পেঁয়াজ পানিতে
ভালো ফলনের সহিত ব্যবস্থাপনাও জরুরি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
মৌসুম চলিয়া গেলে পেঁয়াজ দেড়শ টাকা কেজিতেও ক্রয় করিতে হয়, মৌসুমে তাহার মূল্য পানিতে পড়িয়া নির্ধারণ হইতেছে। অথচ উচ্চমূল্যে খাদ্যদ্রব্য আমদানির প্রয়োজন হইলেই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা লইয়া সমবেত কণ্ঠে আক্ষেপ ঝরিয়া পড়ে। এই দিকে বাস্তবতা হইতেছে, অধিক উৎপাদন হইলেও কৃষককে সড়কে আলু ফেলিতে হয়, ক্ষেতে টমেটো পচিয়া যায় আর পেঁয়াজের গতি হইয়া থাকে পানিতে। অধিক মূল্যে অন্য দেশ হইতে আমদানিকৃত পণ্যটি সুনজরে থাকিবে, বলিবার অপেক্ষা নাই। তাই বলিয়া নিজের কাঁচা ঘরখানি খাসা হইবে না কেন? কেন তাহা রক্ষার উদ্যোগ থাকিবে না? কেননা, দীর্ঘ মেয়াদে সংরক্ষণ, বাজারমূল্য নির্ধারণ, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদনের বীজ লইয়া গবেষণার প্রয়োজন আমরা কস্মিনকালেও অনুভব করি নাই। সর্বোপরি রোদে পুড়িয়া কাদামাটি মাখিয়া ফসল উৎপাদনকারী ব্যক্তিটি নগরের সৌম্যকান্তি শিক্ষিত নীতিনির্ধারকদের নিকট সর্বদাই পর হইয়া রহিয়াছেন। সেই সকল কৃষকের ব্যথা উপলব্ধি করিবার অবকাশ নাই কাহারও।
সমকালের ২৮ জুন প্রকাশিত প্রতিবেদন বলিতেছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতি মণ পেঁয়াজ বিক্রয় হইতেছে মাত্র ৮০০ হইতে ৯০০ টাকায়। কোথাও কোথাও ৬০০ হইতে ৭০০ টাকায় নামিয়াছে। অথচ কৃষকের দাবি, এক মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে ব্যয় হইয়া থাকে অন্তত দেড় সহস্র টাকা। ফলে উৎপাদন খরচ দূরের কথা, মূলধনও তুলিতে পারিতেছেন না কৃষক। এই ক্ষোভে তাহারা পেঁয়াজ নষ্ট করিতেছেন। রাজবাড়ী, ফরিদপুর, পাবনা, কুষ্টিয়া ও রাজশাহীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলের হতাশ চাষিরা বলিতেছেন, এইভাবে লোকসান চলিতে থাকিলে আগামী মৌসুমে আর পেঁয়াজ চাষ সম্ভবপর হইবে না। এই সংকট আলু চাষেও। গত সপ্তাহেই হিমাগারের ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে সড়কে আলু ফেলিয়া প্রতিবাদ করিয়াছেন কৃষক।
কৃষকের এই অভিমানের সম্মুখে দাঁড়াইয়া গত বৎসরের বাজারদর স্মরণ করাইয়া দিতে হয়। গত ডিসেম্বরে এক সপ্তাহের ব্যবধানে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৪০ টাকার অধিক দিয়া ক্রয় করিতে হইয়াছিল। এমনকি আমদানির অনুমোদন প্রসঙ্গে একজন ব্যবসায়ী মৌসুমে একবারই আমদানির সুযোগ পাইবেন– এমন নীতিও গ্রহণ করিতে হইয়াছিল। যদি পেঁয়াজ উৎপাদনকারী সকল কৃষক এই মৌসুমে একই সঙ্গে সকল পেঁয়াজ বিক্রয় না করিতে চাহিতেন; যদি ফলন হাইব্রিড পেঁয়াজের না হইত; যদি সংরক্ষণ সহজ হইত, তাহা হইলে কি এই দশা হইত?
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলিতেছে, যেই পেঁয়াজ কেজিতে এখন ৪৫ টাকা করিয়া খুচরা বাজারে বিক্রয় হইতেছে, তাহা কৃষকের নিকট হইতে ক্রয় করা হয় ২০ টাকা দরে। অর্থাৎ মধ্যবর্তী এই মূল্যটি যাইতেছে পণ্য পরিবহন ও মধ্যস্বত্বভোগীর নিকট। অর্থাৎ উৎপাদকের সমান ব্যয় লইয়া যাইতেছেন মধ্যস্বত্বভোগীরা। খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার স্বপ্ন দেখিলে বাজার ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিবার বিকল্প নাই। এইরূপ পরিস্থিতিতে স্থায়ী সমাধানের দিকে অগ্রসর হইতে হইবে নীতিনির্ধারকদিগের। বলিয়া রাখা প্রয়োজন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন বৃদ্ধি পাইয়াছে দেড় লক্ষ টনের অধিক। সরকারি সংস্থা যেমন ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে সরাসরি কৃষকদের নিকট হইতে পেঁয়াজ সংগ্রহের ব্যবস্থা জোরদার করিতে হইবে। সংরক্ষণের জন্য শুধু কৃষকদিগের মধ্যে এয়ারফ্লো মেশিন বিতরণ করিলেই হইবে না। বৎসরব্যাপী সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। বাজার তদারকি কঠোর করিতে হইবে। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে কেহ যেন পণ্যের মজুতদারি করিতে না পারে, সেই দিকে নজর রাখিবার দায়িত্বও সরকারের। অন্যথায় প্রতিবৎসর তাহাদের এইরূপ লোকসানের শিকার হইতে হইবে। দারিদ্র্য চাপাইয়া দিলে; অজ্ঞতা বিরাজ করিলে সেইখানে মানুষ বা সম্পত্তি কোনোটি আর নিরাপদ থাকিতে পারে না। হাওরের ধান ডুবিলে কৃষকের চোখে পানি। আবার পেঁয়াজের ভালো ফলনের পরও একই দৃশ্য। আমাদের কৃষকরা ফলন খারাপে অনিরাপদ; ফলন ভালো হইলেও নিরাপদ নহেন।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
