ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

উচ্চারণের বিপরীতে

সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি বা অসময়ের দশ ফোঁড়

সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি বা অসময়ের দশ ফোঁড়
×

মাহবুব আজীজ

মাহবুব আজীজ

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ | ০৭:০৭ | আপডেট: ৩০ জুন ২০২৬ | ০৭:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাস সময়ের দুর্নীতির আদ্যোপান্ত সন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশনকে নিয়োগে রোববার সংসদে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। এর আগে ২৫ জুন টিআইবি জানিয়েছে, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এক বছরে বিভিন্ন সেবা খাতে মোট ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেন হয়েছে। এ ছাড়া গত চার মাসে সংবাদমাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও উপদেষ্টাদের অনিয়ম ও দুর্নীতির নানা প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। 

এর মধ্যে হামে শিশুমৃত্যু নিয়ে কেলেঙ্কারি ঘটিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। শ্রীলঙ্কায় ২৭ জুন অনুষ্ঠিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সভায় বলা হয়েছে, ১৫ মার্চ থেকে ২৭ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে হামে মারা যাওয়া ৭০৮ শিশুর ৯২ শতাংশ হাম-রুবেলার কোনো টিকা পায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টার সীমাহীন অদক্ষতার প্রমাণ এটাই প্রথম নয়। ইউনিসেফ আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, কয়েক দফা চিঠি ও সরাসরি তাগিদের পরও অন্তর্বর্তী সরকার টিকা ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয়নি।

এও অনস্বীকার্য, অন্তর্বর্তী সরকার এমন বহু কাজে মেতে ছিল, যা তাদের করবার প্রয়োজন ছিল না। ইতোমধ্যে সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের বিতর্ক থেকে বোঝা যাচ্ছে, গণভোট নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের একক সিদ্ধান্ত সামগ্রিক জুলাই সনদকেই বিতর্কে ঠেলে দিয়েছে। সংবিধানের মূল স্তম্ভসহ রাষ্ট্রের মৌলিক বিভিন্ন বিষয়ে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত অনির্বাচিত ব্যক্তিদের জুলাই সনদের মাধ্যমে নিয়ে তা সংসদের মাধ্যমে পাস করিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল।

আমরা দেখেছি, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রত্যেক উপদেষ্টা ও মন্ত্রণালয়ের ওপর শ্বেতপত্র প্রকাশের যৌক্তিক দাবি উত্থাপিত হলেও সরকার বা বিরোধী দল সংসদে এ বিষয়ে সরব হয়নি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিপুল মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অদক্ষতার অভিযোগ কেবল জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক নয়; সত্যকে আড়াল করে রাখাও জাতীয় স্বার্থের অনুকূল নয়। 
আওয়ামী লীগ সরকারের আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতির শ্বেতপত্র প্রকাশে কমিশন গঠন করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সেই কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী কোনো আইনি পদক্ষেপ কি নেওয়া হয়েছিল? অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম নিয়েও শ্বেতপত্র কমিশন গঠন করা জরুরি। বিগত দুই সরকারেরই দুর্নীতি ও অনিয়মের তদন্ত এবং বিচারের ব্যবস্থা বর্তমান সরকারকেই করতে হবে। শপথ নেওয়ার সাড়ে চার মাসেও জরুরি এই কর্তব্য সম্পাদনের উদ্যোগ নিতে পারেনি বর্তমান সরকার। এই শ্লথতা বিভিন্ন প্রশ্নের জন্ম দেয় বৈ কি। দুর্নীতির করাল গ্রাসে দেশের সব অর্জন বারবার লুণ্ঠিত হয়। এর উৎস বন্ধ করতেই হবে।

২.
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সমাজে অন্যতম বড় বিপর্যয় ছিল মব সন্ত্রাস। দিকে দিকে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে বিরুদ্ধমত ও পথের যে কাউকে ‘অমুকের দোসর’ আখ্যা দেওয়ার মচ্ছব দেখা দেয়। এর সঙ্গে ইতিহাস বিকৃতি, জাতীয় নেতৃবৃন্দের সম্পর্কে অসত্য ও অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক উস্কে দিয়ে সমাজে অস্থিরতা ছড়িয়ে দেওয়ার সচেতন অপপ্রয়াস। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ৩৬ দিনের আন্দোলনে একবারও দেশের মুক্তিযুদ্ধ কিংবা এর ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে বিতর্ক দেখা যায়নি। বরং স্লোগান দেওয়া হয়েছে– ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই’। অথচ অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে দফায় দফায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ভাঙা হয়েছে। দেশজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক, অসাম্প্রদায়িক আধ্যাত্মিকতার মিলনস্থল মাজার ভাঙা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে হামলা, ছায়ানট-উদীচীতে হামলাসহ একের পর এক মুক্তবুদ্ধি ও সাংস্কৃতিক চর্চাস্থলগুলো আক্রান্ত হতে থাকে। এক পর্যায়ে মুহাম্মদ ইউনূস ৩২ নম্বর ভাঙার কারণ প্রসঙ্গে বিদেশি সাংবাদিককে বলেন ‘এটি কেন ভাঙল– তাঁর মেয়েকে জিজ্ঞেস করুন।’

