অন্তর্বর্তীর সম্ভাব্য দুর্নীতির তদন্ত
ইহা কি কেবল মুখের কথা?
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ | ০৭:০৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
আসন্ন অর্থবৎসরের প্রস্তাবিত বাজেট লইয়া আলোচনাকালে রবিবার জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলের সম্ভাব্য দুর্নীতি তদন্তের যেই অনুরোধ করিয়াছেন, উহা তাৎপর্যপূর্ণ বটে। স্বীকার্য, অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলের দুর্নীতির তদন্ত কিংবা স্বেতপত্র প্রকাশের আহ্বান ইতোপূর্বেও শোনা গিয়াছে। কিন্তু খোদ জাতীয় সংসদে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একজন মন্ত্রীর এইরূপ আহ্বানকে আর দশটার সহিত মিলাইয়া দেখিবার অবকাশ নাই। এই প্রসঙ্গে তিনি দুর্নীতবিরোধী সংস্থা টিআইবির সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনটিও উদ্ধৃত করিয়াছেন; সেইখানে বলা হইয়াছে, অন্তর্বর্তী সরকারের এক বৎসরে সাড়ে ১২ সহস্রাধিক কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হইয়াছে। উপরন্তু দুর্নীতিও এই সময়ে অতীতের যেই কোনো সময় অপেক্ষা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাইয়াছিল।
আমরা জানি, একটা দেশে যখন ঘুষ-দুর্নীতি বৃদ্ধি পায় তখন শুধু রাষ্ট্রীয় সম্পদেরই অপচয় ঘটে না, জনগণের জীবনযাত্রার উপরেও অতিরিক্ত চাপ পড়ে। উপরন্তু এই অবৈধ ও অন্যায় প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষের সম্পদ মুষ্টিমেয় ব্যক্তির হস্তগত হয়, রাষ্ট্র ও সমাজেও যাহার নেতিবাচক প্রভাব অনস্বীকার্য। ফলস্বরূপ একদিকে ধনবৈষম্যের সহিত অন্যান্য বৈষম্যও বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে ক্ষমতাবানদের দাপটও বৃদ্ধি পায়, যাহা কালক্রমে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দেয়। এই সকল কারণেই ঘুষ-দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ যে কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের অবশ্যকর্তব্য বলিয়া সর্বজনস্বীকৃত।
অনস্বীকার্য, ঘুষ-দুর্নীতি বৃদ্ধি সমস্যার মূল কারণ রাষ্ট্র ও সমাজের সামগ্রিক কাঠামোর মধ্যেই নিহিত, যেই ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন সম্ভব নহে। উপরন্তু যেই কোনো বিচারেই বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ছিল স্বল্পমেয়াদি। তাই উক্ত সমস্যার মূলোৎপাটন তাহাদের পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। কিন্তু ইহাও স্বীকার্য, দুর্নীতি, ঘুষ কিংবা অবৈধ প্রক্রিয়ায় অর্থোপার্জনের অপরাধের বিরুদ্ধে নিয়মিত আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে তাহা হ্রাস করা সম্ভব; অন্তত সময়ের সহিত পাল্লা দিয়া তাহা বৃদ্ধি পাইতে পারে না। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অনেক প্রাণ ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের মাধ্যমে অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সহিত দুর্নীতির মূলোৎপাটনের ঘোষণা দিলেও বাস্তবে দুর্নীতি দমন কমিশনকেই কার্যকর করিতে পারে নাই। এমনকি শপথ গ্রহণের পরপর তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টাসহ সকল উপদেষ্টা এবং প্রশাসনের সর্বস্তরের কর্মকর্তাগণের আয়-ব্যয়ের হিসাব দাখিলের যেই ঘোষণা দেওয়া হইয়াছিল, উহাও আলোর মুখ দেখে নাই। অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো কোনো উপদেষ্টার বিরুদ্ধে সেই সময়ে অনিয়ম, দুর্নীতি ও কমিশন বাণিজ্যের যেই অভিযোগ উঠিয়াছিল, উহা পত্রপাঠ উড়াইয়া দেওয়া ব্যতীত তদন্তে আগ্রহ দেখা যায় নাই।
এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদে অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্নীতির তদন্তের আহ্বান নিছক বাগাড়ম্বর হিসাবে দেখিবার অবকাশ সামান্য। এইরূপ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয় লইয়া খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাগাড়ম্বরই বা করিবেন কেন? অবশ্য সম্প্রতি আমরা দেখিয়াছি, হামজনিত কারণে বিপুলসংখ্যক শিশুমৃত্যুর পরিপেক্ষিতে উঠা জনদাবির প্রতি সাড়া দিয়া মে মাসে সরকারের টিকা কেলেঙ্কারির তদন্ত চাহিয়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে অনুরোধ করিয়াছিল। কিন্তু জুন মাসেই ঐ অবস্থান হইতে সরিয়া আসিয়া সরকারের পক্ষে তদন্ত ‘অপ্রয়োজনীয়’ আখ্যা দেওয়া হইয়াছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সম্ভাব্য দুর্নীতির তদন্তের আহ্বানের ললাটলিখন কী, আমরা জানি না।
আমরা মনে করি, সংসদের ভিতর ও বাহিরে দাবি যেহেতু উঠিতেছে; সম্ভাব্য
দুর্নীতির বিষয় তদন্ত করিয়াই দেখা উচিত। রাষ্ট্রীয় পদ গ্রহণকারী যেই কাহারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ বিনা তদন্তে উড়াইয়া দেওয়া অনুচিত। উহা গণতন্ত্র ও সুশাসনের অন্তরায়। অন্তর্বর্তী সরকার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ যদি দুর্নীতি না করিয়া থাকেন, তাহা হইলে তদন্তের মাধ্যমে বরং তাহাদের অবস্থানই সমুন্নত হইয়া উঠিবে। বর্তমান সরকারও দুর্নীতি প্রতিরোধে স্বীয় সদিচ্ছা প্রমাণ করিতে সক্ষম হইবে।
তৎপরিবর্তে দুর্নীতির অভিযোগ এবং উহা তদন্তের দাবি কেবল মুখের কথা হইয়া থাকিতে পারে না।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
