ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

বার্নহামের প্রধানমন্ত্রিত্বের পথে বাধা

বার্নহামের প্রধানমন্ত্রিত্বের পথে বাধা
×

ইসমাইল প্যাটেল

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ | ০৭:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

অ্যান্ডি বার্নহাম যদি কিয়ার স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হন, তবে তিনি লেবার পার্টির এমন এক সম্পদ উত্তরাধিকারসূত্রে পাবেন, যা তারা হারিয়ে ফেলেছিল; যদিও তারা কয়েক দশক ধরে সেটি নিজেদের চিরস্থায়ী সম্পত্তি বলে ধরে নিয়েছিল। হারিয়ে যাওয়া সেই সম্পত্তি হলো ব্রিটেনের মুসলমানদের আস্থা। বার্নহামের বোঝা উচিত, কোনো মসজিদে গিয়ে ছবি তোলা, ইফতার বা ঈদের পার্টিতে যোগ দেওয়া কিংবা কিছু ফাঁকা বুলি আওড়ানোর মাধ্যমে এই আস্থা আর ফেরানো যাবে না। এই সম্পর্ক ভেঙেছে সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপের কারণে, আর তা জোড়া লাগাতে হলেও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ প্রয়োজন।

এই ফাটলের ব্যাপারটি কোনো মনগড়া কথা নয়। এটি একেবারে সংখ্যা দিয়ে পরিমাপযোগ্য। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টির মুসলিম ভোট ব্যাংক প্রায় ৮০ শতাংশ থেকে নেমে মাত্র ৬০ শতাংশের কিছু বেশিতে এসে দাঁড়ায়। আর যেসব নির্বাচনী এলাকায় মুসলিম জনসংখ্যা ৩০ শতাংশের বেশি, সেখানে লেবার পার্টির ভোট ধসে পড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশের মতো। পাঁচজন ক্ষমতাসীন লেবার এমপি গাজাপন্থি স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কাছে পরাজিত হয়েছেন। অন্য বেশ কয়েকজন লেবার এমপি মাত্র কয়েকশ ভোটের ব্যবধানে কোনোমতে টিকে গেছেন।
এটি সাময়িক কোনো প্রতিবাদ ছিল না যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফিকে হয়ে যাবে।

গত এপ্রিলের জনমত জরিপ অনুযায়ী, মুসলমানদের মধ্যে লেবার পার্টির সমর্থন নেমে এসেছে ৩৩ শতাংশে। এমনকি প্রতি পাঁচজনের মধ্যে তিনজন মুসলিম ভোটার লেবার পার্টিকে ঠেকাতে যে কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সমর্থন করতে প্রস্তুত। মুসলিম ভোটব্যাংক লেবার পার্টির দিকে তো ফিরছেই না, বরং দিন দিন তাদের মধ্যকার দূরত্ব আরও বাড়ছে। কেন এমনটা হচ্ছে, তা নিয়ে বার্নহামের নিজের ব্যাপারে সৎ হওয়া উচিত।

এর শুরুটা হয়েছিল গাজা দিয়ে। বার্নহামের পূর্বসূরি কিয়ার স্টারমার বলেছিলেন, অবরুদ্ধ একটি বেসামরিক জনগোষ্ঠীর পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ‘অধিকার’ ইসরায়েলের আছে। এই বক্তব্যকে লেবার পার্টির সমর্থকরা ঢালাওভাবে শাস্তির পক্ষে সাফাই হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। এই দূরত্ব আরও বাড়ে যখন আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) গাজায় ফিলিস্তিনিদের গণহত্যা থেকে সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার বিষয়কে ‘বিশ্বাসযোগ্য’ বলে রায় দেন, অথচ ব্রিটিশ সরকার আগের মতোই নিজেদের অবস্থান বহাল রাখে। 
আজ পর্যন্ত লেবার পার্টি সেই আনুমানিক দুই হাজার ব্রিটিশ নাগরিকের বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যারা গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর পক্ষে লড়াই করেছে। অথচ দেশের মাটিতে ফিলিস্তিনের পক্ষে শান্তিপূর্ণ সংহতি প্রকাশকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এই অপরাধকরণ এখন নিজেই একটি বড় কেলেঙ্কারিতে রূপ নিয়েছে।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’কে নিষিদ্ধ করার পর থেকে এর বিরোধিতার দায়ে দুই হাজার ৭০০ জনেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের গড় বয়স ৫৯ বছর। স্রেফ একটা প্ল্যাকার্ড হাতে নেওয়ার কারণে পেনশনার, ধর্মযাজক এবং সাধারণ কর্মজীবী নাগরিকদের সন্ত্রাসী সন্দেহভাজন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলের গণহত্যাকে সমর্থনকারীরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

মূল্যবোধ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী কোনো দেশ এমন আচরণ করে না। এটি কেবল সেই সরকারই করে, যার সব যুক্তি হারিয়ে গেছে। তবে সবচেয়ে গভীর ক্ষতটি তৈরি হয়েছে দেশের ভেতরেই এবং এটি সম্ভবত এমন এক ক্ষত, যা বার্নহাম নিজেও হয়তো আশা করেননি। ব্রিটেনের মুসলমানরা এখন আর নিজেদের নিরাপদ মনে করেন না এবং তারা বিশ্বাস করেন না– লেবার সরকার তাদের গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।

ইসমাইল প্যাটেল: ‘দ্য মুসলিম প্রবলেম: ফ্রম দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার টু ইসলামোফোবিয়া’ বইয়ের লেখক; দ্য মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম

আরও পড়ুন

×