অন্যদৃষ্টি
বিভেদ নয়, মুক্তিযোদ্ধাদের ঐক্য চাই
প্রতীকী ছবি
এসকে মজিদ মুকুল
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৫ | ১০:২৪
সম্প্রতি বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের কার্যক্রম পরিচালনা ও নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) ১১ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেছে। সেই কমিটির আহ্বায়ক মনোনীত হয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা নঈম জাহাঙ্গীর। তবে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইসতিয়াক আজিজ উলফাত অভিযোগ করেছেন, এ আহ্বায়ক কমিটির দু’চারজন বাদে অধিকাংশই আওয়ামী লীগের দোসর। ১ জুলাই রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ তোলেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে কিছুসংখ্যক মানুষের কারণে দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি বৈষম্য ও অবিচার করা হচ্ছে বলে উত্থাপিত অভিযোগে বলেছেন ইসতিয়াক উলফাত।
জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি সম্ভবত আবেগবশত আরও বলেছেন, বিএনপি করলে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ করা যাবে না– এমন বিধান না থাকলেও যেভাবে বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সদস্য ও কমিটি করা হচ্ছে, তাতে এমনই প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে যদি এমনটা করা হয়, তাহলে অন্যদের বেলায় কী ঘটতে পারে, অনুমান করা যায়। তবে বিগত সরকার দলীয় বিবেচনায় অমুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদকে যেভাবে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার আখড়ায় পরিণত করেছিল, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় যে সেই আখড়া ভেঙে দিয়েছে, তা নিয়ে উলফাত সংবাদ সম্মেলনে কিছু বলেননি।
সত্য– দলীয় বিবেচনার কারণে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে এখনও যারা মুক্তিযোদ্ধা হতে পারেননি, তাদের বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জামুকার ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ থাকছেই। একজন মুক্তিযোদ্ধা বঞ্চিত হলেও সংস্থাকে জবাবদিহি করতে হবে। কিন্তু এটাও সত্য, লাখো মানুষের জীবনদান ও লাখো মা-বোনের সীমাহীন ত্যাগের বিনিময়ে এ ভূখণ্ড স্বাধীন হলেও ৫৪ বছরেও অর্জিত হয়নি মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত লক্ষ্যের শোষণমুক্ত সমাজ। এমনকি সাম্য, ন্যায়বিচার, মৌলিক অধিকারসহ মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাইনবোর্ডে ‘দেশ ও জনগণের অতন্দ্র প্রহরী বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ’ লিখলেও দেশ ও জনগণের অতন্দ্র প্রহরী হতে পারেনি তারা। সরকার পতনের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসনের পতন হলেও স্বৈরাচারী ব্যবস্থা বহাল।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতাসীন এক বছরও হয়নি; তারা দেশ পরিচালনা করছে এবং সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। এ অবস্থায় জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের অভিযোগ সত্য হলে তা আসলে স্বৈরাচারের রেখে যাওয়া ব্যবস্থা ও আমলাদের এক প্রকার ষড়যন্ত্রেরই ফসল। তবে বিভেদ করে নয়, মুক্তিযোদ্ধাদের ঐক্য গড়ে তুলে এবং সেই ঐক্যকে গণতন্ত্রকামী প্রগতিশীল সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যে পরিণত করে গণমানুষের কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে। প্রমাণ করতে হবে– ‘দেশ ও জনগণের অতন্দ্র প্রহরী বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ’।
দেশটি মুক্তিযুদ্ধের ফসল। কিন্তু ভারতের পাশাপাশি সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় পরিচালিত বৃহৎ শক্তিগুলোর আধিপত্য বিস্তারের তৎপরতা এখনও বিদ্যমান। এ সুযোগে তাদের তাঁবেদার সাইনবোর্ডধারী ব্যবসায়ী রাজনীতিক ও জ্ঞানপাপীরা মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পাশাপাশি একাত্তরকে চব্বিশের মুখোমুখি দাঁড় করানোর কৌশলী চেষ্টা চালাচ্ছে। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ও কৌশলী কার্যকলাপ রোধে মুক্তিযোদ্ধাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় কোনো রাজনৈতিক দলের পদবিধারী নেতা সংসদের নেতৃত্বে নেই। এটি একটি সুযোগ বিশেষত দলীয় আনুগত্যের বাইরে অবস্থানকারী মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য। এখন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের (অমুক্তিযোদ্ধা) আখড়ায় পরিণত করা যাবে না মুক্তিযোদ্ধা সংসদকে। বরং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশ্নবিদ্ধ করা দালাল নেতাদের চিহ্নিত করা সহজ হতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদকে দেশ ও জনগণের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে গড়ে তোলাই হবে এখন জাতীয় ঐক্যকামী সব মুক্তিযোদ্ধার দায়িত্ব।
এসকে মজিদ মুকুল, মুক্তিযোদ্ধা-সাংবাদিক
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
