ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বেতন-ভাতার আন্দোলন

তেলের মাথায় তেল দেওয়াই কি শিক্ষকদের প্রাপ্তি?

তেলের মাথায় তেল দেওয়াই কি শিক্ষকদের প্রাপ্তি?
×

অনি আতিকুর রহমান

অনি আতিকুর রহমান

প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৫ | ১৭:৩৬ | আপডেট: ২৩ অক্টোবর ২০২৫ | ১৩:৫৪

দুপুরে কাজের ফাঁকে ফোনটা হাতে নিয়ে ফেসবুক স্ক্রল করতেই দেখি নিউজফিডে ‘আলহামদুলিল্লাহ’র বন্যা চলছে। ভাবলাম কোনো পাবলিক পরীক্ষার রেজাল্ট হলো নাকি! একটু পরই বুঝলাম আন্দোলনরত বেসরকারি শিক্ষকদের দাবি মেনে নিয়েছে সরকার। বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধিতে সম্মতি দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। আগ্রহ নিয়ে সম্মতিপত্রটি পড়লাম। শিক্ষক-কর্মচারীদের এই আন্দোলন নিয়ে আমার আগ্রহ ছিল, নিজেও একাধিকবার শহীদ মিনারে গিয়ে সংহতি জানিয়েছি। তবে প্রজ্ঞাপনে শর্ত দেখে হতাশই হলাম। 

তিন দফা দাবিতে গত ১২ অক্টোবর থেকে রাজধানীতে লাগাতার কর্মসূচি শুরু করেন এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা। তাদের দাবিগুলো হলো– মূল বেতনের ২০ শতাংশ বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ৫০০ থেকে বাড়িয়ে এক হাজার ৫০০ টাকা করা এবং উৎসব ভাতা মূল বেতনের ৫০ থেকে বাড়িয়ে ৭৫ শতাংশ নির্ধারণ।

এই দাবিদাওয়া নিয়ে টানা ১০ দিন আন্দোলন করলেন শিক্ষকরা। এই খবর জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জার। সারাদেশ থেকে হাজার হাজার শিক্ষক রাজধানীতে ছুটে এসেছেন। সরকার পুলিশ পাঠিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করেছে। অনেককে আটকও করা হয়। কিন্তু শিক্ষকরা মাঠ ছাড়েননি। অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে তারা আন্দোলন জারি রাখেন। দফায় দফায় সরকারের সঙ্গে বৈঠক চলে। এক পর্যায়ে ক্লাস বন্ধ করে শুরু করেন আমরণ অনশন। শিক্ষকদের দাবির সঙ্গে নজিরবিহীন সমর্থন দেয় মানুষ। সংহতি জানায় অরাজনৈতিক বিভিন্ন গোষ্ঠী। রাজনৈতিক দলগুলোও উপস্থিত হয়ে একমত পোষণ করে।

যাহোক, সহজ তিনটি দাবির দুটিই মেনে নেয়নি সরকার। প্রধান যে দাবিটির আংশিক মানা হয়েছে তাও শর্তযুক্তভাবে। অর্থাৎ শিক্ষকদের দাবীকৃত ২০ শতাংশ বাড়ি ভাড়ার জায়গায় ১৫ শতাংশ মেনেছে সরকার। তাও দুই দফায় কার্যকর হবে। সরকারের সিদ্ধান্তে শিক্ষক নেতা ও সিনিয়র শিক্ষকদের একাংশ খুশি হলেও জুনিয়র শিক্ষকরা যারপরনাই নাখোশ। কারণ যে পরিমাণ বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি করা হলো, নতুন শিক্ষকদের ক্ষেত্রে বিদ্যমান এক হাজার টাকার চেয়েও কম। ফলে শিক্ষক নেতারা ‘সফল’ দাবি করলেও তা অনেকের কাছে ‘হতাশার কারণ’। তাদের এই হতাশ হওয়ার যথেষ্ট কারণও আছে। কেননা দুই হাজার টাকায় ‘ফ্যামিলি বাসা’ ভাড়া পাওয়া যায় না। ফলে চিকিৎসা ও উৎসব ভাতার দাবি অনালোচিত থাকলেও যতটুকু মানা হয়েছে তাও শিক্ষকদের জন্য সর্বজনীন সিদ্ধান্ত হয়নি। এটি এক ধরনের ‘তেলের মাথায় তেল’ দেওয়ার কাণ্ড হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সম্মতিপত্র অনুসারে, বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মূল বেতনের ১৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দুই ধাপে দেওয়া হবে এই অর্থ। চলতি বছরের ১ নভেম্বর থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ (ন্যূনতম দুই হাজার টাকা) এবং ২০২৬ সালের জুলাই থেকে বাকি সাড়ে ৭ শতাংশসহ মোট ১৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া কার্যকর হবে।

