ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মানবসম্পদ

প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা কোথায়?

প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা কোথায়?
×

ফাইল ছবি

মো. ফারুক মিয়া

প্রকাশ: ১৬ নভেম্বর ২০২৫ | ১৯:১২

প্রাথমিক শিক্ষা একটি জাতির আলোকবর্তিকা। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ৪ অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৯৮ শতাংশ শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও (ব্যানবেইস, ২০২৩) শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে। অবকাঠামো ঘাটতি, প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব, শিক্ষার্থীর ঝরে পড়া এবং শিক্ষক সংকটের কারণে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। অথচ একটি জাতির সার্বিক উন্নয়নের মূল ভিত্তি হলো মানসম্মত শিক্ষা, আর প্রাথমিক শিক্ষা সেই ভিত্তি গড়ে তোলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর।

দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের পথে বেশ কিছু বড় বাধা রয়েছে। অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব লক্ষ্য করা যায়, বিশেষ করে গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলে শ্রেণিকক্ষের সংকট তীব্র। ফলে শিক্ষার্থীরা গাদাগাদি করে ক্লাস করতে বাধ্য হয়। জরাজীর্ণ ভবন, টয়লেট ও বিশুদ্ধ পানির অভাব শিক্ষার পরিবেশ আরও প্রতিকূল করে তোলে। অন্যদিকে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ঘাটতি প্রাথমিক শিক্ষার মানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত বর্তমানে গড়ে ১:৪৬, যা আন্তর্জাতিক মানের (১:৩০) চেয়ে অনেক বেশি। এতে একজন শিক্ষকের পক্ষে সব শিক্ষার্থীর প্রতি পর্যাপ্ত মনোযোগ দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।

অনেক শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬০ থেকে ১০০ জন পর্যন্ত হয়। এত শিক্ষার্থী সামলাতে গিয়ে শিক্ষকরা ব্যক্তিগত মনোযোগ দিতে পারেন না, ফলে দুর্বল শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ে। আধুনিক শিক্ষাসামগ্রীর অভাবও বড় প্রতিবন্ধকতা। অনেক বিদ্যালয়ে চার্ট, লাইব্রেরি, আইসিটি উপকরণ ও ডিজিটাল শিক্ষণ সুবিধা নেই। শিশুরা কেবল বইনির্ভর শিক্ষায় সীমাবদ্ধ থেকে সৃজনশীলতা ও কৌতূহল হারাচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষকদেরও অনেক সময় লো-কস্ট বা নো-কস্ট শিক্ষা উপকরণ তৈরিতে আগ্রহ দেখা যায় না, যদিও এগুলো শিক্ষাকে আকর্ষণীয় করার কার্যকর উপায়।

দারিদ্র্য ও সামাজিক কারণও শিক্ষার পথে বড় বাধা। অনেক দরিদ্র পরিবারের শিশুদের কাজ করতে হয়, ফলে তারা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না। গ্রামীণ সমাজে এখনও বাল্যবিয়ের কারণে বহু মেয়েশিশু স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়। জাতীয়ভাবে প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরে পড়ার হার প্রায় ১৪ শতাংশ (২০২২), যা মানসম্মত শিক্ষার পথে এক বড় অন্তরায়। তা ছাড়া গ্রামীণ বিদ্যালয়গুলোতে প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহারও শিক্ষার্থীদের আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান থেকে বঞ্চিত করছে। মূল্যায়ন ব্যবস্থাও এখনও পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও মুখস্থনির্ভর, যা শিশুর সৃজনশীলতা বিকাশে বাধা দেয়।

এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও বাস্তবমুখী কৌশল। প্রথমেই প্রতিটি বিদ্যালয়ে নিরাপদ ও উপযুক্ত অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। ছেলে ও মেয়েদের জন্য আলাদা টয়লেট, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং স্যানিটেশন সুবিধা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত স্কুলে উপস্থিতি বাড়াবে। দুর্গম অঞ্চলে ভ্রাম্যমাণ বা কমিউনিটি স্কুল চালু করাও সময়োপযোগী উদ্যোগ হতে পারে। সম্প্রতি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সারাদেশের ৫৩৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের যে প্রকল্প হাতে নিয়েছে, সেটি প্রশংসনীয়। তবে এ উদ্যোগকে দেশব্যাপী সম্প্রসারিত করতে হবে।

শিক্ষকদের মানোন্নয়ন প্রাথমিক শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত। তাদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, প্রণোদনা, পদোন্নতির সুযোগ ও মর্যাদা বৃদ্ধি করলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা শিক্ষকতায় আগ্রহী হবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত আন্তর্জাতিক মানে নামিয়ে আনাও জরুরি। পাশাপাশি বিদ্যালয়গুলোতে স্মার্ট ক্লাসরুম, মাল্টিমিডিয়া টুলস, ডিজিটাল কনটেন্ট ও ছোট লাইব্রেরি চালু করা যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আগ্রহ বাড়বে এবং পাঠ্যপুস্তকের বাইরে পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠবে।

দারিদ্র্য মোকাবিলায় স্কুল ফিডিং প্রোগ্রামের আওতা বাড়ানো, দরিদ্র পরিবারের শিশুদের বৃত্তি দেওয়া এবং শিক্ষা উপকরণ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ ও অভিভাবক সচেতনতা বৃদ্ধিতে স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক প্রচারণা জোরদার করতে হবে। বিদ্যালয়ের পরিবেশকে শিশুবান্ধব, আনন্দদায়ক ও নিরাপদ করে তুললে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা সময়ের দাবি। লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি মৌখিক, ব্যবহারিক, প্রকল্পভিত্তিক ও দলগত কাজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করলে তারা কেবল মুখস্থ না করে বুঝে শেখার অভ্যাস গড়ে তুলবে। ধারাবাহিক মূল্যায়ন এবং সৃজনশীল চিন্তা, সমস্যা সমাধান ও সমালোচনামূলক দক্ষতাকে মূল্যায়নের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষায় ইতোমধ্যে কিছু অগ্রগতি অর্জন করেছে, তবে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে এখনও অনেক পথ বাকি। অবকাঠামোগত ঘাটতি, প্রশিক্ষিত শিক্ষকের সংকট, শিক্ষাসামগ্রীর অভাব এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সরকার, উন্নয়ন সংস্থা, স্থানীয় জনগণ ও শিক্ষকদের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষণ পদ্ধতি প্রবর্তন এবং সৃজনশীলতাকে অগ্রাধিকার দিলে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান সত্যিকারের অর্থে উন্নত হবে। সে পথেই গড়ে উঠবে একটি জ্ঞানভিত্তিক ও উন্নত  সমাজ ও জাতি।

মো. ফারুক মিয়া: ইন্সট্রাক্টর (সাধারণ), প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (পিটিআই), দিনাজপুর।
[email protected]

আরও পড়ুন

×