ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

ছাইচাপা আগুন মার্তেনেল্লি

ছাইচাপা আগুন মার্তেনেল্লি
×

ছবি- এএফপি

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, হিউস্টন থেকে

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫৩

গোলপোস্টের কাছে এসে যতবার মিস ফায়ারিং হয়েছে, ততবারই দুই হাত তুলে গ্যালারির তপ্ত উনুনকে আরও বেশি তাতিয়ে ওঠার ইশারা দিচ্ছিলেন ভিনিসিয়ুস। গ্যালারির প্রচণ্ড সেই গর্জনে শেষ মুহূর্তগুলোয় ছাইচাপা আগুনের মতোই বেরিয়ে আসেন গ্যাব্রিয়েল মার্তেনেল্লি। ৯৫ মিনিট পর্যন্ত যে ম্যাচটা টাইব্রেকারের নিষ্ঠুর লটারির দিকে এগোচ্ছিল, দুর্দান্ত এক গোলে সেই ম্যাচটিকেই এক ঝটকায় টেনে বের করে আনলেন এই আর্সেনাল ফরোয়ার্ড। কার্লো আনচেলত্তির মুখে তখন একচিলতে স্বস্তির হাসি। আসলে তিনিই মার্তেনেল্লিকে দিয়ে দাবার এই চালটা দিয়েছিলেন। যেখানে সবাই ধরেই নিয়েছিল দেখা যাবে নেইমারকে, সেখানে মার্তেনেল্লির গতি আর ক্ষিপ্রতা জাপানিদের ওপর চালাতে চাননি তিনি। চেয়েছিলেন ভুল। যে ভুলটা একসময় মার্তেনেল্লিকে নিয়ে করেছিল তাঁর ভাগ্য। 

যারা এদিন তাঁর পায়ে সাম্বার নবজাগরণ দেখেছে, তারা কজনই বা জানে যে কৈশোরে এই মার্তেনেল্লিকে এক-দুবার নয়; চার-চারবার ট্রায়াল দিয়েও রিজেক্ট করেছিল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। বার্সেলোনার বিখ্যাত ‘লা মাসিয়া’ একাডেমির দরজায় কড়া নেড়েও শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছিল ব্রাজিলের ইতু শহর থেকে আসা রোগা-পটকা ছেলেটিকে। বিশ্বফুটবলের দুই প্রধান পরাশক্তি যাকে একসময় অবজ্ঞা করে বলেছিল, ‘তোমাকে দিয়ে হবে না।’ হিউস্টনে বিশ্বকাপের নকআউটের মঞ্চে ডেথ ওভারে দাঁড়িয়ে সেই মার্তেনেল্লিই কিনা কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ত্রাতা! ফুটবল আসলে এভাবেই হিসাব চুকায়। যে ছেলেটি ব্রাজিলের চতুর্থ ডিভিশনের ক্লাব ইতুয়ানোতে খেলার সময় বাসে করে প্র্যাকটিসে যেতেন, আজ নিজের চোখের সামনে দেখা এই হিউস্টনের মাঠে তাঁর একটা শটেই স্তব্ধ হয়ে গেল গোটা জাপান। আসলে রিজেকশনের সেই পুরোনো ছাইচাপা আগুনটাই আজ মার্তেনেল্লির বুটে কালবৈশাখী হয়ে ঝরল।

