ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

সাক্ষাৎকার : অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দলীয় রাজনীতি থেকে রেহাই দিতে হবে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দলীয় রাজনীতি থেকে রেহাই দিতে হবে
×

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন

মাহফুজুর রহমান মানিক

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৫ | আপডেট: ০১ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪১

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করছেন, মতামত রাখছেন। তিনি স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ১৯৯৬ সালে লন্ডনের ব্রুনেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ওআরএস স্কলারশিপ নিয়ে পিএইচডি করেন। ২০০১ সালে জার্মানির বিখ্যাত হামবোল্ট ফেলোশিপ নিয়ে বার্লিনের পটসডাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট ডক্টরাল গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। তাঁর শিক্ষকতা শুরু ১৯৯২ সালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে; ১৯৯৯-এ যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৬ সালে কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুনের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সমকালের জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক মাহফুজুর রহমান মানিক

সমকাল: আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন দীর্ঘদিন ধরে। বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আপনার নিজস্ব বোঝাপড়া আছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আপনার ভাবনা জানতে চাই। 

কামরুল হাসান মামুন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জন্মের প্রসব বেদনা আছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির জন্য মানুষ আন্দোলন করেছে; এর বিরোধিতাও ছিল। সৌভাগ্যবশত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর বা উপাচার্য ছিলেন একজন বিদেশি; পি. জে. হার্টগ। তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের বেতন ছিল ৮০০ রুপি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তৎকালীন ভারতের জ্ঞানের সেন্টার অব গ্র্যাভিটি ছিল কলকাতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে উন্নত বিশ্ববিদ্যালয় বানাতে হলে; কলকাতা থেকে মেধাবী তরুণদের আনতে হলে বেতনটা ওখানকার তুলনায় আকর্ষণীয় হতে হবে। তাই তিনি এখানে করলেন ১২শ রুপি এবং এ কারণেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষক যারা ছিলেন, তাদের অনেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সত্যেন বোস, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ ও রমেশচন্দ্র মজুমদার। সত্যেন বোসকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য তখন উপাচার্য নিজে বেশ কয়েকটি চিঠি আদান-প্রদানের মাধ্যমে নিয়োগের শর্ত নিয়ে দরকষাকষি করেছিলেন এবং তাঁকে এখানে আনতে সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। কতটা মমত্ববোধ এবং গুরুত্ব দিলে একজন শিক্ষক নিয়োগে এতটা সময় ব্যয় করেছেন একজন উপাচার্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আজকের শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি আর ১০০ বছর আগের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এখনও মাস্টার্স ডিগ্রি পাস প্রভাষক নিয়োগ দেওয়া হয়। অথচ বিশ্ব সেখান থেকে অনেক দূরে এগিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা এখন শুধু পিএইচডি না; সঙ্গে পোস্টডক অভিজ্ঞতাও চাওয়া হয়। 

সমকাল: তার মানে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুটা ভালো ছিল, এখন খারাপ হয়েছে?

কামরুল হাসান মামুন: হ্যাঁ। আমাদের সবকিছুই শুরুতে ভালো হয়; পরে মান নষ্ট হয়ে যায়। যেমন আমাদের একটি মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান স্পারসো আছে। এটিও শুরুতে খারাপ ছিল না। যোগ্য মানুষ নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তারপর মান নষ্ট হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেটা হয়েছে; রাজনীতি ঢুকে আস্তে আস্তে পোকার মতো ধ্বংস করে ফেলেছে।

সমকাল: সম্প্রতি ইউজিসি আয়োজিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কর্মশালায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, রাজনৈতিকভাবে শিক্ষক নিয়োগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে গেছে।

