আবহাওয়া অধিদপ্তরের পাঁচ রাডারের চারটি অকেজো
রংপুরের নতুন রাডার ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণের এক বছরের মাথায় অচল
আবহাওয়া অধিদপ্তর
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩১ | আপডেট: ০১ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের কোথাও তাপপ্রবাহ, কোথাও ভারী বৃষ্টি। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এরই মধ্যে কয়েকটি জেলার জন্য সতর্কতা জারি করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু এখন দেশজুড়ে পূর্ণ শক্তিতে সক্রিয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি, তীব্র বজ্রঝড় ও দমকা হাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এমন সময়ে আকাশের মেঘের গতি, বৃষ্টির অবস্থান কিংবা বজ্রঝড়ের গতিপথ সম্পর্কে কয়েক ঘণ্টা আগেই নির্ভুল তথ্য পাওয়া জরুরি। অথচ দেশের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি আবহাওয়া রাডার নেটওয়ার্ক এখন ভেঙে পড়েছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর পরিচালিত পাঁচটি আবহাওয়া রাডারের মধ্যে বর্তমানে চারটিই অচল। কার্যকর রয়েছে শুধু ঢাকার একটি রাডার। উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল এবং কক্সবাজার উপকূলের বিশাল এলাকা এখন কার্যত কার্যকর রাডার পর্যবেক্ষণের বাইরে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে যখন চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়ছে, তখন দেশের রাডার নেটওয়ার্কের এমন অবস্থা উদ্বেগজনক। এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের হুমকি।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের পাঁচটি রাডার স্থাপন করা হয়েছে ঢাকা, রংপুর, মৌলভীবাজার, কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর খেপুপাড়ায়। এর মধ্যে রংপুরের নতুন রাডারটি ১৭ জুন থেকে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ। কক্সবাজারের রাডার প্রায় তিন বছর ধরে অচল। পটুয়াখালীর খেপুপাড়ার রাডার বন্ধ আট বছর। মৌলভীবাজারের রাডারও কয়েক বছর ধরে অকেজো।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক রাডারের যন্ত্রাংশ পুরোনো হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব যন্ত্রাংশ আর পাওয়া যায় না। ফলে চাইলেও সেগুলো মেরামত করা সম্ভব না। অনেক ক্ষেত্রে পুরো রাডার ব্যবস্থাই নতুন করে স্থাপন করতে হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে রংপুরের নতুন রাডারটি। দীর্ঘ ১২ বছর অপেক্ষার পর গত বছরের মে মাসে রাডারটি চালু হয়েছিল। এর আগে রংপুরের পুরোনো রাডার ২০১২ সালের পর পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। ১৯৯৯ সালে জাপানের অর্থায়নে উত্তরাঞ্চলে প্রথম ডপলার আবহাওয়া রাডার স্থাপন করা হয়। কিন্তু স্থাপনের মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই এতে ত্রুটি দেখা দেয়। ২০০৭ সালে বড় ধরনের যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দেয় এবং ২০১২ সালে তা পুরোপুরি অকেজো হয়ে যায়। এর পর প্রায় এক যুগ ধরে দেশের উত্তরাঞ্চলে কোনো কার্যকর আবহাওয়া রাডার ছিল না।
এ দীর্ঘ সময়ে উত্তরাঞ্চলে একাধিক আকস্মিক বন্যা, শিলাবৃষ্টি, কালবৈশাখী এবং অতিবৃষ্টির ঘটনা ঘটেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, নির্ভুল এবং সময়োপযোগী আবহাওয়া তথ্যের অভাবে বিভিন্ন সময়ে কোটি কোটি টাকার ফসলহানি হয়েছে। অনেক কৃষক আগাম সতর্কতা না পেয়ে বোরো ধান, ভুট্টা, গম ও সবজির ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
রংপুরের নতুন রাডার স্থাপন প্রকল্পটিও নানা কারণে বিলম্বিত হয়। ২০১৫ সালে জাপানি নাগরিক হোশি কোনিও হত্যাকাণ্ডের পর নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রকল্পের অগ্রগতি থমকে যায়। পরে করোনা মহামারির কারণে কাজ আরও পিছিয়ে পড়ে। অবশেষে জাইকা ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন রাডার নির্মাণ করা হয়। জাপানের শিমিজু করপোরেশন নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে এবং সরঞ্জাম সরবরাহ করে মারুবিনি করপোরেশন। গত বছরের ১১ মে জাপানি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে রাডারটি বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করে।
নতুন এই রাডারটি চারদিকে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার এলাকা পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম ছিল। এর মাধ্যমে ঝড়, বজ্রপাত, বৃষ্টিপাত, শিলাবৃষ্টি, মেঘের গঠন, আর্দ্রতা, জলীয় বাষ্পের গতি, তাপমাত্রা এবং বায়ুর গতিবেগ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যেত। রাডারের তথ্য ব্যবহার করে লাইভ আবহাওয়া মানচিত্র তৈরি করা হতো। শনাক্ত করা যেত বিমান চলাচলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাও।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ প্রকৌশলী মোস্তাফিজার রহমান বলেন, এই রাডারের মাধ্যমে শুধু বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল নয়; ভারতের বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, মেঘালয়, আসাম, মণিপুর, ত্রিপুরা, মিজোরাম, অরুণাচল প্রদেশ, এমনকি নেপাল, ভুটান এবং তিব্বতের আবহাওয়াও পর্যবেক্ষণ করা যেত। আমরা বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। জাপানের একটি দল অকেজো রাডারটি ঠিক করতে বাংলাদেশে এসেছে। কিছু দিনের মধ্যেই তারা রংপুরে আসবে।
