শ্রদ্ধাঞ্জলি
সত্তর দশকে দেখা বদরুদ্দীন উমর
বদরুদ্দীন উমর
আবেদ চৌধুরী
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৮:৪২ | আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৯:০১
বদরুদ্দীন উমর, আমাদের সবার প্রিয় উমর ভাই দীর্ঘ জীবনের অধিকারী হয়েছেন। তা সত্ত্বেও তাঁর প্রয়াণ এ কারণে বেদনাদায়ক যে, তাঁর স্থান পূরণ করা হবে কঠিন। তিনি ছিলেন আজীবন আক্ষরিক অর্থে আত্মস্বার্থত্যাগী আদর্শবাদী মানুষ। দিনে আদর্শবাদ আর রাতে সে আদর্শের জলাঞ্জলি– এমন দ্বৈতাচার, যা সর্বত্র দৃশ্যমান, এ নিয়মের তিনি অন্যথা ছিলেন।
তাঁকে আমি প্রথম দেখি সত্তর দশকের প্রথমার্ধে। সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ব্রিটিশ ছাত্রী– যিনি ছিলেন প্রখ্যাত অধ্যাপক রণজিত গুহের শিষ্য ও ছাত্রী– তখন এসেছিলেন ঢাকায়, কাকতালীয়ভাবে ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরিতে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। আমি তখন এইচএসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য অপেক্ষা করছি। বিজ্ঞানের ছাত্র আমি, বিভিন্ন বামপন্থি পাঠচক্রে তখন আমার যাতায়াত ছিল। ব্রিটিশ ছাত্রীর মুখে শুনতে পাই উমর ভাইয়ের গুরুত্বের কথা। উমর ভাইয়ের ইন্টারভিউ নেওয়ার ব্যাপারে তাঁকে সাহায্য করেছিলাম।
সেই কৈশোর-যৌবনের সন্ধিক্ষণে রসায়ন-পদার্থবিদ্যা ছাপিয়ে আমি নিত্যদিন যাদের লেখায় নিমগ্ন ছিলাম, তাদের কথা এখনও মনে পড়ে। হামজা আলাভি, উৎসা পট্টনায়েক কিংবা আলবেনিয়ার নেতা আনওয়ার হোজ্জা। মার্ক্স, লেনিন, মাও কিংবা গ্রামসি তো আছেনই।আমার কিশোর মস্তিষ্কের সেই তালিকায় আরেকটি নাম ঢুকে যায়– বদরুদ্দীন উমর। পশ্চিমা তাত্ত্বিকদের মতো তাঁর শব্দাবলি, আমাদের অনগ্রসর আধা–সামন্ত বিকলাঙ্গ পুঁজির সেই সত্তরের দশকে তাঁর ইংরেজি ও বাংলা লেখাগুলো গোগ্রাসে গিলেছি।
আমার ফুফাতো বোন কোহিনূরের বিয়ে হয়েছিল আর্মির তখনকার কর্নেল দস্তগীরের সঙ্গে। দস্তগীরের পরিবার ছিল উমর ভাইয়ের বাবা আবুল হাশিমের খুব ঘনিষ্ঠ। আমি কোহিনূর আপা ও জেনারেল দস্তগীরের আত্মীয় জানতে পেরে উমর ভাই আমার সঙ্গে আত্মীয়ের মতো আচরণ করতেন।
আমি দেশে চলে আসার পর তাঁর সঙ্গে দেখা হতো, তবে আরেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু উবেদ জায়গীরদারের বাসায়। ততদিনে আমি উমর ভাইয়ের মাইলফলক বইগুলো পড়ে ফেলেছি। ‘পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ বা ‘বাংলাদেশের অভ্যুদয়’। দুই হাজারের দশকের শেষ আলোচনাগুলোতে আমি আরও বিশেষ করে বুঝতে পেরেছি তাঁর চিন্তাধারা ও গুণাবলি। দীর্ঘ আমেরিকা ও বোস্টন প্রবাসের সময় আমার রাজনীতি ও সমাজনীতি বিষয়ক চিন্তা পরিপক্ব হয়েছে। সান্নিধ্য লাভ করেছি নোম চমস্কি, এডওয়ার্ড সাঈদ ও একবাল আহমদের মতো চিন্তকদের, কেমব্রিজ-বোস্টনের বিভিন্ন আলোচনায়। সেই প্রবাসজীবন পেরিয়ে উবেদ ভাইয়ের বাসায় আলোচনায় খুঁজে পেয়েছি উমর ভাইকে নতুনতর আঙ্গিকে। মনে হয়েছে বিদেশের সেই মহিরুহ চিন্তকদের তুলনায় তিনি কোনো অংশে কম নন।
