রূপনগরে অগ্নিকাণ্ড
বস্তি কি 'জতুগৃহ' হয়েই থাকবে
--
প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২০ | ১৩:০৫
মহাভারতে পঞ্চপাণ্ডবকে পুড়িয়ে মারতে তৈরি করা হয়েছিল মরণফাঁদ জতুগৃহ। কিন্তু তাতে পঞ্চপাণ্ডবের ক্ষতি না হলেও আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছিল অসহায় দরিদ্র অনার্যরা। দরিদ্র বলে তাদের নিয়ে হা-হুতাশ হয়নি। বাংলাদেশের বস্তিগুলো যেন সেই জতুগৃহের বর্তমান সংস্করণ। বস্তিবাসীরা জতুগৃহের অসহায় বলি। বৃহস্পতিবার সমকালসহ অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, রাজধানীর রূপনগর আবাসিক এলাকায় বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে গেছে সহস্রাধিক ঘর। বুধবার সকালে লাগা এ আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে তিন ঘণ্টা লাগে; কিন্তু ততক্ষণে ছাই হয়ে গেছে স্বল্প আয়ের হাজারো মানুষের স্বপ্ন ও যৎসামান্য সম্বল। এই অগ্নিকাণ্ডের উৎস নিয়ে মতভিন্নতা রয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী কারও কারও বক্তব্য, অবৈধ গ্যাস সংযোগের কারণে আগুনের সূত্রপাত। অন্যদিকে রয়েছে উচ্ছেদ ষড়যন্ত্রের অভিযোগও। সরকারি জমিতে গড়ে ওঠা কয়েক হাজার ঘরের মালিক স্থানীয় প্রভাবশালী ও ক্ষমতাসীন দলের পরিচয়ধারীরা। তারাই ভাগবাটোয়ারা করে চালাচ্ছিলেন ওই বস্তি।
প্রতিবার বস্তিতে আগুন লাগার পর এর কারণ সম্পর্কে প্রশ্ন ওঠে। তদন্ত কমিটি গঠিত হয় বটে; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখে না। আর কখনও দেখলেও এর কোনো প্রতিকার হয় না। দেশে বস্তিবাসীর সংখ্যা বাড়ছে, যা আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। আমরা জানি- যারা বস্তিতে বসবাস করেন, তারা নূ্যনতম নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। অথচ প্রভাবশালীরা তাদের কাছ থেকে প্রতি মাসে ভাড়া আদায় করে নিজেরা ফুলেফেঁপে উঠছেন। বস্তিকেন্দ্রিক মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের খতিয়ানও কম দীর্ঘ নয়। মূলত নিম্ন আয়ের মানুষেরাই এসব বস্তিতে বসবাস করেন। এমন দুর্যোগ-দুর্বিপাকে যখন তাদের সব হারিয়ে যায়, তখন বেঁচে থাকার, জীবনযাত্রা চালানোর পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনাও কম ঘটেনি। নগরের অপরিহার্য অংশ শ্রমজীবী নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। আমরা জানি- প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, গৃহহীনদের গৃহের ব্যবস্থা করবে সরকার। আমরা প্রধানমন্ত্রীর এই প্রতিশ্রুতিকে স্বাগত জানাই। রূপনগর বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের মর্মন্তুদ ঘটনা দুর্ঘটনা নাকি মনুষ্যসৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড, তা তদন্ত করে এর কারণ চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে সর্বাগ্রে সর্বস্ব হারানো মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিতে হবে। কোনো কায়েমি স্বার্থগোষ্ঠী যদি এই সর্বনাশের হোতা হয়ে থাকে, তাহলে তাদের আইনের আওতায় আনতেই হবে। বস্তিবাসীও এ দেশেরই মানুষ। তাদের অধিকার ও জানমালের নিরাপত্তার ব্যাপারে রাষ্ট্র উদাসীন থাকতে পারে না। বস্তিগুলোতেও পূর্ব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলায় সক্ষমতা আরও বাড়ানোর ব্যাপারে পরিকল্পিত ব্যবস্থা নেওয়া চাই। 'মানুষ মানুষের জন্য' এই শুভবোধ যেন হারিয়ে না যায়।
- বিষয় :
- অগ্নিকাণ্ড
