সুশাসন
ছকবাঁধা বাজেট কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনবে না
বদিউল আলম মজুমদার
বদিউল আলম মজুমদার
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ | ০৭:০৯ | আপডেট: ৩০ জুন ২০২৬ | ১৩:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরে এসে ঘোষণা দিয়েছিলেন– ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’। এটা বহু নাগরিককেই আশাবাদী করেছিল। আমি নিজেও অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম এই ভেবে যে, শেখ হাসিনার শাসনামলে আমাদের সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান তছনছ করার যে মহোৎসব চলেছিল; দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের যে ব্যাপকতা ঘটেছিল; আইনকানুন-বিধিবিধান-সংবিধান অমান্যের যে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়েছিল; নির্যাতন-নিপীড়ন-মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছিল; সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার যেভাবে পদদলিত হয়েছিল– এক কথায়, যে দুঃশাসন ও দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে নাগরিকরা দিনাতিপাত করেছিল, তার অবসানের লক্ষ্যে ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রীর সুচিন্তিত পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা আশা করেছিলাম, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের যাত্রা শুরুর বাজেটে বহু কাঙ্ক্ষিত এ পরিকল্পনার প্রতিফলন ঘটবে। বাস্তবে মনে হচ্ছে, আমরা আবার অতীতের মতো ছকবাঁধা বাজেট পেলাম।
অর্থমন্ত্রী যিনিই হোন না কেন; গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে মোটাদাগে চারটি প্রবণতা অপরিবর্তিত থেকে গেছে। প্রথমত, সামর্থ্যের কথা বিবেচনা না করেই প্রতিবছর বাজেটের আকার প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ানো। দ্বিতীয়ত, বাজেটের অর্থায়নের জন্য রাজস্ব– মূলত কর থেকে রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ। তৃতীয়ত, মূল কাঠামো ও অগ্রাধিকার মোটামুটি অক্ষুণ্ন রেখে একই ব্যয় খাতগুলোর মধ্যে বরাদ্দ এদিক-সেদিক করে সামান্য কিছু পরিবর্তন আনা– ২০১৪ সালের একপক্ষীয় নির্বাচনের পর অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম দেখা গিয়েছিল, যখন শেখ হাসিনার সরকার দৃশ্যমান অবকাঠামোতে বিপুল অর্থ ঢেলেছিল, যা উন্নয়নের চেয়ে লুটপাটের মাধ্যম হিসেবেই বেশি কাজ করেছে বলে এখন প্রমাণিত। চতুর্থত, সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে সবাইকে– বিশেষত জ্বালানি খাতের ভর্তুকির সুবিধাভোগীদের মতো সংগঠিত স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলোকে খুশি রাখার প্রবণতা।
সম্প্রতি সংসদে উপস্থাপিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটেও এই প্রবণতাগুলো টিকে আছে। প্রথমত, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাজেট ছিল প্রায় পাঁচ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা। পরবর্তী অর্থবছরে তা হয়েছে পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। ২০২১-২২, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাজেট ছিল যথাক্রমে ছয় লাখ চার হাজার কোটি, ছয় লাখ ৭৮ হাজার কোটি ও সাত লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যা ছিল সাত লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা, তা চলতি বছর সংশোধিত আকারে দাঁড়িয়েছে সাত লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। আর নতুন বাজেটে তা এক লাফে বেড়ে হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা– বিদায়ী সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি, যা সাম্প্রতিক স্মৃতিতে এক অর্থবছরে সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি।
দ্বিতীয়ত, গত প্রায় এক দশক ধরে এনবিআর তার বার্ষিক রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়ে আসছে এবং এ বছরের ১১ মাসে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮১ হাজার ৪৪২ কোটি টাকায়। বছরের শেষভাগে এই ঘাটতি প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে (বণিক বার্তা, ২২ জুন ২০২৬)। কর-জিডিপি অনুপাত নেমে এসেছে প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশে, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন হারগুলোর একটি। এমন প্রেক্ষাপটে সরকার আগামী বছরে এনবিআরের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে প্রায় ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা; সংশোধিত অর্থবছরের লক্ষ্যের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি, যা নিঃসন্দেহে উচ্চাভিলাষী। কারণ এতে এক বছরেই রাজস্ব আদায়ে প্রায় ৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয়েছে, এনবিআরের বিদ্যমান সক্ষমতার ভিত্তিতে যা সম্পূর্ণ অবাস্তব।