উমর ভাই রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তা পেয়েছেন উত্তরাধিকারসূত্রে। তাঁর বাবা আবুল হাশিম ছিলেন অবিভক্ত বাংলার এক ক্ষণজন্মা রাষ্ট্রচিন্তক। বর্ধমানে তাঁর জন্ম, কাজী নজরুল ইসলামের মতো। বিপ্লবী কবি ও বিপ্লবী রাজনীতিবিদের স্থান বর্ধমান আমাদের চেতনায় ভাস্বর হয়ে থাকবে। ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবে মুসলিমপ্রধান এলাকা নিয়ে একাধিক রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব ছিল। তীক্ষ্ণধী আবুল হাশিম এই বহুবচনটি মনে গেঁথে ১৯৪৬ সালের মুসলিম লীগের দিল্লি অধিবেশনে এসেছিলেন। এসে দেখলেন ‘বাষ্ট্রগুলোর’ দাবি ‘একটি রাষ্ট্রের’ দাবিতে পরিণত হয়েছে। কনফারেন্সের দলিলে লেখা– ‘স্টেট’ বা একটি বাষ্ট্র। স্টেজে বসা জিন্নাহ, পাশে লিয়াকত আলী, খাজা নাজিমুদ্দিন প্রমুখ। দর্শকের সারি থেকে চিৎকার করে আবুল হাশিম আপত্তি জানালেন। তাঁর বাম হাতে লাহোর প্রস্তাবের দলিল আর ডান হাতে দিল্লি প্রস্তাব– যেখানে ইংরেজি ‘এস’ অক্ষরটা আর নেই। এই প্রবল আপত্তিজ্ঞাপক চিৎকার শুনে জিন্নাহ হকচকিয়ে গেলেন। বুদ্ধিমান ব্যারিস্টারের মতো নতুনভাবে বললেন, ‘এটা একটা ছাপাখানার ভুল’, এটা ঠিক করে ফেলা হবে। বাংলার মুসলিম নেতাদের মধ্যে জিন্নাহ আবুল হাশিমকে ভয় করতেন। সেই খোলা মাঠে যেখানে চলছে জিন্নাহর জয়জয়কার, সেই পরিবেশে তাঁর স্বপ্নের যুক্ত বাংলার ধ্বনি তোলার স্পর্ধা ও আপসহীনতা আবুল হাশিমের ছিল এবং সেই স্পর্ধা উমর ভাই উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন।
আবুল হাশিম শরৎচন্দ্র বসুর সঙ্গে মিলে মুসলিমপ্রধান দ্বিতীয় রাষ্ট্রের কথা পেশ করেছিলেন। তাতে জিন্নাহ সম্মত হয়েছিলেন। কিন্তু এই যুক্ত বাংলার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন গান্ধী, নেহরু ও প্যাটেল। পশ্চিমবঙ্গের বেশির ভাগ হিন্দু নেতাও যুক্ত বাংলার বিরোধিতা করেন। অনেকে মনে করেন, এই বিরোধিতাকে আরও পাকাপোক্ত করতে লাগিয়ে দেওয়া হয় ১৯৪৬-এর মহাদাঙ্গা। তার পেছনে সর্বভারতের বাঙালিবিরোধী চক্র কাজ করেছিল।
এই দাঙ্গা চলতে থাকে ক্রমাগত। পঞ্চাশের দশকে এই দাঙ্গার কারণে আবুল হাশিমের পরিবার চলে আসে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। উমর ভাই তরুণ বয়সে কলম ধরেন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। তাঁর আপসহীন স্বচ্ছ দৃঢ় ব্যক্তিত্ব, হাতুড়ি ও কাস্তের মতো গদ্য তাঁকে বিবাগভাজন করে তোলে সেই সব মানুষের কাছে– যারা তখন সাম্প্রদায়িকতাকে সর্বস্ব করে রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যস্ত।
সমাজ ও রাষ্ট্রের গড্ডল স্রোতে চাপা পড়েও ফিনিক্স পাখির মতো সতত উড্ডীয়মান ছিলেন বদরুদ্দীন উমর। প্রতিষ্ঠানহীনতার উজান স্রোতে সাঁতার কেটে কারও মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজস্ব পরিশ্রম ও প্রতিভার গুণে তিনি হয়ে ওঠেন অন্তত পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের সমান। তাঁর গুণগ্রাহী অনেক। পশ্চিমবঙ্গে তাঁর জন্মস্থান বর্ধমানের মানুষ কলকাতার মানুষের কাজ ও জ্ঞানের দীপ্তিতে ভাস্বর। প্রতিটি মানুষই আলাদা। তবু বলব আদর্শবাদী আপসহীন তেজি ব্যক্তিত্বের কারণে তিনি আমাদের নোম চমস্কি।
তাঁর আপসহীনতার সাম্প্রতিক উদাহরণ স্বাধীনতা পুরস্কার প্রত্যাখ্যান। এক আলাপচারিতায় তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘তোমার কাজের সার্থকতাই তোমার পুরস্কার। এটার ওপরে পুরস্কার চাওয়া নেহাত লোভ, বাহুল্য।’ আমি তার এই উপদেশ হৃদয়ে ধারণ করে সমৃদ্ধ হয়েছি।
কোরআন শরিফে আছে ‘কুল্লু নাফসিন যা ইকাতুল মাওত’– যা কিছু জীবিত তার সবই মৃত্যুর অনুগামী হয়। এমন নিয়মে উমর ভাই গত হয়েছেন। কিন্তু রেখে গেছেন তাঁর আশাবাদী, সংগ্রামপ্রিয় শব্দাবলি। মার্ক্সের সহযাত্রী হওয়া সত্ত্বেও তিনি মার্ক্সের শিক্ষাকে আমাদের সমাজের নিরিখে আরও উপযোগী করেছেন। সঙ্গে যুক্ত করেছেন তাঁর পিতা থেকে প্রাপ্ত কুলীন আদর্শবাদ। সেভাবেই উমরও থাকবেন অমর।
আবেদ চৌধুরী: বিজ্ঞানী
- বিষয় :
- বদরুদ্দীন উমর
- স্মরণ
- শ্রদ্ধাঞ্জলি