কামরুল হাসান মামুন: শিক্ষক নিয়োগে দলীয়করণ বাদ দিতে না পারলে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল্য থাকল না। বাস্তবে সম্প্রতি দুই ডজন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, উপ-উপাচার্যসহ যেসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তা পুরোপুরি দলীয় পরিচয় দেখে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য নিয়োগ এতটা গুরুত্বপূর্ণ হতো না, যদি এমআইটি, হার্ভার্ড, কেমব্রিজ, সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বা পৃথিবীর খ্যাতিমান বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উপাচার্য শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতেন; যদি শিক্ষক নিয়োগে তাঁর কোনো সংযোগ না থাকত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮০টির বেশি বিভাগ আছে এবং সব বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডের প্রধান উপাচার্য অথবা উপ-উপাচার্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন শিক্ষক অন্তত ৩৫ বছর ছাত্রদের পাঠদান করেন। মান ঠিক না থাকলে এই দীর্ঘ সময় শিক্ষার্থীরা ভুগবে। আজকের বিশ্ববিদ্যালয়ের মান খারাপ হওয়ার এটি একটি বড় কারণ। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে সারাবিশ্বে তিন থেকে চারটি স্তর থাকে। আমাদের সিস্টেম পুরোপুরি স্বৈরাচারী। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বৈরাচারী পদ্ধতি থাকলে দেশে কেন স্বৈরাচারী ব্যবস্থা হবে না? সরকারও বুঝে ফেলছে– উপাচার্যকে নিয়ন্ত্রণ করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব নিয়ন্ত্রণ করা যায়।  

সমকাল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ইউজিসির (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন) এবারের বাজেট নিশ্চয়ই আপনার চোখে পড়েছে। 

কামরুল হাসান মামুন: দেশের ৫৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ব্যয় নির্বাহের জন্য মোট ১২ হাজার ৩০০ কোটি ৪ লাখ টাকা বা এক বিলিয়ন ডলার বাজেট অনুমোদন করেছে। অথচ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একারই বাজেট ৬.৭ বিলিয়ন ডলার। তুলনাটা দিলাম স্কেলটা বোঝার জন্য। সমান দিতে হবে না। কিন্তু ১০ ভাগের এক ভাগ দিন বা ২০ ভাগের এক ভাগ দিন। ৪০ হাজার ছাত্রের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ৯৪৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা দিতে পারেন না। ভারতের এক নম্বর বিশ্ববিদ্যালয় ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের ছাত্রসংখ্যা পাঁচ হাজারের একটু বেশি এবং তাদের বাজেট এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এই তুলনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অন্তত এর চার থেকে সাত গুণ দেওয়া উচিত। বর্তমানে বরাদ্দকৃত বাজেট খুবই কম। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে বাজেট, তার সিংহভাগই চলে যায় শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায়। এবার শুনেছি, গবেষণায় শূন্য বাজেট। গত বাজেটে ছিল ২১ কোটি টাকার মতো। ২১ কোটি টাকা গবেষণায় বরাদ্দ দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যে পরিমাণ বিশ্বমানের গবেষণা করেন, তা শুনলে পৃথিবী চমকে উঠবে। শিক্ষকদের বেতনের কথা আর কী বলব! দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা যেখানে চার লাখ টাকা বেতন পান, সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের বেতন তার তিন বা চার ভাগের এক ভাগ। এ জন্য তারা অন্যত্র সময় দেন। 
অনেকের সঙ্গে আলাপ করে ধারণা করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ শিক্ষক অন্যত্র পড়ান। এই পরিমাণ বেতন দিয়ে শিক্ষককে আমি বলতে পারব না– ‘তুমি পার্টটাইম শিক্ষকতা করো না।’ সে জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো শিক্ষার্থীরা এখন শিক্ষক হতে চায় না।
সমকাল: তারা কী করেন?

কামরুল হাসান মামুন: আমি ৩৫ থেকে ৪০ জন শিক্ষার্থীর মাস্টার্সের থিসিস সুপারভাইজ করেছি। এর মধ্যে ২৫ জন আমেরিকায় পিএইচডি করতে গেছে। কিন্তু তাদের কেউ আজ পর্যন্ত দেশে ফিরে আসেনি। ক্লাসের প্রথম দিকে যারা থাকে, অধিকাংশই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চায় না। কেউ প্রভাষক পদে নিয়োগ পেলে পিএইচডি করতে গিয়ে আর ফিরে আসতে চায় না।   

সমকাল: কিছুদিন আগে কথা উঠেছে– বাংলা, ইতিহাস, দর্শনসহ ছয় বিষয়ে অনার্স পড়া বাতিল হচ্ছে। পরে অবশ্য সরকার তা নাকচ করেছে। তবে উচ্চশিক্ষায় সংস্কার তো প্রয়োজন?

