ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণের দুই পথ

অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণের দুই পথ
×

মো. আইনুল ইসলাম

মো. আইনুল ইসলাম

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:২৩ | আপডেট: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১২:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে দিন দিন বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ বাড়ছে। কিছুদিন পরপর নিলাম ডেকে ডলারও কেনা হচ্ছে। সংবাদপত্রে ক’দিন পরপর এমন খবর দেখে আমাদের অনেকের ভালো লাগছে। কারণ বছরখানেক আগেও দেশের তো বটেই, বিদেশের গণমাধ্যমে বাংলাদেশের রিজার্ভ কমে দেউলিয়ার উপক্রম হওয়ার খবর ফলাও করে প্রকাশ হয়েছে। রিজার্ভ বাড়ার খবরে বতর্মান অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক পারঙ্গমতাকে অনেকে সাধুবাদ জানায়, যার যৌক্তিক কিছু কারণ আছে। তবে রিজার্ভ বাড়াতে নীতিগত ভূমিকা পালন করা ছাড়া প্রকৃত অর্থে অন্তর্বর্তী সরকারের খুব বেশি কিছু করার নেই; করেওনি। কারণ কোনো সরকারই নিজে থেকে কোনো অর্থ আয় করে না; সবই নাগরিকের অবদান। একদিকে এই সরকার আগের প্রথাতেই চলেছে, শুধু অহেতুক প্রকল্প নেয়নি; লাগামছাড়া দুর্নীতির চর্চাও করেনি। অন্যদিকে নীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে; বিদেশি ঋণ সহজে ছাড় হয়েছে। এ কারণে রিজার্ভ বাড়ছে। কিন্তু রিজার্ভের এই বাড়বাড়ন্ত রূপ মানে বাংলাদেশের অর্থনীতি মজবুত বা টেকসই হয়েছে– তা মনে করার কারণ নেই। 

গত জুনে বিশ্বব্যাংক এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল হয়নি, বরং গভীর সংকটে নিমজ্জিত। রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে; ঋণনির্ভরতাও বেড়েছে। বৈদেশিক ঋণের চাপ ও আমদানি কমার ফলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস হচ্ছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংকট আরও গভীর হতে পারে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং রপ্তানি চাহিদা হ্রাস পরিস্থিতিকে জটিল করবে। বিশ্বব্যাংকের ওই পূর্বাভাসের পর বিশ্বের অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলেছেন, প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৩ শতাংশের কাছাকাছি নেমে আসতে পারে এবং বেকারত্ব ও বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।

রিজার্ভের পরিস্থিতি এখন যা-ই হোক, সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক দিন ধরেই এক গভীর সংকটে নিমজ্জিত। এখনও যথেষ্ট সংকটে ও অনিশ্চয়তায় রয়েছে, যার প্রমাণ প্রবৃদ্ধির চমকপ্রদ পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে আছে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অভাব এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের ভয়াবহ নাজুক অবস্থা। যে কোনো সময় বড় কোনো ঝড়-বিপর্যয় এলে (রাজনৈতিক সংকটের সমূহ আশঙ্কা বিদ্যমান) সবকিছু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। বাইরের ও ভেতরের এই বৈপরীত্যের মূল কারণ হলো ক্ষমতা ও সম্পদের ওপর অল্প কয়েকজন প্রভাবশালীর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ, যা টেকসই উন্নয়নের পথে এক বিরাট বাধা। এই অলিগার্কি বা মুষ্টিমেয় গোষ্ঠীর ক্ষমতা ভাঙতে না পারলে দেশ নিশ্চিতভাবেই আবারও রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দুষ্টচক্রে 
পড়বে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এ আশঙ্কাকে আরও প্রাসঙ্গিক করেছে।

কেন বিপর্যয় ও দুষ্টচক্রের আশঙ্কা– তা বুঝতে হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গতিপথের দুটি মৌলিক অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা রাখা জরুরি। প্রথমত, ‘প্রিমিটিভ অ্যাকুমুলেশন’, যা অর্থনীতিবিদ কার্ল মার্কসের গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব। এ অনুযায়ী, পুঁজিবাদের প্রাথমিক যুগে মূলধন সৃষ্টি হয় শ্রমিকের শোষণ বা সম্পদ লুণ্ঠনের মাধ্যমে, যা উৎপাদনশীল প্রক্রিয়ার বাইরে ঘটে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, স্বাধীনতার পর থেকে মূলধন সঞ্চয়ের একটি বড় অংশ এসেছে লুটপাট, দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়, যা টেকসই শিল্পায়ন বা উৎপাদনশীলতার পরিবর্তে অনুৎপাদনশীল খাতে সম্পদ জমা করেছে। দ্বিতীয়ত, ‘রেন্ট সিকিং’, যাকে সহজ ভাষায় ‘পরজীবী ব্যক্তিদের অর্থ আহরণ প্রক্রিয়া’ বলা যায়। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরাসরি উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে জড়িত না হয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে ছত্রাক রূপ ধারণ করে মুনাফা বা ‘রেন্ট’ বা অর্থ-পুঁজি অর্জন করে। বাংলাদেশে এ প্রবণতা অত্যন্ত প্রকট। 

বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতির মধ্যেও জটিল ও অস্বাস্থ্যকর আন্তঃসম্পর্ক বিদ্যমান। এর প্রমাণ, রাজনৈতিক বৈধতার সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প হাতে নেয়; সংস্কারের স্বপ্ন দেখায়, যা দৃষ্টিগত ‘আশার আলো’ দেখাতে পারলেও ভেতরের দুর্নীতি অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে তোলে। গত দু-তিন দশকে ব্যবসায়ীরা সরাসরি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়, বিশেষত সংসদে যুক্ত হয়েছেন। এতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও ব্যবসায়িক স্বার্থ এমনভাবে মিলেমিশে গেছে, তা নিয়ম-কানুনভিত্তিক অর্থনীতির পরিবর্তে ‘ডিলসভিত্তিক অর্থনীতি’ তৈরি করেছে। দুর্নীতির অর্থপ্রাপ্তির লোভে বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে অত্যধিক মনোযোগের কারণে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ কমেছে। এর ফলে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা বিকাশের বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ছে। সামাজিক খাতে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে মানুষকেন্দ্রিক ও কমিউনিটিভিত্তিক কাঠামো অপরিহার্য। কেবল ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া নিয়ম নয়, বরং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে জবাবদিহি গড়ে তোলা সম্ভব।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট কেবল অভ্যন্তরীণ নয়, এর বৈশ্বিক প্রেক্ষিতও রয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ প্রক্রিয়ায় থাকা বাংলাদেশের জন্য এ সংকট আরও জটিল। এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর জন্য আবেদন একটি বিচক্ষণমূলক পদক্ষেপ হতে পারে। তবে এই আবেদন কেবল সময়ক্ষেপণ নয়, বরং সংস্কারের একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ এর সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। এই রোডম্যাপে থাকবে জবাবদিহি, দুর্নীতি দমন এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির মতো বিষয়। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্য নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ, কম সুদের হার এবং লজিস্টিকস খরচ কমানোর মতো নীতি সংস্কার জরুরি।

এখন দুটি পথ খোলা। হয় অলিগার্কিনির্ভর উন্নয়ন মডেল চালিয়ে গিয়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দিকে এগোনো অথবা ক্ষমতা ও সম্পদ পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপন। সঠিক সংস্কার, জবাবদিহি এবং নতুন, সৃজনশীল উদ্যোক্তা শ্রেণির উত্থান ছাড়া এই অচলাবস্থা কাটানো সম্ভব নয়।

ড. মো. আইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
 

আরও পড়ুন

×