মানবসম্পদ
নিরাপত্তা বনাম উৎপাদনশীলতার অসম কর্মসংস্থান খাত
শেখ আফনান বিরাহীম
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ | ০৭:০৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
বর্তমানে রাষ্ট্র বেসরকারি বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, এসএমই প্রবৃদ্ধি, স্টার্টআপ এবং শিল্পবৈচিত্র্যে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সাম্প্রতিক বাজেট ভাষণেও এগুলোকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ভিত্তি বলা হয়েছে। কিন্তু এখনও দেশের বেশির ভাগ তরুণ সরকারি চাকরিকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। সমস্যাটি মূলত তৈরি হয়েছে সরকারি ও বেসরকারি চাকরির মধ্যে ভারসাম্যহীনতার কারণে।
তাই পুরোনো প্রশ্নটি নতুন করে তুলে ধরা যায়: কেন বেসরকারি খাত এখনও তরুণদের কাছে যথেষ্ট নিরাপদ বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি? এর মূল কারণ কেউ শুধু বেতন দেখে সিদ্ধান্ত নেয় না। সে দেখে চাকরি টেকসই কিনা; অসুস্থ হলে সুরক্ষা আছে কিনা; বৃদ্ধ বয়সে পেনশন থাকবে কিনা।
বর্তমানে সরকারি চাকরি নিজেই বড় ‘নিরাপত্তা প্যাকেজ’। নবম জাতীয় বেতন কমিশন সর্বনিম্ন আট হাজার ২৫০ থেকে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার থেকে এক লাখ ৬০ হাজার টাকায় উন্নীত করার সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য বীমা, পেনশন সংস্কার, কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠন, ভাতা পর্যালোচনা, পে গ্রেডের পুনর্বিন্যাস এবং সরকারি কর্মচারীদের মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো প্রস্তাব এসেছে। এগুলোকে শুধু ‘বেতন বৃদ্ধি’ হিসেবে দেখা ভুল। সরকারি চাকরি আরও স্থিতিশীল, সুরক্ষিত ও দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ইঙ্গিত।
নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও সংস্কারের প্রস্তাব আছে। বিসিএস পরীক্ষা এক বছরের মধ্যে সম্পন্ন করা; বার্ষিক নিয়োগ সূচি, নৈতিকতার মূল্যায়ন, প্রচেষ্টার সীমা নির্ধারণ, রাজনৈতিক পরিচয় যাচাইয়ের অপব্যবহার কমানোর প্রস্তাব এসেছে। এসব প্রস্তাব পুরোপুরি বাস্তবায়িত হোক বা না হোক; বার্তাটি স্পষ্ট: সরকারি চাকরি আরও পূর্বানুমানযোগ্য, নিয়মতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক।
এর বিপরীতে বেসরকারি খাতের বাস্তবতা অনেক বেশি অনিশ্চিত। চলতি বছরের মার্চে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ রেকর্ড ৪.৭২ শতাংশে নেমে এসেছে। উচ্চ সুদহার, জ্বালানি অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংকের ঋণদানে সতর্কতা ব্যবসার সম্প্রসারণ কঠিন করছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন জনবল নিয়োগ, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, চাকরির নিরাপত্তা সংকুচিত হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০০ বিলিয়ন টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের লক্ষ্য বন্ধ ও বিপর্যস্ত কারখানা চালু, ব্যবসায় আস্থা ফেরানো এবং কর্মসংস্থান, বিশেষত রপ্তানিমুখী শিল্পে। একই প্যাকেজে উৎপাদন পুনরুজ্জীবন, রপ্তানিমুখী শিল্প সহায়তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য অর্থায়নের কথাও বলা হয়েছে। এই পদক্ষেপ দেখায়, বেসরকারি খাত শুধু সম্ভাবনা নয়, চাপের জায়গাও। সেখানে ব্যয় বেশি, ঋণ কঠিন, বাজার অনিশ্চিত, উৎপাদন ঝুঁকিপূর্ণ এবং শ্রমিকের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দুর্বল।