শিক্ষা উপদেষ্টা সিআর আবরার বলেছেন, ‘আজকের দিনটি ঐতিহাসিক। সম্মানিত শিক্ষকদের দাবি অনুযায়ী শতাংশ হারে এ ভাতা নিশ্চিত করতে পেরে একজন শিক্ষক হিসেবে; শিক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি।’ যাহোক, বিশ্লেষণ করে দেখি, এই ১৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধির সুফল সবাই পাবেন কিনা।

প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী। এদের মধ্যে প্রায় চার লাখ শিক্ষক। আর জুনিয়র বা স্বল্প বেতনভুক্ত শিক্ষকের সংখ্যা সিংহভাগ। ফলে ১৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়ার সুবিধা- না পাবেন দেড় লাখ কর্মচারী, না পাবেন প্রায় তিন লাখ সাধারণ সহকারী শিক্ষক। তাহলে কারা পাবেন এই সুফল? পাবেন মূলত সিনিয়র কিছু শিক্ষক, আর প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করা অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, সুপার, সহ-সুপাররা। ফলে বাড়ি ভাড়ার হার আরও বাড়ানো অথবা সর্বনিম্ন পাঁচ হাজার টাকা না করলে জুনিয়র শিক্ষকদের চাকরি করা কঠিন হয়ে যাবে।

বিশেষ করে গত ১৮তম নিবন্ধনের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকরা এই প্রজ্ঞাপনের কোনো সুফল পাবেন না। তাদের জন্য ‘যেই লাউ সেই কদু’ অবস্থাই থাকল। গত নিবন্ধনে প্রায় অর্ধলাখ উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়েকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পোস্টিং দিয়েছে এনটিআরসিএ। ফলে তাদের প্রত্যেককে বাড়ি ভাড়া করেই থাকতে হবে। কিন্তু দুই হাজার টাকায় কোথায় বাড়ি পাওয়া যাবে? 

এমপিওভুক্ত মাদ্রাসার ইবতেদায়ি তথা প্রাথমিক পর্যায়ের জুনিয়র মৌলভীদের গ্রেড শুরু ১৬তম থেকে। এই শিক্ষকদের বেতন সর্বনিম্ন ৯ হাজার ৩০০ টাকা, যার ১৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া দাঁড়ায় এক হাজার ৩৯৫ টাকা। একই পদের সর্বোচ্চ বেতন ২২ হাজার ৪৯০ টাকা হলে বাড়ি ভাড়া আসে তিন হাজার ৩৭৪ টাকা। এখন সবাই পান এক হাজার টাকা। সর্বনিম্ন বেতন ধরলে নতুন যোগ হলো মাত্র ৩৯৫ টাকা। হাই স্কুল বা দাখিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষকরা বেতন পান ১১তম গ্রেডে (বিএড ছাড়া)। এই গ্রেডের সর্বনিম্ন বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা, যার ১৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া এক হাজার ৮৭৫ টাকা আর সর্বোচ্চ ৩২ হাজার ২৪০ টাকায় আসে চার হাজার ৮৩৬ টাকা। সর্বনিম্ন বেতন ধরলে নতুন যোগ হলো মাত্র ৮৭৫ টাকা, যা সরকার ঘোষিত দুই হাজারের চেয়ে কম। এ ছাড়া কলেজ পর্যায় ও আলিম মাদ্রাসার প্রভাষক বেতন পান সর্বনিম্ন নবম গ্রেডে ২২ হাজার টাকা। এই বেতনের ১৫ শতাংশ হলো তিন হাজার ৩০০ টাকা আর সর্বোচ্চ সাত হাজার ৯৫৯ টাকা। সর্বনিম্ন বেতন ধরলে বাড়তি পাচ্ছেন মাত্র দুই হাজার ৩০০ টাকা।