এসব ঘটনাকে বিভাজিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করবার সচেতন অপপ্রয়াস হিসেবে অবশ্যই ইতিহাস শনাক্ত করবে। যে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে অন্যায় করেছে, তাকে অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে– এ নিয়ে বিবেকবান কারও আপত্তি থাকবার কথা নয়; নেই-ও। কিন্তু তার মানে এই নয়, আওয়ামী লীগের যে কোনো নেতা বা কর্মীই আর সমাজে আত্মপরিচয়ে পরিচিত হতে পারবেন না; তিনি সুবিচার পাবেন না। এটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি হতে পারে না। দেশের প্রতিটি জেলখানায় বিনা বিচারে বিপুলসংখ্যক মানুষ বন্দি। অন্তর্বর্তী সরকার সেই অগণতান্ত্রিক চর্চাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করলেও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে বর্তমান সরকারকে বহুমতের পথ অবমুক্ত করতে হবে। আওয়ামী লীগ এক যুগ বিরুদ্ধমত দমন করেছে বলে আরও ১২ বছর আওয়ামী লীগকে একইভাবে দমন করতে হবে, এটি গণতন্ত্র হতে পারে না। আইনের শাসনই একমাত্র উপায় সব মত ও পথকে সমাজে সমান মর্যাদা ও সম্মান দেওয়ার জন্য। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাও এটিই।

৩.
অন্তর্বর্তী সরকার মুক্তিযুদ্ধ ও একাত্তরকে নিয়ে যে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক ছড়িয়ে দেওয়ার পৃষ্ঠপোষকতা করেছে, তার ধারাবাহিকতা এখনও বিদ্যমান। জাতীয় সংসদে এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম রোববার বলেছেন, ‘একাত্তরে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করলেও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে।’ তার মানে, বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীন হয়নি? এবং এটি বলছেন দেশের জাতীয় সংসদের সদস্য? একটি রাষ্ট্র সার্বভৌম না হলে স্বাধীন হয় কোন প্রক্রিয়ায়?

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কহীন, অপ্রয়োজনীয় ও বাহুল্য আলোচনার অবতারণা দেশের রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধকে যেমন খাটো করে; একই সঙ্গে দেশের নতুন প্রজন্মের সামনে বিভ্রান্তিকর তথ্যও হাজির করে। অথচ গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের শাসনামলে দেশের মুক্তিযুদ্ধের দলিল গ্রন্থনার কাজ শুরু হয়, যা ১৫ খণ্ডে প্রকাশিত। তাতে নিখুঁতভাবে সকল গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির অবদান, উদ্দেশ্য ইত্যাদি লিখিত রয়েছে। তারপরও নতুনভাবে এসব বিতর্ক বিনা কারণে উত্থাপন হচ্ছে, ভাবলে ভুল বিবেচনা করা হবে।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদে বলেছেন, একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইলে জামায়াতের পক্ষে রাজনীতি করা সহজ হবে (সমকাল, ২৯ জুন, ২০২৬)। বাস্তবিক, একটি পক্ষের মূল সমস্যার উৎস ওই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। যে অসাম্প্রদায়িক মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হয়েছে; ঐতিহাসিকভাবে তার বিরোধিতা জামায়াতের জন্য নিছক বিরোধিতা নয়, আদর্শগত অনৈক্য। তাই ইতিহাসকে বিভিন্ন সময় তারা বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা ও উপস্থাপন করে। জামায়াতের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে এনসিপি নেতার মুখেও তাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির অনুরণন সংসদে আমরা শুনতে পাই।

জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও রক্তরঞ্জিত অধ্যায় জাতির সামনে বারবার উপস্থাপন করেছিল। জাতিও দুই হাত ভরে তাদের ভোট দিয়ে সংসদে পাঠিয়েছে। সংসদে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অহেতুক বিতর্ক দেশের মূল চেতনাকে ভিন্ন খাতে ঠেলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। সরকারের এদিকে মনোযোগ দিয়ে নিজেদের করণীয় ঠিক করে সেভাবে নানামাত্রায় সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার দুর্নীতির তদন্ত শুরু না করাও সরকারের দূরদৃষ্টির অভাব। সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়– প্রয়োজনীয় কাজ দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সম্পন্ন করা সংগত। অপ্রয়োজনীয় সময়ক্ষেপণ সমাজে হিংস্রতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পথ প্রশস্ত করে। 

মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল ও সাহিত্যিক
[email protected]

আরও পড়ুন

×