কেষ্টা বেটাই চোর
এ, এস, এম সাইফুল্লাহ
প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:২৭ | আপডেট: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:৩২
আমরা প্রতিনিয়ত দেখে থাকি, ক্ষমতায় থাকা লোকজন তাদের কাজে যে কোনো ব্যর্থতার দায় নিতে রাজি নন। রাষ্ট্রের কোথাও আগুন লেগেছে; কোথাও হানাহানিতে প্রাণহানি ঘটেছে; সঙ্গে সঙ্গে বলে দেবে– এটা বিরোধী পক্ষের কারসাজি, স্যাবোটাজ ইত্যাদি। রাষ্ট্রের বড় বড় আলোচিত হত্যা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটার পর আমরা দেখি মুহূর্তেই এর জন্য দায়ীরা শনাক্ত হয়ে যাচ্ছে। তবে এ-সংক্রান্ত তথ্য-প্রমাণ দেখানোর কোনো দায় নেই। কোনো কিছু জানা কিংবা বুঝে ওঠার আগেই প্রতিপক্ষের ওপর দোষ চাপিয়ে নিজেদের কোনো রকম দায়িত্বকে ঝেড়ে ফেলে দিতে পারলেই যেন মুক্তি। বহুতল ভবন ধসে পড়ল; চেয়ারে বসা লোকজনের কথা হলো– চেয়ারের বাইরে দাঁড়ানো লোকেরা ভবনের পিলার ধরে জোরে ধাক্কা দেওয়ায় ভবনটি ধসে গেছে। অতএব, ওদের গ্রেপ্তার করে উত্তম-মধ্যম দিলেই আসল ঘটনা বেরিয়ে আসবে।
বাংলায় আমরা ‘যত দোষ নন্দ ঘোষ’ প্রবাদটি অহরহ ব্যবহার করি। এর মানে, যে যা-ই করুক না কেন, দোষটা একজনের ঘাড়েই পড়ে। সে হলো প্রতিপক্ষ। কিংবা দুর্বল, মানে ক্ষমতার বাইরে যারা থাকে, তাদের ঘাড়েই দোষ চাপানো হয় বারবার। নিশ্চিত না হয়ে এ ধরনের দোষারোপ অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত অপরাধীকে পার পেতে সাহায্য করে। এভাবে অপরাধী পার পেয়ে যায় এবং নতুন নতুন অপরাধের জন্ম দেয়।
এই দোষারোপের মূলে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং গণতন্ত্রকে ক্ষুণ্ন করার মতো বিষয়, অস্থিরতা, তীব্র দলীয় দ্বন্দ্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক টানাপোড়েন বিরাট ভূমিকা রাখে। এই দোষারোপের পেছনে আছে বিরাট সামাজিক অবক্ষয়, যেখানে রাজনীতির মতভেদকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে দেখা হয়। একদিকে প্রতিটি প্রধান রাজনৈতিক দল সহিংসতা ও আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য একে অপরকে দোষারোপ করে; অন্যদিকে মানবাধিকার সংস্থা ও স্বাধীন বিশ্লেষকরা শাসন ব্যবস্থার পদ্ধতিগত ব্যর্থতা, দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক সহিংসতার গভীরে প্রোথিত সংস্কৃতিকে এ জন্য দায়ী করেন।
আমাদের যে আবহমান সামাজিক সম্প্রীতি ছিল, তা এখন তলানিতে। আমাদের অসহিষ্ণুতা এমন মাত্রায় পৌঁছেছে, এখন শুধু দোষারোপেই শেষ নয়। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ। ‘মবোক্রেসি’ শব্দ যেন ‘ডেমোক্রেসি’কে প্রতিস্থাপন করছে। ব্যক্তি আক্রোশও এখন দোষারোপ করে আক্রমণে গিয়ে ঠেকছে। এর ফলে কাউকে মেরে পুড়িয়ে ফেলা কিংবা কাউকে ঘরে বন্দি করে পুরো ঘর আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়ার মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটছে। সাংস্কৃতিক চর্চার প্রতিষ্ঠান থেকে গণমাধ্যম– সবই যেন অন্ধ সন্দেহ আর দোষারোপের ক্ষেত্র এবং আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত। হামলা, খুন, গুম হলেই নিশ্চিত না হয়ে কারও ওপর চাপিয়ে দেওয়ার এই সংস্কৃতি চলমান থাকলে বিচার ব্যবস্থা যেমন তার নিরপেক্ষতা হারাবে, তেমনি নির্বিচারে হানাহানি আরও বাড়বে। এর ফাঁকে ওত পেতে থাকা অপরাধীরা, বিশৃঙ্খলাকারীরা আরও তৎপর হবে তাদের অরাজক কর্মকাণ্ডে।
দোষারোপের সংস্কৃতিকে ধারণ করে যদি ‘কেষ্টা বেটা’ কিংবা ‘নন্দ ঘোষ’ বানানোর রাজনীতি চলতে থাকে, তাহলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা যেমন বাড়বে, তেমনি অর্থনৈতিক অবস্থা আরও নাজুক হবে; বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে। সব মিলিয়ে সাধারণ নাগরিকের জীবন আরও কঠিন করে তুলবে।
এমনিতেই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা; সরকারি নীতির অভাব; দুর্নীতি দেশটির অর্থনীতিকে দুর্বল করে রেখেছে। তার সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও দোষারোপের রাজনীতি থেকে সৃষ্ট সংঘাত চলমান থাকলে দেশ ও জাতি গভীর তিমিরে হারাবে। ঈপ্সিত উন্নয়ন অধরাই থেকে যাবে। তাই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নিছক প্রতিপক্ষকে ঘায়েলে করতে দোষারোপ নয় বরং প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত এবং বিচারের আওতায় আনতে হবে। অদৃশ্য ‘কেষ্টা বেটা’কে দোষ দেওয়া বন্ধ করতে হবে।
লেখক: অধ্যাপক, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
