ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সম্ভাবনা

সোনাদিয়ায় প্রয়োজন টেকসই উন্নয়ন

সোনাদিয়ায় প্রয়োজন টেকসই উন্নয়ন
×

সরোয়ার মোরশেদ

প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:১৪ | আপডেট: ০৪ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের উপকূল থেকে বিশাল জলরাশির ওপর বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃত বুককে আশ্রয় করে, অঙ্গে গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের পলিমাটি ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ সোনাদিয়া। কক্সবাজার থেকে ১৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত মহেশখালী। এ উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নের ছোট্ট দ্বীপ সোনাদিয়া। প্রায় ৯ বর্গকিলোমিটারের এই দ্বীপ একটি খালের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন হয়েছে মহেশখালী দ্বীপ থেকে। বাঁকখালী নদীর স্রোতধারা ও মহেশখালী প্রণালির সঙ্গে সাগরের ঢেউয়ের সংঘর্ষে এ দুই এলাকার ঠিক মাঝে বালু জমে জমে জন্ম নিয়েছে সোনাদিয়া দ্বীপ। কিন্তু অর্ধশত বছরের অবহেলায় দ্বীপবাসীর আজও প্রাথমিক চাহিদা পূরণ হয়নি।

শতবর্ষ আগে সাগরের মাঝে জেগে ওঠা এই চরে মানুষের বসতি গড়ে ওঠে। এরই মাঝে এ দ্বীপের সঙ্গে জড়িয়ে যায় রোমাঞ্চকর ঘটনাবলি। ছোট-বড় খালে সমৃদ্ধ এ দ্বীপের আরও একটি নাম প্যারাদ্বীপ। তিন দিকে সমুদ্রঘেরা এ চরাঞ্চলের বিশেষত্ব, ম্যানগ্রোভ বন এবং দুর্লভ জীববৈচিত্র্য। রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে সৈকতে লাল কাঁকড়ার বিচরণ অদ্ভুত দৃশ্যের অবতারণা করে। শীতকালে বিপন্ন সামুদ্রিক কাছিম সাগরলতায় ঢাকা বালিয়াড়িতে আসে ডিম পাড়তে। বেলাভূমিতে পানির একদম কিনারা ঘেঁষে কাছিমের ভিড় যেন সৈকতের প্রাকৃতিক অলংকরণ। সোনাদিয়ার আরও একটি বিশেষত্ব হচ্ছে, দক্ষিণ-পূর্ব সৈকতের শুঁটকিপল্লি। সারাবছর এখানে উৎপাদিত শুঁটকি পাঠানো হয় দেশের বিভিন্ন বাজারে। শীতকালে সোনাদিয়ার সৈকতে মেলা বসে দেশি-বিদেশি জলচর পাখির। এগুলোর মধ্যে রয়েছে– খোঁয়াজকৈতর, বদরকৈতর, সরুঠোঁটি গঙ্গাকৈতর, গুলিন্দা, টিটি জিরিয়া, মধুবাজ, কানিবক, যাঠুয়া বক, নানা ধরনের চা পাখি, বালু বাটান, বাবুই বাটান, ডোরালেজ জৌরালি, কালোমাথা কাস্তেচরা এবং বিভিন্ন ধরনের গাঙচিল। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিরল প্রজাতির হচ্ছে চামচঠোঁটি বা কোদালঠোঁটি চা পাখি। বঙ্গোপসাগরের নোনা জলের ঢেউ, ম্যানগ্রোভ বন, বালুকাবেলা এবং সমুদ্রের নান্দনিক বৈচিত্র্য মিলিয়ে দ্বীপটি প্রকৃতির এক জীবন্ত ল্যাবরেটরি। তবু বছরের পর বছর অবহেলায় দ্বীপবাসী আজও প্রাথমিক চাহিদা পূরণে সীমিত।