তৃতীয়ত, বাজেটের মূল কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে আপনজনদের লাভবান করার লক্ষ্যে ‘দৃশ্যমান’ অবকাঠামোর জন্য পুনঃঅর্থায়ন করা। অনেক সময় এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা কঠিন। কারণ এসব দায়বদ্ধতা বহু বছর আগেই নির্ধারিত। প্রায় এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, যার ব্যয় বিনিময় হার সমন্বয়ে পরে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় এক লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় (আনুমানিক ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার), এখন প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার আত্মসাতের অভিযোগ তদন্তাধীন। এসব প্রকল্পের অর্থায়ন বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যর্থতা নয়। বরং এগুলোর মাধ্যমেই ২০১০-পরবর্তী সময়ে ‘উন্নয়ন’ শব্দটি কার্যকর অবকাঠামো নির্মাণের বদলে লুটপাটের বাহন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেট এসব দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধ করার কঠোর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থতা বলিষ্ঠ সংস্কারের বদলে অতীতের অপকর্মের ধারাবাহিকতাই রক্ষা করেছে।

চতুর্থত, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ভর্তুকি নামমাত্র কমিয়ে ২০২৫ অর্থবছরের প্রকৃত এক লাখ আট হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা থেকে প্রায় ৮৯ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকায় আনা হলেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভর্তুকি এখনও প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। মূল সমস্যাটি হলো উৎপাদন না করা বিদ্যুতের জন্য বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে কেন্দ্র ভাড়া বা ক্যাপাসিটি চার্জ প্রদান। ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশ এ ধরনের ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ পরিশোধ করেছে ৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি। কেবল ২০২৩-২৪ অর্থবছরেই এই অঙ্ক পৌঁছেছিল প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকায়, যা সে বছরের বিদ্যুৎ খাতের মোট ভর্তুকির ৮১ শতাংশ। রাজনৈতিকভাবে আশীর্বাদপুষ্ট একগুচ্ছ বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকের জন্য এগুলো নিশ্চিত এবং মূলত প্রতিযোগিতাবিহীন অর্থ পরিশোধ। সরকারের উচিত ছিল ‘গতানুগতিক চিন্তার বাইরে’ গিয়ে এসব চুক্তি পুনর্গঠন বা পুনরায় দর কষাকষি করা। তা না করে পুরোনো ব্যবস্থাটি নতুন একটি বাজেটে অক্ষতভাবেই টিকে রয়েছে।
উপরিউক্ত প্রবণতাগুলো অবসানের বাইরেও বাজেট প্রণয়নে নতুন সরকারের কতগুলো বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন ছিল, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান। একই সঙ্গে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের সর্বগ্রাসী ও সর্বব্যাপী বিস্তারে লাগাম টেনে ‘ফুটো কলস’-এর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার অবসান ঘটানো এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ন্যায়পরায়ণতার সংস্কৃতির প্রবর্তন। আমাদের বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত এখন সর্বনিম্নে। সিঙ্গাপুরের মতো প্রাকৃতিক সম্পদহীন সিটি-স্টেট আমাদের শেখায়, আইনের শাসন এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে ছোট রাষ্ট্রও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করে উন্নতির উচ্চ শিখরে পৌঁছতে পারে।
‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ ধারণা কাজে লাগিয়ে তরুণদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, সুস্বাস্থ্য ও সুযোগের সৃষ্টিতে জোর দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোকে দুর্নীতিমুক্ত এবং অধিক দক্ষ করার লক্ষ্যে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। চরম ঝুঁকির মধ্যে নিপতিত ব্যাংকিং খাতকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোও জরুরি। এক কথায়, নতুন গন্তব্যে পৌঁছতে হলে আমাদের পুরোনো পথে হাঁটা বন্ধ করতে হবে– এ উপলব্ধি সরকারের কর্মকাণ্ডে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়।
তবে আমরা এখনও হাল ছাড়িনি। আশা করি, অতীতের সব অনিয়ম, অপকর্ম ও পঙ্কিলতা দূর করার জন্য প্রধানমন্ত্রী দ্রুতই তাঁর পরিকল্পনা তুলে ধরবেন এবং তা বাস্তবায়নে প্রজ্ঞাবান ও সাহসী পদক্ষেপ নেবেন। অর্থনীতি ও বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনার পাশাপাশি সরকার গণতান্ত্রিক ঘাটতি ও সুশাসনের ব্যর্থতার অবসানে জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছা বিষয়গুলো এবং ভেঙে পড়া সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠনকেও অগ্রাধিকার দেবে। বিশ্বাস করি, সরকার আমাদের হতাশ করবে না।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক
- বিষয় :
- বদিউল আলম মজুমদার
- বাজেট
