চারদিক
যুবসমাজে মাদকের প্রভাব
জান্নাতুল ফেরদাউস পিয়াসা
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের ভবিষ্যৎ অনেকটাই যুবসমাজের ওপর নির্ভর করে। উদ্বেগের বিষয়, আমাদের যুবসমাজের একটি অংশ ক্রমশ মাদকের গ্রাসে আটকে পড়ছে। মাদক শুধু একজন ব্যক্তির জীবন ধ্বংস করে না; পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্যও দীর্ঘমেয়াদি হুমকি সৃষ্টি করে। তাই মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি ও প্রতিরোধ এখন সময়ের দাবি।
দুঃখজনক, স্কুল-কলেজের অনেক শিক্ষার্থীই মাদকে জড়িয়ে গেছে। নির্দিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইউনিফর্ম পরিধান করা এমন অনেককেই আমি মাদক সেবন করতে দেখেছি। এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানেও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাদক উদ্ধার হওয়ার খবর পাওয়া যায়। বলার অপেক্ষা রাখে না, মাদকের প্রভাব ভয়াবহ। প্রথমত, এটি মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য নষ্ট করে। একজন মাদকাসক্ত ধীরে ধীরে তার কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে বিচ্যুত হয়। দ্বিতীয়ত, মাদকাসক্তি শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়, পরীক্ষায় খারাপ ফল করে এবং এক পর্যায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেও ঝরে পড়ে।
তৃতীয়ত, মাদক অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। মাদকের জন্য অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় অনেকেই চুরি, ছিনতাই, ভাঙচুর কিংবা পারিবারিক সহিংসতার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। অনেক পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি হয়; বাবা-মায়ের কষ্টার্জিত অর্থের অপচয় এবং পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়। ফলে সমাজে নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পায়।
যদি এই প্রবণতা রোধ করা না যায়, তবে আগামী প্রজন্ম ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়বে। দক্ষ জনশক্তি গড়ে ওঠার পরিবর্তে সমাজে বেকারত্ব, অপরাধ এবং সামাজিক অবক্ষয় বাড়বে। জাতির উন্নয়নের জন্য সুস্থ, শিক্ষিত ও নৈতিক যুবসমাজ প্রয়োজন। কিন্তু মাদকাসক্ত যুবসমাজ কখনোই দেশের উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না।
মাদকের থাবা আজ নারী-পুরুষের ভেদাভেদও মানছে না। বিভিন্ন স্পটে তরুণ-তরুণীদের মাদক সেবনের ঘটনা বাড়ছে। যারা দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও উন্নয়নের চালিকাশক্তি হওয়ার কথা, তাদের একটি অংশ মাদকের অন্ধকার জগতে জড়িয়ে পড়ছে। এটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতিই নয়, বরং জাতীয় মানবসম্পদ ধ্বংসেরও একটি নীরব প্রক্রিয়া।
বাংলাদেশে মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইনের ধারা ৩৬-এ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্যের উৎপাদন, বহন, সংরক্ষণ, বিক্রয়, সরবরাহ ও সেবনের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। অপরাধের ধরন ও মাদকের পরিমাণ অনুযায়ী শাস্তি ভিন্ন হয়। কিছু ক্ষেত্রে কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে; আবার গুরুতর অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এমনকি মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও শুধু আইন দিয়ে এই সমস্যা পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে হলে তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং সৃজনশীল কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে। পাশাপাশি অভিভাবকদের সন্তানদের প্রতি আরও যত্নশীল হতে হবে এবং তাদের চলাফেরা ও বন্ধুবান্ধব সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।
মাদকের বিস্তারের অন্যতম কারণ হলো এর সহজলভ্যতা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর হলে এমনটা হওয়ার কথা নয়। মনে রাখতে হবে, মাদক জাতীয় সংকটে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সে জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। পাশাপাশি আজ যদি আমরা সচেতন না হই, তবে আগামী প্রজন্মকে একটি অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেব। তাই যুবসমাজকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করা আমাদের সবার নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। একটি সুস্থ, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার জন্য মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
জান্নাতুল ফেরদাউস পিয়াসা: আইন বিভাগ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- চারদিক
