ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

মানবাধিকার

রহিম বাদশাহদের মৃত্যুতে আমাদের দায়

রহিম বাদশাহদের মৃত্যুতে আমাদের দায়
×
×

তানিয়া খাতুন

তানিয়া খাতুন

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:২৩ | আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০২৫ | ১১:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

গত ১৭ অক্টোবর নওগাঁ সদর উপজেলার একটি হাফেজিয়া কওমি মাদ্রাসার ছাত্র আবদুর রহিম বাদশাহর মরদেহ ওই মাদ্রাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। মাত্র ১১ বছর বয়সী ছেলের এই অকালমৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না বাদশাহর মা-বাবা; তারা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ন্যায়বিচারের দাবিতে মামলা করেন তারা, যদিও এলাকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের নেতারা মীমাংসার পরামর্শ দিয়েছিলেন। পেশাগত দায়িত্বের অংশ হিসেবে সম্প্রতি আমার কথা হয় রহিম বাদশাহর বড় ভাইয়ের সঙ্গে। তিনি শ্লেষভরা কণ্ঠে এলাকার রাজনৈতিক নেতাদের ওই পরামর্শের কথা জানান। তিনি আরও বলেন, ‘শুনলাম কয়েক বছর আগে বাদশার মাদ্রাসার কয়েকজন ছাত্রকে শিক্ষক বলাৎকার করেছে। জানি না কী হয়েছে আমার ভাইয়ের সঙ্গে। কিন্তু আমরা বিচার চাই, আমরা চাই আর যেন কোনো ভাইয়ের জীবন অকালে ঝরে না পড়ে।’ 

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন এমএসএফ বলছে, চলতি বছরে গত ২০ অক্টোবর পর্যন্ত  মাদ্রাসায় পাঁচজন ছেলেশিশুর অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটেছে; যাদের মধ্যে মাদ্রাসার শৌচাগার থেকে চারজনের ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে এবং একজন শিশুর লাশ বারান্দায় পড়েছিল। প্রতিটি ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে নির্যাতনের অভিযোগ করা হয়েছে। সংস্থাটির পরিসংখ্যানমতে এই সময়ে মাদ্রাসায় ছেলেশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১১ জন, শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয় দুজন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সারাদেশে এ সময়ে ৩৮ জন ছেলেশিশু বলাৎকারের শিকার হয়েছে। 

শিশুর ওপর শারীরিক-মানসিক সব রকমের নির্যাতন বন্ধে বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শাস্তি নিষিদ্ধ করতে ২০১১ সালে একটি পরিপত্র জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে বিশেষ করে স্কুল-কলেজে শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা তুলনামূলক কমে এলেও বেসরকারি মাদ্রাসায় এর তেমন প্রভাব পড়েনি। আরও দুঃখজনক হলো, মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের পরিবার এবং মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের অধিকাংশ ধরেই নেয় যে শারীরিক  নির্যাতন যেমন–বেত দিয়ে পেটানো, শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা স্বাভাবিক।  

সংবাদ মাধ্যম বা সামাজিক মাধ্যমে মাদ্রাসা ছাত্র নির্যাতনের ছবি ভাইরাল হলে প্রশাসনের কিছুটা টনক নড়ে। তার প্রতিরোধের কার্যকর এবং দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না বললেই চলে। এ জন্য নানা রকম নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারাতে হয় অনেক শিশুকে। অধিকাংশ শিশু আত্মহত্যার মানেও বোঝে না, অথচ তাদের লাশ ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। বলা হয়, তারা ‘আত্মহত্যা’ করেছে।
আরও অনেক অঘটন হয়তো অপ্রকাশিতই থেকে যায়। দেশে করোনা-পরবর্তী সময়ে স্কুলে শিক্ষার্থী কমলেও কওমি মাদ্রাসায় বাড়ছে। চলতি বছরের আগস্ট মাসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের দেওয়া খসড়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসাগুলোতে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা যথাক্রমে প্রায় ৮০ লাখ ও ৪০ লাখ; মোট ১ কোটি ২০ লাখ। এই বিশালসংখ্যক শিশুর অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি নিছক মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না।

কওমি মাদ্রাসার অধিকাংশই গ্রামে, নিজ অর্থায়নে এবং এর শিক্ষার্থীরা বোর্ডিংয়ে থেকে পড়ে। ফলে তাদের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণহীনতা আর আবাসিক হওয়ার কারণে শিশুদের নির্যাতনের চিত্র সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হতে দেখা যায় না। 

গ্লোবাল পার্টনারশিপ টু অ্যান্ড ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট চিলড্রেন প্রকাশিত ‘করপোরাল পানিশমেন্ট অব চিলড্রেন: সামারি অব রিসার্চ অন ইটজ ইমপ্যাক্ট অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েশনস’ (অক্টোবর, ২০২১) জানাচ্ছে, ৩০০টির বেশি গবেষণা দেখিয়েছে শাস্তির কারণে শিশুদের মনস্তত্ত্বে অসংখ্য নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কোনো গবেষণায় শাস্তির কোনো সুফল পাওয়া যায়নি।

বাংলা, ইংরেজি ও আরবি–এই তিন রকম শিক্ষা পদ্ধতির মধ্যে যদি পারস্পরিক সম্পর্ক ও যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করা না যায় তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে একটা কার্যকর পরিবর্তন আনা যাবে না। পরিবর্তন আনার জন্য মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি আমাদের কিছু জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে। যারা মাদ্রাসায় পড়ছেন তারাও আমাদের সন্তান। যে কোনো পরিবর্তনের জন্য এক ধরনের বিশ্বাসবোধ, আস্থা, মানবিক সম্মাননা এবং শ্রদ্ধা থাকা প্রয়োজন। 

অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরের বেশি সময় পার হলেও দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত শিক্ষাকে নিয়ে কোনো সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করেনি, যা খুবই হতাশাজনক। অথচ আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আন্দোলনে সবার সঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ গণঅভ্যুত্থানে জীবন দিয়েছেন ৪৫ মাদ্রাসা শিক্ষার্থী; যাদের ১৬ জন শিশু (সমকাল ২৮ ডিসেম্বর ২০২৪)।

অভ্যুত্থান-পরবর্তী সংস্কারমুখী রাজনৈতিক দলগুলোর কি উচিত নয় বাদশাহর পরিবারের মতো পরিবারগুলোর সুবিচার নিশ্চিত করার পথ প্রশস্ত করা? ধরে নিলাম, বাদশাহকে হত্যা করা হয়নি, অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছে। রাজনৈতিক দলের উচিত বাদশাহর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে পরিবার এবং প্রশাসনকে সহায়তা করে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা রাখাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক দলের সংস্কার কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। 

সেই সংস্কার আবদুর রহিম বাদশাহর মতো শিক্ষার্থীদের বাড়ি ফেরা নিশ্চিত করবে। মায়ের কাছে অতি দুরন্ত আর বাইরে শান্ত ছেলেটি স্বেচ্ছায় স্কুল ছেড়ে  মাদ্রাসায় পড়তে গিয়েছিল। অথচ মাদ্রাসাতেই তার জীবনপ্রদীপ নিভে গেল। এ দায় শুধু সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নয়, এ দায় আমাদের সবার।

তানিয়া খাতুন: মানবাধিকারকর্মী
[email protected]

আরও পড়ুন

×