কামরুল হাসান মামুন: এই বিভাগগুলো না বুঝেই বন্ধ করার কথা বলা হচ্ছে। ইতিহাস বিভাগ বাংলাদেশের অনেক জ্ঞানী-গুণী তৈরি করেছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নানা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলা, ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। সংস্কার দরকার আছে। একটা পরিকল্পনা করতে হবে– আমাদের কত গ্র্যাজুয়েট দরকার; কতগুলো ডিপার্টমেন্ট কীভাবে পরিচালিত হবে। কিছু বিষয়ের শুধু মাস্টার্স থাকতে পারে; আন্ডারগ্র্যাজুয়েট দরকার নেই। কিন্তু তা করার জন্য একটি শিক্ষানীতি জরুরি। এখন দেখা যাচ্ছে, মন্ত্রী-আমলারাই শিক্ষাবিদ হয়ে উঠেছেন।  

সমকাল: সম্প্রতি একজন প্রতিমন্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে মন্তব্য করেছেন। যদিও তিনি তা প্রত্যাহার করে ব্যাখ্যা দিয়েছেন…।

কামরুল হাসান মামুন: হতে পারে তিনি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ইচ্ছাকৃত বিরোধ তৈরি করতে চাইছেন অথবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে তাঁর ধারণা অস্পষ্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমালোচনা আমিও করি। একে আরও উন্নত করার অনেক সুযোগ আছে। কিন্তু তুলনা করলে যত বিশ্ববিদ্যালয় আছে, তার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই সেরা। আমাদের শিক্ষার্থীরা পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে পড়াশোনা করছে, তার ধারেকাছে কেউ নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে মানের শিক্ষক; তাদের সম্মানজনক বেতন দিক, তাদের মাধ্যমে গবেষণাসহ অনেক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

সমকাল: আপনি সুযোগ পেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতির জন্য কোন পদক্ষেপগুলো নিতেন?

কামরুল হাসান মামুন: আমার হাতে ক্ষমতা থাকলে শিক্ষকদের বেতন তিন গুণ করতাম। নিশ্চিত করতাম, যাতে কোনো শিক্ষক কোথাও পার্টটাইম পড়াতে না পারেন। সেখানে বিশ্বের ভালো ভালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিন মাস থেকে ছয় মাস বা এক বছরের জন্য গেস্ট প্রফেসর নিয়ে আসতাম। প্রতি ডিপার্টমেন্টে অনেক গেস্ট প্রফেসর আসতেন; ছয় মাস বা এক বছর থাকতেন; একটি কোর্স পড়িয়ে চলে যেতেন। প্রয়োজনে ইন্টারন্যাশনাল হোস্টেলকে আন্তর্জাতিক মানের বানাতাম তাদের থাকার ব্যবস্থা করতে। এতে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশই ভিন্ন হতো না; বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাঙ্কিং বাড়ত। শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক মানের এক্সপোজার বাড়ত। বিশ্বমানের শিক্ষক হওয়ার জন্য আমাদের মধ্যেও প্রতিযোগিতা হতো। ভারতের আইআইটিগুলোর অবস্থা এ রকম। 

সমকাল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বললেই প্রাচ্যের অক্সফোর্ডের কথা বলা হয় কেন? 

