’-এর স্টিভেন গ্রিনহাট ‘অরেঞ্জ কাউন্টি রেজিস্টার’-এ এক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘আইসিইর গ্রেপ্তারের ভুল মাত্রা সংবিধানসম্মত শাসনের প্রতি আগ্রহী যে কোনো মানুষের জন্য গভীরভাবে উদ্বেগজনক।’

এখন আইসিই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি অর্থায়নপ্রাপ্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, যার বাজেট পুরো কানাডার সামরিক বাজেটের সমান। লাখ লাখ আমেরিকান দেখছে, কীভাবে সংস্থাটি জবাবদিহিহীন হয়ে উঠেছে; শিশুদের সামার ক্যাম্পে সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে হামলা চালাতেও তারা দ্বিধা করে না। মানুষ এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, উদ্দেশ্য যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, এমন নিষ্ঠুর উপায় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এটা সেই অভিবাসন সংস্কার নয়, যা ভোটারদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল– যেখানে ‘গ্যাং সদস্য’ আর ‘কঠোর অপরাধী’দের লক্ষ্য করার কথা। বরং তারা এখন দেখছে, বড় বড় শহরের রাস্তায় সামরিক বাহিনী ও যুদ্ধযান যেন নিত্যদিনের দৃশ্য। মুখোশধারী আইসিই এজেন্টদের দেখে সাধারণ মানুষ এখন আগের চেয়ে কম নিরাপদ বোধ করছে। তারা একের পর এক জনমত জরিপে জানিয়ে যাচ্ছে, তারা আর এই ভুল করতে চায় না।

যেসব ভোটার ট্রাম্পের অভিবাসন সম্পর্কিত প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে প্রতারিত বোধ করছে, তাদের এই প্রতিবাদ-প্রবৃত্তিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এখনই সময় আমেরিকার জনগণ যেন তাদের বিবেককে রাজনৈতিক কর্মে পরিণত করে এবং দাবি তোলে– আইসিইর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক 

আরও পড়ুন

×