ডেঙ্গুর বড় ঝুঁকি নিয়ে শুরু হলো জুলাই
তবিবুর রহমান
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩৮ | আপডেট: ০১ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
সাড়ে তিন মাস ধরে সংক্রমণ ভীতি ছড়িয়ে যাচ্ছে হাম। টিকাসহ নানা উদ্যোগেও কমছে না এই রোগের প্রকোপ। এর মধ্যেই আবার চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। শুধু জুনেই রোগী হয়েছে চার গুণ। মৃত্যুও বাড়ছে।
এ পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু মোকাবিলায় লক্ষ্যভিত্তিক মশা নিয়ন্ত্রণের তাগিদ দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এখনই পদক্ষেপ না নিলে জুলাইয়ে ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে ডেঙ্গু। আর জেলা-উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে না পারলে মৃত্যু আরও বাড়তে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারিতে ২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২ জন, মে মাসে ১ জন এবং জুনে ১৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন। জুনেই সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ সংখ্যা ২ হাজার ৯০৭। মে মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৭১৪, অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে রোগীর সংখ্যা প্রায় চার গুণ হয়েছে।
অধিদপ্তর জানিয়েছে, গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ১৮০ রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬ হাজার ১০৪ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ১৮ জন।
উদ্বেগজনক এ পরিস্থিতিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. কবিরুল বাশারের সঙ্গে কথা বলেছে সমকাল। তিনি বলেন, এখন থেকে প্রতিদিনই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়বে। জুলাই ও আগস্টে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এবার ঢাকার চেয়ে ঢাকার বাইরে সংক্রমণ বেশি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, অনেক রোগী চিকিৎসার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে ঢাকায় আসছেন। দীর্ঘ সময় যাতায়াতের কারণে রোগীর শরীরে পানিশূন্যতা ও প্লাজমা লিকেজের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে সব রোগীকেই রাজধানীতে আসতে না হয়।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু ফগিং কার্যকর নয় বলেও মন্তব্য করেন ড. কবিরুল বাশার। তিনি বলেন, মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করে সেখানে লার্ভা ধ্বংস করতে হবে। এভিডেন্সভিত্তিক লক্ষ্য-নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। পাশাপাশি জনগণকে সম্পৃক্ত করে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের উদ্যোগ নিতে হবে।
বর্তমানে ডেঙ্গুর সবচেয়ে বেশি প্রকোপ বরিশাল বিভাগে। সেখানে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৬২৯ জন। চট্টগ্রামে ১ হাজার ১৪০ ও খুলনায় ৭০১ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। ঢাকার দক্ষিণ সিটিতে সংক্রমণ বেশি। দক্ষিণে ৮৭১ জন ও উত্তরে ৫৩২ রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
বরিশাল বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, রোগীর সংখ্যা বাড়লেও পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সচেতনতামূলক কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে।
ঢাকার ২০ ওয়ার্ডে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি উদ্বেগজনক
সংক্রমণ ভয়াবহ হওয়ার শঙ্কা থাকলেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মশা নিয়ন্ত্রণে আগাম ও কার্যকর পদক্ষেপের ক্ষেত্রে এখনও ঘাটতি রয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) নিয়মিত কিছু কার্যক্রম চালালেও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রমে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে।
স্বাভাবিক নিয়মে তিন মাস পরপর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর রাজধানীতে এডিস মশার ঘনত্বের জরিপ চালায়। তবে আর্থিক সংকটের কারণে এবার সেই জরিপ হয়নি। পরে ডিএসসিসি নিজস্ব অর্থায়নে একটি জরিপ চালায়। এতে ২০টি ওয়ার্ডে এডিস মশার লার্ভার উদ্বেগজনক উপস্থিতি পাওয়া যায়। এসব ওয়ার্ডকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছে সংস্থাটি।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি রোগ না। সারাবছরই ডেঙ্গুর সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। তবে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও সতর্কতা পর্যাপ্ত নয়।
ডা. মুশতাক আরও বলেন, দেশে দুই দশক ধরে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হলেও গত ছয় বছরে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৯ সালের পর থেকে প্রায় প্রতিবছরই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। তাঁর ভাষ্য, প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে এখনও ঘাটতি রয়েছে। জেলা পর্যায়ে চিকিৎসা ব্যবস্থা শক্তিশালী না করতে পারলে মৃত্যুর হার বাড়াবে।
এদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে এবার আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, এবার ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি। ডিএনসিসি আগেই প্রস্তুতি নিয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে জরিমানাও করা হয়েছে।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সমকালকে বলেন, দেশে হাম ও ডেঙ্গু– দুই ধরনের সংক্রমণ পরিস্থিতি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছি। ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জনগণকে সচেতন হতে হবে এবং নিজ নিজ বাসাবাড়ি ও আশপাশের এলাকায় মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে হবে। সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে।
হাম পরিস্থিতি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হাম ও এই রোগের উপসর্গে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। দুই শিশুর একজন ঢাকার, অন্যজন সিলেটের। এ নিয়ে প্রায় সাড়ে তিন মাসে হাম ও হামের উপসর্গে ৭১৮ শিশুর মৃত্যু হলো। এর মধ্যে হামে মৃত্যু হয়েছে ৯৩ শিশুর।
২৪ ঘণ্টায় হাম ও এই রোগের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ৯৮০ শিশু। এর মধ্যে ১১৪ শিশু হামে এবং উপসর্গ রয়েছে ৮৬৬ শিশুর শরীরে। এ নিয়ে প্রায় সাড়ে তিন মাসে হাম ও উপসর্গে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪২-তে। ২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮২১ শিশু। একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ৭৮১ শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত ১৫ মার্চ থেকে ১ লাখ ১ হাজার ৭৭ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেয়। এর মধ্যে হাম শনাক্ত হয়েছে ১১ হাজার ৯৬৫ শিশুর। এ সময়ে হাম ও এই রোগের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৮৪ হাজার ৬২৭ শিশু। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৮০ হাজার ৯৭৪ জন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যাপ্ত টিকাদান কাভারেজ না থাকায় হামের প্রকোপ দীর্ঘায়িত হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক রোগ নিয়ন্ত্রণ পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, হামের সংক্রমণ থামাতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হয়। তবে যেসব এলাকা থেকে বেশি রোগী আসছে, সেখানে সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হয়নি। ফলে ভাইরাসের সংক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির প্রচার-প্রচারণাও যথেষ্ট ছিল না। এবার ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও অনেক অভিভাবক সে বিষয়ে জানতেন না। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চল, বস্তি এবং কম সচেতন জনগোষ্ঠীর কাছে তথ্য পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম মুশতাক হোসেন বলেন, হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় প্রথম ধাপে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চালানো হয়েছে। তবে শুধু জরুরি কর্মসূচি দিয়ে দায়িত্ব শেষ হয় না। নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমের আওতায় স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাবঞ্চিত শিশুদের শনাক্ত করে টিকা নিশ্চিত করতে হবে। এ প্রক্রিয়াকে মাইক্রোপ্ল্যানিং বলা হয়। তিনি বলেন, বাস্তব পরিস্থিতি উপেক্ষা করলে সমস্যার সমাধান হবে না। যেসব শিশু এখনও টিকা পায়নি, তাদের দ্রুত টিকার আওতায় আনতে হবে এবং নির্ধারিত সময় অনুযায়ী দ্বিতীয় ডোজ নিশ্চিত করাও জরুরি।
হাম প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হাম নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ও বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার করা হচ্ছে, যাতে কোনো শিশু টিকার বাইরে না থাকে।