কামরুল হাসান মামুন: প্রাচ্যের অক্সফোর্ড এখন একটি হাস্যরসের ব্যাপার হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে তৈরি করা হয়েছে। যেমন– হাউস টিউটর অক্সফোর্ডে আছে। অক্সফোর্ডের কাঠামো অনুসরণ করার জন্যই বলা হয়। এমন না যে, আমরা খুব ভালো পড়াই বা ভালো গবেষণা করি।

সমকাল: তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের ক্রান্তিলগ্নে অবদান রাখছে। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং সর্বশেষ জুলাই অভ্যুত্থানে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবদান অপরিসীম।

কামরুল হাসান মামুন: দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সকল আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়টির নেতৃত্ব একটি ইউনিক বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম হবে পড়াশোনা আর গবেষণা দিয়ে। সে ক্ষেত্রেও পরিকল্পনা থাকতে হবে।

সমকাল: নতুন গণতান্ত্রিক সরকার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হল দখলের রাজনীতিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

কামরুল হাসান মামুন: কেউই চাইবে না গত ১৬-১৭ বছরের মতো হল দখলের রাজনীতি ফিরে আসুক। তবে দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকলে হল দখলের ভয় অমূলক নয়। ৫ আগস্টের পর হলের গেটে পোস্টার লাগানো হয়েছিল– ‘আমরা কোনো ছাত্র রাজনীতি চাই না’। সাধারণ ছাত্র ও অভিভাবকদেরও এই দাবি। দেখুন ভারতের যে বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন– আইআইটি, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স ওয়ার্ল্ড র‍্যাঙ্কিংয়ে ভালো করছে। সেগুলোতে শিক্ষক এবং ছাত্র রাজনীতি নেই। আর যেখানে ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি আছে, সেগুলো খুবই খারাপ করছে। হ্যাঁ, হলে ডিবেটিং ক্লাব থাকবে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা ইত্যাদির মধ্য থেকে নেতৃত্ব তৈরি হবে। আমরা চাই ক্যাম্পাসে দলীয় রাজনীতি বিশেষ করে হল দখলের রাজনীতি থেকে সরকার ফিরে আসুক।

সমকাল: ‘ইন্ডাস্ট্রি একাডেমিয়া কোলাবোরেশন’-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে না?

কামরুল হাসান মামুন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেটা করতে পারে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেমন তার অ্যালামনাইদের থেকে ফান্ড কালেকশন করতে পারে, তেমনি শিল্প মালিকদের থেকেও নিতে পারে। কিন্তু উন্নত বিশ্বের মতো শিল্প মালিকরা কেন এগিয়ে আসছেন না? কারণ তারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রত্যাশিত মানবসম্পদ পাচ্ছেন না। আবার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও মার্কেট সেভাবে বিবেচনা করছে না। এই সমন্বয় জরুরি। আমাদের ভালো শিক্ষার্থীরা দেশে থাকতে চায় না; বিদেশে চলে যায়। যারা দেশে থাকে, তাদের অনেককে আবার সেভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

সমকাল: একটা অংশ সরকারি চাকরিতে ঝুঁকছে…।

কামরুল হাসান মামুন: হ্যাঁ, বিসিএসের পেছনে ঘুরছে অনেকে। সরকারি চাকরির জন্য অনেকের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনাও গুরুত্বহীন। প্রশ্ন হলো, বিসিএসের জন্য একটা অংশ কেন এতটা মরিয়া? তাদের বেতন তো ওই কলেজের একজন শিক্ষকের সমান। সম্প্রতি দেখলাম এনবিআরে কর্মরত একজন, ঢাকা শহরে নাকি তাঁর ৫৮টি বা তারও বেশি ফ্ল্যাট। ৫০০ কোটি টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাওয়া গেছে। আরও অনেকের এমন সম্পদ প্রকাশ পেয়েছে। প্রশ্ন হলো, সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে অপ্রকাশিত এমন সম্পদের মালিক কতজন? বিসিএসে যদি এ রকম সুযোগ-সুবিধা থাকে; ক্ষমতা, অর্থ সবকিছু– সে জন্যই অনেকে এর পেছনে ঘুরবে। তবে আমাদের যেসব মেধাবী বিদেশে আছে, তাদের যদি দেশে এনে প্রশাসনে কাজে লাগানো যেত, তাহলে প্রশাসনের পরিস্থিতি হয়তো ভিন্ন হতো। 

সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

কামরুল হাসান মামুন: আপনাকেও ধন্যবাদ।

আরও পড়ুন

×