ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

লাইসেন্স ছাড়াই চলছে শতাধিক হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টার

লাইসেন্স ছাড়াই চলছে শতাধিক  হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টার
×

আনোয়ার হোসেন মিন্টু, জামালপুর

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ | ০৮:২৭ | আপডেট: ৩০ জুন ২০২৬ | ০৯:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

জামালপুর জেলায় বছরের পর বছর লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে শতাধিক বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। 
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলা সদরসহ ৭ উপজেলায় প্রায় দুইশ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও কিডনি কেয়ার সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নিয়মিত নবায়ন করা হলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই চালিয়ে যাচ্ছে চিকিৎসা কার্যক্রম। এমন পরিস্থিতিতে অবৈধভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিযোগে জেলার ১১টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স বাতিল করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। 

জেলা সিভিল সার্জন অফিসের সূত্রমতে, জামালপুর জেলা সদরসহ ৭ উপজেলায় মোট বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে ৫৮টি। এর মধ্যে হাল সাল পর্যন্ত লাইসেন্স নবায়ন আছে ২৪টির। আর ১২৭টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে হাল সাল পর্যন্ত লাইসেন্স নবায়ন রয়েছে ৩৫টির। স্বাস্থ্য বিভাগের এ হিসাবে জেলায় বর্তমানে লাইসেন্স নবায়নবিহীন বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক ১২৬টি। অভিযোগ রয়েছে, জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের এই হিসাবের বাইরেও জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের আনাচে কানাচে অবৈধভাবে চালু রয়েছে সাইনবোর্ড সর্বস্ব অনেক হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার।  

জামালপুর সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা গেছে, লাইসেন্স নবায়ন না করাসহ নানা অভিযোগে গত ৯ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) পরিচালক ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান জেলার ১১টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স বাতিলের নির্দেশ দেন। নির্দেশনা পাওয়ার পরপরই অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। এই প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- ইসলামপুর উপজেলার তুষার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, দেওয়ানগঞ্জের আধুনিক হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বকশীগঞ্জ উপজেলার মর্ডান ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ডা. এফ রহমান হাসপাতাল, নিউ পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মাদারগঞ্জের স্বপন ডায়াগনস্টিক সেন্টার, জামালপুর শহরের তমালতলা এলাকার নিউ সিটি হাসপাতাল, বাগেরহাটা এলাকার শফিক হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, নয়াপাড়া এলাকার এশিয়ান জেনারেল হাসপাতাল, স্টেশন বাজার এলাকার ইউনাইটেড জেনারেল হাসপাতাল এবং সরিষাবাড়ী উপজেলার হামিদ মেডিকেল সেন্টার। এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দীর্ঘদিন ধরে নবায়ন না হওয়ায় আইন অনুযায়ী সেগুলোর লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে লাইসেন্সবিহীন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকেও দ্রুত নবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।

জানা গেছে, বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক পরিচালনার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্স বাধ্যতামূলক। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লাইসেন্স নবায়ন করতে হবে। কিন্তু জেলার শতাধিক বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার বছরের পর বছর লাইসেন্স নবায়ন না করেই রোগী ভর্তি, অস্ত্রোপচার, পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে। এতে একদিকে যেমন আইন লঙ্ঘিত হচ্ছে, অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, জামালপুর ডায়াবেটিস জেনারেল হাসপাতালের লাইসেন্স নবায়ন ছিল ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত। গত ৪ বছর ধরে চলছে লাইসেন্স ছাড়াই। শহরের হারুন সড়কের মানব সেবা হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ফুলবাড়িয়া মুন্সিপাড়ার জনতা জেনারেল হাসপাতাল ৬ বছর চলছে লাইসেন্স নবায়ন না করেই। এ ছাড়া শহরের দি রেনেসাঁ জেনারেল হাসপাতাল, জামালপুর ন্যাশনাল হাসপাতাল, উপশম জেনারেল হাসপাতাল, প্রাইম মেডিকেল সার্ভিসেস, ডা. জহুরুল ইসলাম হেলথ কমপ্লেক্স, নান্দিনা কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মা নার্সিং হোম ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ইসলামপুর যমুনা হাসপাতাল, সূচনা ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মেলান্দহের আলহাজ এম এ রশিদ জেনারেল হাসপাতাল, স্বপ্নচুঁড়া জেনারেল হাসপাতাল, দেওয়ানগঞ্জের রাফি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সরিষাবাড়ির হিউম্যান ডায়াগনস্টিক সেন্টার, যমুনা মেডিকেল সেন্টার, হেলথ কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও মাস্টার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বকশীগঞ্জের সূর্যের হাসি ক্লিনিক, মাদারগঞ্জের রয়েল ফ্রেন্ডশিপ হসপিটালসহ শতাধিক হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার ৪ থেকে ৭ বছর ধরে চলছে লাইসেন্স ছাড়াই। এসব হাসপাতাল সরকারি নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে নিয়মিত চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও স্বাস্থ্য বিভাগ নোটিশ দেওয়া ছাড়া কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়নি।  