পেনশন ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও ব্যবধান স্পষ্ট। দেশের প্রায় ১.৮ কোটি নিবন্ধিত বেসরকারি কর্মীর বড় অংশের অবসরকালীন প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক নিরাপত্তা নেই। সরকারি কর্মচারীরা যেখানে পেনশন ও কল্যাণ কাঠামোর ভেতরে থাকেন, সেখানে বেসরকারি কর্মীদের বড় অংশ এখনও নিজস্ব সঞ্চয়, পারিবারিক সহায়তা বা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ওপর নির্ভরশীল।
উচ্চশিক্ষিত বেকারত্ব সংকটকে আরও তীব্র করে। ২০২৪ সালে প্রায় ৯ লাখ স্নাতক বেকার ছিলেন, যা মোট বেকারত্বের ১৩.৫ শতাংশ। যখন উচ্চশিক্ষা চাকরির নিশ্চয়তা দিতে পারে না; বেসরকারি খাত পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে পারে না, তখন সরকারি চাকরির দিকে অতিরিক্ত ঝোঁক থাকা স্বাভাবিক।
আমার প্রণীত ‘আফনান ইকুইলিব্রিয়াম’ তত্ত্ব অনুযায়ী, টেকসই উন্নয়ন শুধু উৎপাদনশীলতার ওপর গঠিত হয় না; প্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা, স্থিতিস্থাপকতা, সামাজিক প্রভাবের মধ্যেও ভারসাম্য দরকার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীলতার চাপ দেওয়া হচ্ছে বেসরকারি খাতের ওপর। কিন্তু স্থিতিস্থাপকতা বা নিরাপত্তা বেশি জমা হচ্ছে সরকারি চাকরিতে। ফলে তরুণরা ঝুঁকির বদলে নিরাপত্তার দিকে ঝুঁকছে। এটি অসম নিরাপত্তার যুক্তিসংগত প্রতিক্রিয়া।
সমাধান তাই সরকারি চাকরিকে দুর্বল করা নয়। সরকারি কর্মচারীর ন্যায্য বেতন, পেনশন, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পেশাগত মর্যাদা থাকা উচিত। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতেও ন্যূনতম নিরাপত্তা ভিত্তি তৈরি করতে হবে। পোর্টেবল পেনশন, নিয়োগকর্তা ও কর্মীর যৌথ পেনশন অবদান, স্বাস্থ্যবীমা, প্রভিডেন্ট ফান্ড, লিখিত চুক্তি, ছাঁটাই সুরক্ষা, সীমিত বেকারত্ব সহায়তা এবং ডিজিটাল কর্মী রেকর্ড ধীরে ধীরে শ্রমবাজারের স্বাভাবিক অংশ হওয়া উচিত।
সরকার যদি কারখানা পুনরুজ্জীবন, রিফাইন্যান্সিং, স্টার্টআপ ফান্ড বা এসএমই সহায়তা দেয়, তবে চাকরির মানও যুক্ত করতে হবে। বাজেট ভাষণে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মসংস্থান বিনিময় চালুর উদ্যোগ, দক্ষতা উন্নয়ন, শ্রমিক তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং শ্রম আইনি সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। শুধু প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়; এগুলোকে উৎপাদনশীলতা ও নিরাপত্তাকে যুক্তকারী সুযোগ হিসেবেও দেখা দরকার। সরকারি সহায়তাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানকে কর্মী নিবন্ধন, নিয়োগপত্র, প্রশিক্ষণ, পেনশন অবদান এবং কর্মসংস্থান ধরে রাখার ন্যূনতম শর্ত পূরণে উৎসাহিত করা যেতে পারে। এতে উৎপাদনশীলতা ও স্থিতিস্থাপকতা একসঙ্গে বাড়বে।
প্রস্তাবিত কর্মসংস্থান বিনিময় ব্যবস্থাকেও শুধু নিবন্ধন কেন্দ্র বানালে হবে না। এটি হতে হবে যাচাইকৃত চাকরি, দক্ষতা মানচিত্র, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি, স্থানীয় শিল্পের সঙ্গে সংযোগ, ফলাফল পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র।
শেখ আফনান বিরাহীম: গবেষক ও বিশ্লেষক
- বিষয় :
- মানবসম্পদ