অন্যদিকে হাইস্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষক বা দাখিল মাদ্রাসার সহ-সুপার বেতন পান অষ্টম গ্রেডে। এই গ্রেডের কর্মকর্তাদের সর্বনিম্ন বেতন ২৩ হাজার। এই বেতনের ১৫ শতাংশ তিন হাজার ৪৫০ টাকা আর সর্বোচ্চ ৫৫ হাজার ৪৬০ টাকায় আসে আট হাজার ৩৩৪ টাকা। হাই স্কুলে প্রধান শিক্ষক বা দাখিল মাদ্রাসার সুপার বেতন পান সপ্তম গ্রেডে। এই গ্রেডের কর্মকর্তাদের সর্বনিম্ন বেতন ২৯ হাজার টাকা। ১৫ শতাংশে বাড়ি ভাড়া আসে তিন হাজার ৪৫০ টাকা আর সর্বোচ্চ ৬৩ হাজার ৪১০ টাকায় দাঁড়ায় আট হাজার ৩৩৪ টাকা। এ ছাড়া কলেজ ও আলিম মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষরা বেতন পান ষষ্ঠ গ্রেডে। এই গ্রেডের কর্মকর্তাদের সর্বনিম্ন বেতন ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা। ১৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া আসবে চার হাজার ৩৫০ আর সর্বোচ্চ ৬৭ হাজার ১০ টাকায় আসবে ১০ হাজার ৬৬ টাকা। ডিগ্রি কলেজ বা ফাজিল মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষরা বেতন পান পঞ্চম গ্রেডে সর্বনিম্ন ৪৩ হাজার টাকা। ১৫ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া আসে ছয় হাজার ৪৫০ টাকা আর সর্বোচ্চ ৬৯ হাজার ৮৫০ টাকায় আসে ১০ হাজার ৪৭৮। ডিগ্রি কলেজ ও কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষরা বেতন পান চতুর্থ গ্রেডে। এই গ্রেডের সর্বনিম্ন বেতন ৫০ হাজার টাকা। ১৫ শতাংশে বাড়ি ভাড়া সাত হাজার ৫০০ টাকা আর সর্বোচ্চ ৭১ হাজার ২০০ টাকা বেতনের ১৫ শতাংশের পরিমাণ হলো ১০ হাজার ৬৮০।

জুনিয়র শিক্ষকদের মধ্যে শুধু প্রভাষকরা কিছুটা সুফল পেলেও মাধ্যমিক স্তরের লাখ লাখ সহকারী শিক্ষক এই আন্দোলনে কার্যত কিছুই পেলেন না। অথচ তাদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। শ্রেণিকক্ষেও তাদের দায়িত্ব সবার চেয়ে বেশি। তাহলে এই আন্দোলনকে ‘শিক্ষকদের বিজয়’ কীভাবে বলা যায়! শিক্ষা উপদেষ্টাই বা কীভাবে এমন সিদ্ধান্ত দিয়ে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছেন?

দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে আজকের যে সিদ্ধান্ত, এটিকে বাস্তবসম্মত বা জটিল সমস্যার উপযুক্ত সমাধান বলার কোনো সুযোগ নেই। জোড়াতালি দিয়ে একটি আনুষ্ঠানিকতা সেরে ফেলা বলা যেতে পারে। বিষয়টি শিক্ষক নেতৃবৃন্দ ও সরকারের পক্ষ থেকে আবারও বিবেচনা করা দরকার। সর্বনিম্ন বাড়ি ভাড়া অন্তত পাঁচ হাজার টাকা করা জরুরি।

অনি আতিকুর রহমান: সহসম্পাদক, সমকাল
[email protected]


 

আরও পড়ুন

×