অভিযোগ রয়েছে, জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো মনিটরিং কিংবা জবাবদিহিতা না থাকায় অবৈধ হাসপাতাল ও ক্লিনিকের দৌরাত্ম্য দিন দিন বাড়ছে। তাছাড়া বেশির ভাগ হাসপাতালে বড় বড় চিকিৎসকের নাম সম্বলিত সাইনবোর্ড টানানো থাকলেও তাদের অনেকেই চলে গেছেন ভিন্ন কোনো জেলায়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মাসে দু’একবার এসে অপারেশন করে চলে যান। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানেই নেই মানসম্মত পরীক্ষাগার, প্যাথলোজিক্যাল সরঞ্জাম বা ল্যাব টেকনোলজিস্ট। কম বেতনের অনভিজ্ঞ নার্স, ওয়ার্ডবয়, আয়াই হচ্ছেন এসব হাসপাতালের রোগীদের বড় ভরসা। 
জামালপুর সদর উপজেলার দুবাই হসপিটালে (বিডি) ডাক্তার না থাকায় ও কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে গত বছরের ২৭ মে রিতু নামের এক প্রসূতির মৃত্যু হয়। প্রতিবাদে এলাকাবাসী হাসপাতালে তালা লাগিয়ে দেন। পরে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তদন্তে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নানা অনিয়ম ও গাফিলতির প্রমাণ মেলে। পরে অপারেশন থিয়েটার সিলগালা করাসহ হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক রাখাসহ স্বাস্থ্য বিভাগের দেওয়া বেশ কিছু শর্তসাপেক্ষে হাসপাতালের কার্যক্রম চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু  অভিযোগ রয়েছে এটির চিকিৎসা ব্যবস্থায় আগের চিত্রই রয়েছে। তাদেরও নেই হাল সাল পর্যন্ত লাইসেন্স।    
জামালপুর ডায়াবেটিস জেনারেল হাসপাতালের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ তরিকুল ইসলাম বলেন, আমরা লাইসেন্স নবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আবেদন ও কাগজপত্র জমা দিয়েছি। কিছু প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে নবায়ন হচ্ছে না। 

লাইসেন্স বাতিল হওয়া দেওয়ানগঞ্জের আধুনিক হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ম্যানেজার মঞ্জুরুল হক বলেন, ২০১৮ সালে হাসপাতাল চালুর পর দুই অর্থবছর পর্যন্ত লাইসেন্স নবায়ন ছিল। এরপর থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না পাওয়ায় লাইসেন্স নবায়ন করা যায়নি। 
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, লাইসেন্স শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয় এটি প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, চিকিৎসক, নার্স, যন্ত্রপাতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সেবার মান যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘদিন 
লাইসেন্স নবায়ন না হওয়া মানে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মানদণ্ড পুনর্মূল্যায়ন হয়নি। এতে রোগীরা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারেন।
জামালপুরের সিভিল সার্জন ডা. আজিজুল হক বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী জেলার সব বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছে বা নবায়ন করা হয়নি, তাদের বিরুদ্ধে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ১১টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। যারা এখনও নিয়ম মেনে লাইসেন্স নবায়ন করেনি, তাদেরও ছাড় দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে অভিযান পরিচালনা করে প্রতিষ্ঠান বন্ধসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×