যে আগুনটা তিনি মাঠে জ্বেলে দিয়েছিলেন, তার উত্তাপ কিন্তু ছড়িয়ে পড়েছিল কার্লো আনচেলত্তির ডাগআউটেও। জাপানি দলের যে ফুটবলার আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে এসে ব্রাজিলকে ‘পতিত দানব’ বলেছিলেন, ‘ব্রাজিল আর আগের ব্রাজিল নেই, ব্রাজিল এখন পতিত দানব। এখন সময় আর্জেন্টিনা-ফ্রান্সের।’ সেই ফুটবলার কেন্তো শায়োগাইকে খুঁজে এদিন ম্যাচ শেষে কুনিয়াহ পাঁচটি আঙুল দেখিয়ে নাকি বলেছিলেন, ‘আমরা পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন, সম্মান করতে শেখো।’ তাঁর এই ভিডিও ফুটেজ নিয়ে হিউস্টনের মিডিয়া সেন্টারে ব্রাজিলিয়ান সাংবাদিকদের মধ্যেও উত্তেজনা ছিল প্রবল। তবে ম্যাচের পর মিক্সড জোনে নাকি একটা ঝড়ের পর শান্ত বাতাস বয়ে গিয়েছিল। পাহাড়সম স্বস্তির সুর ছিল সেখানে। ‘বলটা যখন আমার পায়ে তখন শুধুই মনে হচ্ছিল, এটাই শেষ সুযোগ। শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত বিশ্বাস হারাইনি।’ মার্তেনেল্লির আগুন তখন আবারও ছাইচাপা।

ইংলিশ লিগে যারা মার্তেনেল্লিকে আর্সেনালের জার্সিতে একদম বাঁ প্রান্ত ঘেঁষে ক্ষিপ্রতার সঙ্গে দৌড়াতে দেখে অভ্যস্ত, সেই তারা কিছুটা অবাক হয়েছেন হিউস্টনে। এখানে আনচেলত্তি তাঁকে ব্যবহার করেছিলেন এক সম্পূর্ণ ভিন্ন জ্যামিতিতে। ভিনিসিয়ুস যখন জাপানি ফুলব্যাকদের উইংয়ে ব্যস্ত রাখছেন, মার্তেনেল্লিকে তখন নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল ‘ইনভার্টেড উইঙ্গার’ হিসেবে ব্লাইন্ড-সাইড দিয়ে মাঝের ফাঁকা পকেটে ঢুকে পড়তে। আধুনিক ফুটবলে যাকে বলে হাফ-স্পেসের দখল নেওয়া। জাপানের কমপ্যাক্ট ডিফেন্স তখন পুরোপুরি বিভ্রান্ত– কাকে ছেড়ে কাকে মার্ক করবে? 

শুধু তা-ই নয়, মার্তেনেল্লির ভেতরের সেই ছাইচাপা আগুন আর অদম্য ডিফেন্সিভ ওয়ার্ক-রেট কাজে লাগিয়ে আনচেলত্তি জাপানি মাঝমাঠের ওপর এক তীব্র কাউন্টার প্রেসিংয়ের জাল বুনেছিলেন। ম্যাচের শেষলগ্নে জাপানিরা যখন ক্লান্ত, ঠিক তখনই বক্সে চিত্রকরের মতো ওত পেতে রইলেন মার্তেনেল্লি। ব্রুনো গিমারায়েসের ওই ডিফেন্সচেরা পাসটা যখন বক্সে ঢুকল, জাপানি ডিফেন্ডাররা তখন ব্রাজিলের মূল স্ট্রাইকারদের সামলাতে ব্যস্ত। আর মার্তেনেল্লি? তিনি তখন ডিফেন্ডারদের চোখের আড়াল দিয়ে একদম সেন্ট্রাল পজিশনে। চোখের পলকে শরীরটাকে একটু বাঁকিয়ে নেওয়া, আর ৯৬ মিনিটে সেই নিখুঁত ফিনিশ! বুড়ো ইতালিয়ানের রণকৌশলের শেষ চালটা হিউস্টনের সবুজ ঘাসে এক রাজকীয় রূপকথা লিখে দিল। সেই সঙ্গে বিশ্বকে জানিয়ে দেখিয়ে দিলেন, তাঁর এই ব্রাজিলে সব ধরনের অস্ত্রই রয়েছে। হেক্সা মিশনে শুধু একেকটি একেক সময় বের করতে হবে।

আরও পড়ুন

×