দ্বীপটির পর্যটন ও অর্থনীতির দিকে মনোযোগ দিলে সোনাদিয়া হয়তো আজ দক্ষিণ এশিয়ার একটি নিজস্ব কমিউনিটি বেজড অর্থনৈতিক মডেল হিসেবে পরিচিত হতো। স্থানীয় কৃষক ও জেলেরা পর্যটন খাতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সমন্বিত আয় নিশ্চিত করতে পারত। নারীরা হোম স্টে, হস্তশিল্প ও খাবার সরবরাহে অর্থনীতির অংশগ্রহণ পেত। তবে ৫৩ বছরের অবহেলায় দ্বীপটি এখনও প্রাথমিক চাহিদা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও নিরাপদ পানীয় জল এখনও সীমিত; পর্যটন সম্ভাবনা প্রায় অপ্রকাশিত থেকে গেছে। এই দারুণ সম্ভাবনার অভাব শুধু দ্বীপবাসীরই ক্ষতি করছে না; দেশের সামুদ্রিক অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নকে প্রভাবিত করছে।

দ্বীপে বসবাসকারীর সংখ্যা বর্তমানে প্রায় দুই হাজার। নারী-পুরুষের অনুপাত প্রায় সমান হলেও নারীরা অর্থনীতিতে যুক্ত হতে পারেন না সামাজিক ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে। এখানে কাজের তেমন সুযোগ নেই। প্রয়োজনীয় হাসপাতাল নেই। অসুখ হলে নৌকায় যেতে হয়। জোয়ার থাকলে যাওয়া যায় না। জীবন চলে প্রতিদিন সংগ্রাম করে। 

এখানকার শিক্ষা ব্যবস্থাও বিপন্ন। দ্বীপে একটি মাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়, তাতেও নেই পর্যাপ্ত শিক্ষক। শিক্ষার্থীরা পঞ্চম শ্রেণির পর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না। স্বাস্থ্য খাতেও অব্যবস্থা। কমিউনিটি ক্লিনিক নেই। জরুরি চিকিৎসার জন্য স্থানীয়রা বহির্বিভাগের সাহায্য নিতে বাধ্য। নিরাপদ পানীয় জল ও স্বাস্থ্যসেবা না থাকায় পুষ্টির ঘাটতিও রয়েছে। এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও এই চরের শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ। 

শীতকালে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি আসে এখানে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সোনাদিয়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাখির অভয়ারণ্য। কিছুদিন আগে দ্বীপটিতে গিয়েছিলাম পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত নীল কচ্ছপের খোঁজে! ডিম দেওয়ার জন্য নীল কচ্ছপ হাজার হাজার মাইল জল কেটে এই দ্বীপে এসে নিরাপদে ডিম দিয়ে চলে যায়। দ্বীপের ম্যানগ্রোভ বন এবং সমুদ্রের প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য মিলিয়ে এক অনন্য ইকোসিস্টেম গড়ে উঠেছে এখানে।

পর্যটনের আধুনিকায়ন কেবল হোটেল-মোটেল গড়ে তোলা নয়। স্থানীয় মানুষ, সংস্কৃতি এবং জীবনধারার সঙ্গে পর্যটকের সংযোগই আসল ট্যুরিজম। স্থানীয়রা গাইড, রেস্টহাউস মালিক ও পণ্য সরবরাহকারী হলে অর্থনীতির চাকা ঘুরবে অনায়াসে। দ্বীপের নারীদের সঠিক প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচারের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য ব্র্যান্ডিংয়ের এক নতুন দিগন্তের দরজা খুলে দিতে পারে এই দ্বীপ। 

প্রকৃতির সঙ্গে মিতালি গড়ে, প্রকৃতির রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সোনাদিয়া। সাগরের নোনা পানি কেটে কচ্ছপ এখানে রাতে ডিম ফুটায়; পাখিরা ভোরে উড়ে আসে; শিশুরা নৌকায় স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু এই স্বপ্ন টিকিয়ে রাখতে হলে দরকার টেকসই উন্নয়ন। নয়তো একদিন এই দ্বীপও হারিয়ে যাবে উন্নয়নের বিপরীত স্রোতে।
 
সরোয়ার মোরশেদ: গবেষক

 

আরও পড়ুন

×