ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

বিশ্ব শান্তি

জাতিসংঘের অচলাবস্থা এবং পরবর্তী মহাসচিবের চ্যালেঞ্জ

জাতিসংঘের অচলাবস্থা এবং পরবর্তী মহাসচিবের চ্যালেঞ্জ
×

শশী থারুর ও ইডি ম্যাথিউ

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

জাতিসংঘের দ্বিতীয় মহাসচিব দ্যাগ হামারশোল্ড একবার মন্তব্য করেছিলেন, জাতিসংঘ ‘মানবজাতিকে বেহেশতে নিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি করা হয়নি, বরং মানবতাকে দোজখ থেকে বাঁচাতে’ তৈরি করা হয়েছে। তাঁর এ বক্তব্য জাতিসংঘের উদ্দেশ্যের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ। তিনি বলেছিলেন, তাঁর এই মন্তব্য বিশ শতকের প্রথমার্ধের কঠিন শিক্ষাগুলো মনে করিয়ে দেয়– যখন দুটি বিশ্বযুদ্ধ, গণহত্যা, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন এবং হলোকাস্ট ও হিরোশিমার ভয়াবহতা পৃথিবীর এক বিশাল অংশকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল। জাতিসংঘ কখনোই একটি নিখুঁত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য তৈরি হয়নি। এর মূল লক্ষ্য ছিল যাতে এ ধরনের মহাবিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি আর কখনও না হয়। প্রতিষ্ঠার ৮০ বছর পর সেই লক্ষ্যটি আজ দিন দিন আরও বেশি নড়বড়ে মনে হচ্ছে। 

বর্তমানে সশস্ত্র সংঘাত দিন দিন বাড়ছে। কৌশলগত হিসাবনিকাশে পরমাণু যুদ্ধের ঝুঁকি ফিরে এসেছে। আন্তর্জাতিক আইন ভয়াবহ চাপের মুখে, আর বৈশ্বিক নিরাপত্তার প্রধান হাতিয়ার ‘নিরাপত্তা পরিষদ’ স্থায়ী সদস্যদের পারস্পরিক স্বার্থের দ্বন্দ্বে প্রায়ই অচল হয়ে পড়ছে। যখন আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, ঠিক তখনই বড় শক্তিগুলোর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে বহুপাক্ষিকতাবাদের ওপর মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কে পরবর্তী মহাসচিব হবেন, সেই প্রতিযোগিতা অন্যরকম গুরুত্ব পেয়েছে। যিনিই পরবর্তী প্রধান হবেন, তিনি এমন একটি দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন, যাকে প্রায়ই পৃথিবীর ‘সবচেয়ে অসম্ভব কাজ’ বলে বর্ণনা করা হয়। তবে কিছু কিছু মুহূর্ত আসে যখন এই অসম্ভব কাজগুলোই সবচেয়ে বেশি জরুরি হয়ে পড়ে।

১৯৪৫ সালের পর থেকে আন্তর্জাতিক সংঘাতগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে যে নিয়মকানুন কাজে লেগেছিল, সেগুলো আজ দৃশ্যত দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন জাতিসংঘপ্রধান দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন। শত ত্রুটি সত্ত্বেও যুদ্ধোত্তর সেই বিশ্বব্যবস্থা একটি অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছিল। তা হলো, এটি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঠেকাতে পেরেছিল। প্রক্সি যুদ্ধ, আঞ্চলিক সংঘাত বা বারবার সংকট সৃষ্টি হলেও পরাশক্তিগুলোর মধ্যে তখন সরাসরি সামরিক সংঘাত এড়ানো সম্ভব হয়।  

ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যগুলো বিলুপ্ত হয়, ডজন ডজন নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের উত্থান হয় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ক্ষেত্রে স্থানীয় সংঘাতগুলোকে বৈশ্বিক বিপর্যয় থেকে রুখে দেয়। আজ সেই অর্জনগুলো চরম হুমকির মুখে। ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ, গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ, পশ্চিম এশিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সংঘাত, দক্ষিণ চীন সাগরে উত্তেজনা এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির অবনতি ঘটেছে। এসবই ইঙ্গিত করে– পৃথিবী এখন যুক্তি বা নিয়মের চেয়ে শক্তি ও জবরদস্তির ওপর বেশি নির্ভর করতে চেয়েছে। অনেক ছোট দেশ এখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার অংশীদার হওয়ার বদলে নিজেদের কেবল ‘দর্শক’ মনে করছে।

ঠিক এ ধরনের সংকটকালেই মহাসচিবের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই দায়িত্বের সবচেয়ে সফল ব্যক্তিরা বুঝতেন, শান্তি বজায় রাখার জন্য কেবল প্রশাসনিক দক্ষতাই যথেষ্ট নয়। হামারশোল্ড সুয়েজ সংকট সমাধানে সাহায্য করেছিলেন এবং ‘শান্তি রক্ষা মিশন’কে সংঘাত ব্যবস্থাপনার একটি ব্যবহারিক হাতিয়ারে পরিণত করেন।  
বিশ্বের অন্যান্য রাজনৈতিক নেতার তুলনায় জাতিসংঘ মহাসচিব এখনও এক অনন্য বৈশ্বিক মঞ্চের প্রভাব বিস্তারকারী। তা সত্ত্বেও বর্তমানকালে এই পদের কর্মকর্তারা নিজেদের কর্তৃত্ব ব্যবহারে দিন দিন অতিরিক্ত সতর্ক ও রক্ষণশীল হয়ে পড়ছেন। কিন্তু যখন ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রগুলো অস্বস্তিকর সত্য বলতে দ্বিধা বোধ করে, তখন জাতিসংঘের এই অতিরিক্ত সতর্কতা উল্টো ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
আগামী মহাসচিবের কাজ শুধু হওয়া উচিত নয় সংকট তৈরি হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া দেখানো, বরং সংকট রূপ নেওয়ার আগেই বিপদ চিহ্নিত করা দরকার। প্রায়ই দেখা যায়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কেবল তখনই নড়েচড়ে বসে যখন সহিংসতা ও মানবিক বিপর্যয় চরম আকার ধারণ করে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে ভয়াবহভাবে। এই পদের জন্য এমন একজন প্রয়োজন, যিনি জনসমক্ষে অকপটতা ও ব্যক্তিগতভাবে বোঝানোর ক্ষমতাকে সমন্বয় করতে পারেন। এর সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে, অন্যরা কথা বলা বন্ধ করে দিলেও আলোচনাকে সচল রাখার ক্ষমতা।

জাতিসংঘ মহাসচিব চাইলেই ডিক্রি জারি করে যুদ্ধ থামিয়ে দিতে পারেন না কিংবা একা বিশ্ব রাজনীতি বদলে দিতে পারেন না। কিন্তু তিনি যা পারেন তা হলো, কূটনীতির নতুন সুযোগ তৈরি করা; যোগাযোগের পথগুলো খোলা রাখা এবং এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সমঝোতা সম্ভব হয়ে ওঠে। কাজটা এখনও অসম্ভব রয়ে গেছে। এই পরিস্থিতি হলো এমন এক পৃথিবী, যেখানে মানবতাকে নরক থেকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করার মতো আর কেউই অবশিষ্ট থাকবে না।

শশী থারুর: জাতিসংঘে সাবেক কর্মকর্তা এবং ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী;
ইডি ম্যাথিউ: জাতিসংঘের সাবেক মুখপাত্র;
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে সংক্ষেপিত
ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম 

আরও পড়ুন

×