ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

মরক্কোর কীর্তিমান সাইবারি

মরক্কোর কীর্তিমান সাইবারি
×

ছবি- এএফপি

সেকান্দার আলী

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫৬

ভালোবাসার রাজপ্রাসাদে ইয়াসিন বুনো আর ইসমাইল সাইবারিকে রাজাসনে রেখেছেন সমর্থকরা। বিশ্বকাপে শেষ ষোলোয় যাওয়ার বীরত্বগাথা পান্ডুলিপির শেষের উপাখ্যানের নায়ক তো তারাই। ইয়াসিনের হাতের মায়াবি ছোঁয়ায় কেমন শান্ত হয়ে ফিরে এলো বল। ইসমাইল সাইবারির শেষের শটে গোল করে থমকে দেন স্রোতোসিনী হাডসনকে। পেন্টাল্টি শুটআউটে তিনি জয়সূচক গোলটি করার পরই শোক নেমে এসেছিল নেদারল্যান্ডস জুড়ে। মেক্সিকোর মন্টেরে স্টেডিয়ামের একদিকে বেজেছে বিদায় রাগিনী, অন্যদিকে আনন্দেরগীতি। ডাচ শিবিরের কেউ জার্সিতে মুখ ঢেকে, কেউ মাটিতে লুটিয়ে ফেলেন চোখের জল। মরক্কোর জলসায় তখন শোরে জয়োধ্বনির সুর মিলিয়ে হয়ে উঠেছিল আনন্দ–মঞ্চ।

বিশ্বকাপের নকআউটের এই চরিত্রের সঙ্গে ভালো ভাবেই পরিচিত ফুটবলের সমর্থকরা। গ্রুপ পর্ব শেষে নকআাউট শুরুর দিন থেকেই তো বাজে বিদায়ের করুণ রাগিনি। পরাজিত দলের চোখের জলে কখনও কখনও আড়াল করে দেয় বিজয়ের উন্মাদন। বিশ্বকাপে তিন বার (১৯৭৪, ১৯৭৮ ও ২০১০) ফাইনাল খেলা নেদারল্যান্ডস তেমনই দৃষ্টি কেড়ে নেওয়া। 

ফুটবলের উদীয়মান সূর্য মরক্কোকে ফেলে দেওয়ার নয়। তারা কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট। এই বিশ্বকাপে টানা চার ম্যাচে অপরাজিত। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে ব্রাজিলকে রুখে হাকিমিরা জানান দিয়েছিলেন বিশ্বের হৃদয় জিতে নিতে তারা বিশ্বকাপে। জিব্রালটার প্রণালী স্পেন ও মরক্কোকে আলাদা করলেও ছন্দময় ফুটবলে অবিচ্ছেদ্য। ভূ-বিভাজনে মরক্কো আফ্রিকায় হলেও ইউরোপ চষে বেড়ান দেশটির খেলোয়াড়রা। বিশ্বকাপ দলের ২০ জন ফুটবলারই খেলেন ইউরোপের লিগে। গ্রুপ পর্বে টানা দুই ম্যাচে ক্ষিপ্রতায় ছুটে গিয়ে গোল করা ইসমাইল সাইবারি খেলেন পিএসভি আন্দোভেনে। মরক্কোর কৌশলেও তাই ইউরোপের ছাপ।

ব্রাজিলের গ্রুপের দ্বিতীয় সেরা হয়ে ৩২-এ উন্নীত হয় মরক্কো। ‘এফ’ গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন নেদারল্যান্ডের বিপক্ষে ১২০ মিনিটের ম্যাচে দারুণ খেলেছে দলটি। উত্তেজনার পারদ উঠেছে নানা দিক থেকে। ফুটবল শৈলির সঙ্গে খেলোয়াড়রা লিপ্ত হন শারীরিক লড়াইয়ে। একদিকে ইসমাইল সাইবারি ও ইয়ান পল ফন হেকে, অন্যদিকে ব্রায়ান ব্রোবি ও চাদি রিয়াদের মধ্যে চলছিল তুমুল লড়াই। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে জার্সি বদলাতে হয় রিয়াদকে। রক্তাক্ত সাইবারি হাল ছাড়েননি এক মুহূর্ত। 

শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে প্রভাব বিস্তার করে খেলেছে মরক্কো। ১২০ মিনিটে ৭০ ভাগ সময় বল নিজেদের দখলে রেখেছিলেন হাকিমিরা। হাই ভোল্টেজ এই ম্যাচে মরক্কো বেশ কয়েকবার গোলের সুযোগ হারায় ডাচ গোলরক্ষকের দৃঢ়তার কাছে। উত্তেজনায় ঠাসা ম্যাচে নেদারল্যান্ডসকে ৭২ মিনিটে লিড এনে দেন গ্যাকপো। এই গোলে নেদারল্যান্ডস জিতে গেলে অনাগত সন্তানের মৃত্যুর কষ্ট ভোলার উপলক্ষ্য পেতেন তিনি। সেখানে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় শোক দিগুণ হয়েছে। মূল ম্যাচের ৯১ মিনিটে মরক্কোর সেন্টার ব্যাক ইসা দিপো হেডে হোল করে সমতা আনেন। খেলার বেশিরভাগ সময় আধিপত্য বিস্তার করলেও বার্ট ভারব্রুগেনের অসাধারণ কিপিং আর পোস্টে লেগে গোল বঞ্চিত হওয়ায় ১২০ মিনিটেও বিজয় মুকুট পরা হয়নি আটলাস সিংহদের। শেষে পেনাল্টি শুটআউটে ৩-২ গোলে জয়ী হয় তারা। 

নেদাল্যান্ডস প্রথম শটে গোল করে এগিয়ে গেলেও হতাশ করে মরক্কো। নেইল এল আইনাউইনের শট ক্রস বারে লেগে গোলবঞ্চিত। নেদারল্যান্ডস দ্বিতীয় এবং চতুর্থ শট মিস করে। শেষ শট এক হাতে থামিয়ে দেন ইয়াসিন। সেখানে মরক্কোর নেইল আর হাকিমির শট মিস হলেও বাকি তিন শটে বল জাল খুঁজে নেয়। 

শেষ ষোলোতে জায়গা করে নেওয়ার পর মরক্কো অধিনায়ক এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘এটি খুব জটিল একটি ম্যাচ ছিল। আমরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ভালো প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। আমরা শেষ পর্যন্ত মনোযোগী ও একাগ্র ছিলাম। ম্যাচ জিতে আমরা গর্বিত।’ 

তিনি আরও যোগ করেন, ‘অনেকে ভেবেছিল কাতারে যা ঘটেছে তা ভাগ্যের খেলা। আসলে পরিশ্রমের ফল পাওয়া যায়। আমাদের মনোযোগী থাকতে হবে, যেমনটা শুরু থেকে ছিলাম। আমরা শেষ পর্যন্ত এভাবেই থাকব।’ শেষ ষোলোতে মরক্কোর প্রতিপক্ষ কানাডা।

আরও পড়ুন

×