ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

নৃ-মুখ

‘তুরাগ ট্র্যাজেডি’ কী বার্তা দেয়

‘তুরাগ ট্র্যাজেডি’ কী বার্তা দেয়
×

জোবাইদা নাসরীন

জোবাইদা নাসরীন

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ | ০৭:০৫ | আপডেট: ৩০ জুন ২০২৬ | ০৯:৫৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

ডিবি পুলিশের হেফাজতে ফরিদপুর আইন কলেজের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ কর্মী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদের মৃত্যু নিয়ে আলোচনার মধ‍্যেই নতুন আলোচনা তৈরি করেছে তুরাগ নদ থেকে মাত্র দুদিনের ব্যবধানে উদ্ধারকৃত তিনটি লাশ। সংবাদমাধ্যমের খবর, গত ২৬ জুন শুক্রবার তুরাগ থেকে সুমনের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করেছে আশুলিয়া থানা পুলিশ। এর আগে ২৪ জুন বুধবার একই নদ থেকে উদ্ধার হয় আরেক তরুণ আরিফ হাসান এবং রনি মোল্লা নামে এক যুবকের লাশ (সমকাল, ২৮ জুন)। 

বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে ঝড় তোলে যখন আওয়ামী লীগ দাবি করে– এই তিনজনই দলটির কর্মী ছিলেন এবং গত ২৩ জুন দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিলে অংশ নিয়েছেন। পুলিশের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে একাধিক বক্তব্য দেওয়া হয়। 

সুমনের মরদেহ উদ্ধার নিয়ে আশুলিয়া থানার ওসি তরিকুল ইসলাম দাবি করেন, ‘২৫ জুন দিবাগত রাতে আশুলিয়া বাজারের পাশে তুরাগ নদে একজনের লাশ ভেসে উঠেছে– এমন খবর পায় পুলিশ। এরপর সেই মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে নিহত ব্যক্তির পরিবার মরদেহটি সুমনের বলে শনাক্ত করে’ (সমকাল)। আর দারুস সালাম থানা সূত্র জানায়, বুধবার তুরাগ নদ থেকে আরিফ হাসান নামে একজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে নৌ পুলিশ (সমকাল)।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক বক্তব্যে জানায়, ‘উত্তরা বিভাগের আওতাধীন তুরাগ থানা এলাকায় এ ধরনের কোনো ধারাবাহিক মরদেহ উদ্ধার, হত্যাকাণ্ড কিংবা এ-সংক্রান্ত অন্য কোনো ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে এ বিষয়ে তুরাগ থানায় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অভিযোগ, সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা মামলাও দায়ের হয়নি। বিষয়টি অনুসন্ধানে প্রচারিত তথ্যের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।’ 

প্রসঙ্গত, ফরিদপুরে ইশতিয়াকের মৃত্যু নিয়েও ডিবি পুলিশ বলেছিল, মধুখালী উপজেলা থেকে ‘মাদক’ রাখার অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ হেফাজতে ইশতিয়াক অসুস্থ‍ হয়ে মারা যান। অথচ স্বজনেরা বলেছিলেন, ইশতিয়াককে ডিবি বাসা থেকে তুলে নিয়েছিল, আটকের সময়ও তাঁর ওপর নির্যাতন হয়। ইতোমধ্যে ইশতিয়াকের আটকের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ‍্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানেও ইশতিয়াকের স্বজনদের বক্তব্যের সত্যতা মেলে।

তুরাগের ওই ঘটনা নিয়ে শনিবার প্রথম আলো একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটি পড়লে স্পষ্ট বোঝা যায়, সন্তানহারা পরিবারগুলো খুবই ভয়ের মধ‍্যে আছে। তারা কারও সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছে না। সন্তান আওয়ামী লীগের রাজনীতি করত– সেটা বলা তো বিপজ্জনকই; অন্য কোনো কথাও যেন তাদের জন্য বাড়তি বিপদ ডেকে আনতে পারে– এই আশঙ্কায় তারা রয়েছে। 

এদিকে শনিবার প্রকাশিত দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদন বলছে, পুলিশের তিনটি ইউনিট ইতোমধ্যে ঘটনার তদন্তে নেমেছে। তার মধ্যে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল আওয়ামী লীগের মিছিলে পুলিশের ধাওয়া দেওয়ার ফলে দুজনের মৃত্যুর সত্যতা পেয়েছে। তাদের বক্তব্য, গত ২২ জুন প্রায় ৩টার দিকে তুরাগ থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শফিকুল ইসলাম শফিকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ২৫-৩০ জন নেতাকর্মী নৌকাযোগে আশুলিয়ার রুস্তমপুর ঘাট থেকে আশুলিয়া বাজার ঘাটে মিছিল করার উদ্দেশ্যে আসে। নেতাকর্মীরা রুস্তমপুর ঘাট থেকে অজয় নামে এক মাঝিকে ঠিক করেন এবং আশুলিয়া বাজার ঘাটের উদ্দেশে রওনা হন। তারা ঘাটে পৌঁছে নৌকা থেকে নামার চেষ্টা করলে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মী ও পুলিশ তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে ধাওয়া করে। এ সময় তারা দ্রুত পুনরায় নৌকায় উঠে পালানোর চেষ্টা করেন। তবে তাড়াহুড়োর কারণে নৌকার নোঙর তুলতে ব্যর্থ হন। পুলিশ নৌকার নোঙর ধরে ফেললে নৌকায় থাকা নেতাকর্মীরা আতঙ্কিত হয়ে নদীতে ঝাঁপ দেন। এ ঘটনায় আশুলিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মোট সাতজনকে আটক করে। অন্যরা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। নদীতে তীব্র স্রোত থাকায় সুমন ও আরিফুল ইসলাম রাকিব নামে দুজন পানিতে তলিয়ে যান (দৈনিক দেশ রূপান্তর, ২৭ জুন)। পুলিশ সেখান থেকে সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে বলেও তথ্য আছে ওই প্রতিবেদনে।

এখানেই আসল প্রশ্ন। ডিএমপির দাবির অসারতাও এখানে প্রমাণিত। যারা জীবন বাঁচানোর জন‍্য নদীতে ঝাঁপ দিলেন, তাদের উদ্ধারে পুলিশ কী করেছে? তাদের দায়িত্ব কি গ্রেপ্তারকৃত সাতজন নিয়ে ফিরে যাওয়া? পরিবার যখন সন্তানের খোঁজ করছিল, তখন পুলিশের ভূমিকা কী ছিল? আওয়ামী লীগ করলেই কি যে কাউকে বেঘোরে মরতে হবে? আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। তাই দলটির নামে মিছিল করা অপরাধ। কিন্তু ট্রলারে কি তারা মিছিল করছিল?

পুলিশ হয়তো ধরেই নিয়েছে– আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টতার কারণে ওই তুরাগ ট্র্যাজেডি নিয়ে কেউ কথা বলবে না। তারা যা বলবে তাতেই সবাই সন্তুষ্ট থাকবে। প্রততিটি সরকারের আমলেই পুলিশের এ ধরনের মনোভাব বা বক্ত‍ব্য আমরা দেখেছি। কিন্তু এসব মুখস্থ কথায় বরং জনমনে পুলিশ প্রশাসনের ওপর আস্থা আরও কমবে। সকলেই অনুভব করবেন, পুলিশ এখনও ক্ষমতাসীনদের দলদাস। অসহায় ও বিপন্ন নাগরিকের জন্য তারা নেই। 

জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ‍্যালয়
[email protected]

আরও পড়ুন

×