একইভাবে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মৌলভীবাজারের রাডারটিও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। সিলেট ও সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল প্রতিবছরই আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিতে থাকে। ভারতের মেঘালয় পাহাড়ে ভারী বৃষ্টি হলেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সীমান্তবর্তী নদীগুলোর পানি বেড়ে যায়। এ ছাড়া এই অঞ্চলে বজ্রপাতের ঘটনাও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে বেশি ঘটে। মৌলভীবাজারের রাডারটি সচল থাকলে মেঘের গতিবিধি, বৃষ্টির তীব্রতা এবং বজ্রঝড়ের বিষয়ে দ্রুত তথ্য পাওয়া যেত। তবে কয়েক বছর ধরে এটি অচল থাকায় সিলেট বিভাগের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
উপকূলীয় অঞ্চলের অবস্থাও ভিন্ন নয়। বাংলাদেশের প্রায় ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলরেখা ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নিম্নচাপের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট প্রায় প্রতিটি নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রথম আঘাত হানে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে। এই অঞ্চলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কক্সবাজার এবং পটুয়াখালীর খেপুপাড়া রাডার। তবে দুটি রাডারই দীর্ঘদিন অচল।
কক্সবাজারের রাডার স্টেশনটি ১৯৬৯ সালে স্থাপন করা হয়। পরে ২০০৭ সালে জাপান সরকারের আর্থিক সহায়তায় এটি আধুনিকায়ন করা হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৬০ ফুট উঁচু পাহাড়ের ওপর অবস্থিত রাডারটি ৪০০ কিলোমিটার দূরের সমুদ্র এলাকার আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করতে পারত। ২০২৩ সালের আগস্টে এটি অচল হয়ে যায়। এর পর প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এটি সংস্কারের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া হাজারো জেলে এখন দুর্যোগ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ আবহাওয়া তথ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
কক্সবাজার আবহাওয়া কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বলেন, কক্সবাজারের রাডারটি সচল থাকলে সমুদ্র এলাকার আরও নির্ভুল তথ্য পাওয়া যেত। বর্তমানে দেশের অন্য রাডার এবং আন্তর্জাতিক তথ্যের ওপর নির্ভর করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হচ্ছে। জাপানের সংস্থা এসে পরিদর্শন করে গেছে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়েছে। নতুন করে যন্ত্রপাতি বসাতে হবে। এ-সংক্রান্ত নথি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে আছে।
পটুয়াখালীর খেপুপাড়া রাডার স্টেশনও আট বছর ধরে বন্ধ। ২০১৮ সালের ২৬ এপ্রিল যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। স্টেশনটির ট্রান্সমিশন এবং সার্ভে সিস্টেমের যন্ত্রাংশ নষ্ট হওয়ার পর থেকে এটি আর সচল করা যায়নি। রাডারটি আগে ৪০০ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ নির্ধারণ, বৃষ্টির তীব্রতা বিশ্লেষণ এবং উপকূলের জন্য জরুরি সতর্কতা দিতে পারত।
কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন, একটি আধুনিক আবহাওয়া রাডার প্রতি ১ থেকে ৫ মিনিট অন্তর বৃষ্টির অবস্থান, মেঘের গতি, শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনা, বাতাসের গতিবেগ এবং ঝড়ের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তথ্য দেয়। শিলাবৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে আবহাওয়া রাডারের বিকল্প নেই। একইভাবে কোনো ঘূর্ণিঝড় উপকূল থেকে ৪০০ কিলোমিটারের মধ্যে এলে তার অবস্থান, গতিপথ, বৃষ্টির বিস্তার এবং বাতাসের গতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রাডার থেকেই পাওয়া যায়। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশে কার্যকর রাডার নেটওয়ার্ক থাকা বিলাসিতা নয়, বরং মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষার জন্য অত্যাবশ্যক অবকাঠামো। দেশের অধিকাংশ রাডার অচল থাকায় আবহাওয়া অধিদপ্তরকে এখন অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশ এবং আন্তর্জাতিক আবহাওয়া সংস্থার তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, স্থানীয় পর্যায়ের দুর্যোগ পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য নিজস্ব রাডার ব্যবস্থার বিকল্প নেই। শুধু নতুন রাডার স্থাপন করলেই হবে না; এগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশের সরবরাহ নিশ্চিত করা, দক্ষ জনবল তৈরি এবং একটি সমন্বিত জাতীয় আবহাওয়া রাডার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলাও জরুরি।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ বলেন, নতুন রাডার নির্মাণের জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হয়ে গেছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ আশরাফ উদ্দিন বলেন, কক্সবাজারসহ সারাদেশে নতুনভাবে তিনটি রাডার সিস্টেম চালু করা হবে, যা ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ পুরোপুরি চালু হবে। জাপান সরকারের অর্থায়নে তৈরি হওয়া রাডার স্টেশনের সরঞ্জামগুলো বর্তমানে বাজারে পাওয়া না যাওয়ায় সংস্কার করা যাচ্ছে না। যে কারণে অবকাঠামো ঠিক রেখে নতুন সিস্টেমে রাডার স্থাপন করতে হচ্ছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এই রাডার সিস্টেমের মেয়াদকাল ৮ থেকে ১০ বছর হবে।
- বিষয় :
- আবহাওয়া
- বৃষ্টি
- তাপপ্রবাহ
- বন্যা
- আবহাওয়া অধিদপ্তর
