ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আমাদের ডেটা আমাদেরই থাকছে?

আমাদের ডেটা আমাদেরই থাকছে?
×

তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব, দাউদ ইব্রাহিম হাসান

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:০৭

প্রযুক্তির অবিশ্বাস্য অগ্রগতি আমাদের জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। যোগাযোগ, শিক্ষা, ব্যবসা, বিনোদন– সবকিছুই এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পরিচালিত হয়। এই ডিজিটাল বিপ্লব আমাদের জন্য এনেছে অগণিত সুবিধা; সেই সঙ্গে নিয়ে এসেছে কিছু নতুন ঝুঁকি। তথ্য সুরক্ষার এসব চ্যালেঞ্জ এখন আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের জন্য বড় হুমকি। বিশেষত বাংলাদেশে সাইবার অপরাধ ও তথ্য ফাঁসের ঘটনা যেভাবে বাড়ছে, তা আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

আমাদের জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যেমন নাম, ঠিকানা, জন্মতারিখ, এমনকি ছবিও এখন বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষিত থাকে। কিন্তু তথ্যগুলো কি সত্যিই আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে? প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়েছে যখন আমরা দেখতে পাই, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে গ্রাহকদের সংবেদনশীল তথ্য ফাঁস হচ্ছে। যেমন ২০১৮ সালে একটি বড় সাইবার আক্রমণে প্রায় ৩৩ কোটি ৬৬ লাখ গ্রাহকের তথ্য ফাঁস হয়েছিল। ঘটনাটি বাংলাদেশের আর্থিক খাতের জন্য একটি বড় ধাক্কা। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা চুরি করা হয়েছিল। ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, আমাদের ডিজিটাল ডেটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে।

২০২৫ সালের দুটি বড় ঘটনা এ উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ১০ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশন প্রকাশ করে, পাঁচটি প্রতিষ্ঠান– স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ইউসিবি ব্যাংকের ইউপে, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, মহিলাবিষয়ক দপ্তর ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আইবাস– জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইকরণ সেবা ব্যবহার করার সময় তাদের এনআইডি সিস্টেম থেকে তৃতীয় পক্ষকে প্রায় ৪৫ লাখ তথ্য ফাঁস করেছে। এ ঘটনা নাগরিকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে। যখন আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য এমন সংস্থার হাতে তুলে দিই, যাদের আমরা বিশ্বাস করি, তখন এই প্রশ্নটি মাথায় আসে, ‘আমার তথ্য কি আমারই?’ এর কয়েক মাস পর, ৭ মে ২০২৫ নির্বাচন কমিশন আবারও ঘোষণা করে, আনসার-ভিডিপির এনআইডি যাচাইকরণ সেবা স্থগিত করা হয়েছে। কারণ ‘নিন্দাযোগ্য প্রমাণ’ পাওয়া গেছে, এ দুটি প্রতিষ্ঠান থেকেও ডেটা ফাঁস হয়েছিল। এই সিদ্ধান্তগুলো প্রমাণ করে– আমাদের তথ্য সুরক্ষা ব্যবস্থায় কিছু মৌলিক দুর্বলতা রয়েছে। এই দুর্বলতা শুধু প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয়, বরং আইন, নীতি ও দায়িত্ববোধের অভাবকেও নির্দেশ করে।

তথ্য ফাঁসের মূল কারণগুলো হলো দুর্বল সার্ভার নিরাপত্তা, গোপনীয়তা রক্ষার ব্যাপারে অবজ্ঞা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান তাদের গ্রাহকের ডেটা সুরক্ষায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। যার ফলে সাইবার অপরাধীরা সহজেই সে ডেটা চুরি করতে পারে। সার্ভারের দুর্বলতা, পুরোনো সফটওয়্যার এবং কর্মীদের অসচেতনতা সাইবার আক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

এ ছাড়াও আইনি কাঠামোর অভাব এবং সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া এ সমস্যার বড় কারণ। আমাদের দেশে সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে যেসব আইন আছে, সেগুলো অনেক সময় কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয় না। ফলে অপরাধীরা শাস্তি থেকে বাঁচতে পারে এবং এ ধরনের অপরাধ আরও বাড়তে থাকে। 

যদি সমস্যাগুলোর সমাধান না হয়, এর ভবিষ্যৎ প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে।

সাইবার অপরাধীরা শুধু ব্যক্তিগত তথ্যই নয়; সরকারের গোপন তথ্য, ব্যাংকিং ডেটা এবং অন্যান্য মূল্যবান তথ্য চুরি করতে পারে। এটি দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য বিপজ্জনক।
এই ভয়াবহ ঝুঁকি মোকাবিলা করার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, কঠোর আইনি কাঠামো তৈরি এবং তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা জরুরি। সাইবার অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্রাহকের ডেটা সুরক্ষায় শক্তিশালী প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষণ এবং আপডেট করা সফটওয়্যার ব্যবহার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয়ত, নাগরিক সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। নাগরিকদের ডিজিটাল ডেটার গুরুত্ব এবং তা কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যায়, সে বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া জরুরি। প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব তাদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখা এবং কোনো প্রতিষ্ঠানকে তথ্য দেওয়ার আগে তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া।

তথ্য সুরক্ষা শুধু প্রশাসনিক কাজ নয়; এটি নাগরিক অধিকার ও আস্থার ভিত্তি। আমাদের ডিজিটাল ডেটা আমাদেরই এবং তা সুরক্ষিত রাখা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব। সাইবার নিরাপত্তা শুধু প্রযুক্তিগত সমাধান দিয়ে নিশ্চিত হবে না; আইন, নীতি ও নৈতিকতার মাধ্যমে সম্ভব। ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আমাদেরও সচেতন হতে হবে।
 
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব এবং দাউদ ইব্রাহিম হাসান: ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের যথাক্রমে সহকারী অধ্যাপক, গবেষণা সহকারী

আরও পড়ুন

×