ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

শিক্ষকের মৃত্যু বৈষম্যের যে বার্তা দেয়

শিক্ষকের মৃত্যু বৈষম্যের যে বার্তা দেয়
×

সচিব-শিক্ষকের বেতন-ভাতার পার্থক্য

তানিম ইশতিয়াক 

প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০২৫ | ২২:৩২

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক মারা গেলেন‍। কারণ কী? তিনি শিক্ষকদের বেতন গ্রেড উন্নত করার দাবি করেছিলেন‍। এই মৃত্যু নিয়ে অবশ্য তেমন কারও দুঃখবোধ নেই‍। কারণ শিক্ষকদের নিয়ে সমাজে বেশ নাক সিঁটকানি আছে‍– তারা কম তো বেতন পাচ্ছেন না, আবার কী!

মানসম্পন্ন শিক্ষা কিংবা আদর্শ শিক্ষা ব্যবস্থাপনার কথা উঠলে ফিনল্যান্ডের উদাহরণ আসে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থা ও রাষ্ট্রের সামর্থ্যের প্রশ্নও ওঠে। বলা হয়, ফিনল্যান্ড যেভাবে সবকিছু ম্যানেজ করে, যেভাবে শিক্ষকদের উচ্চবেতন দেয়; বাংলাদেশের বাস্তবতায় তা সম্ভব নয়। কারণ বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত রাষ্ট্র। যে কোনো একটি খাতে ওই পরিমাণ অর্থ সংকুলান ও ব্যবস্থাপনা গরিব রাষ্ট্রের সামর্থ্যের বাইরে। 

রাষ্ট্রের যেসব দায়িত্বশীল কর্তাব্যক্তি যুক্তি দিয়ে থাকেন, বাংলাদেশের কি এত সামর্থ্য আছে যে শিক্ষকদের ফিনল্যান্ডের মতো সুযোগ-সুবিধা দেবে; তাদের কাছে প্রশ্ন– বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কি সামর্থ্য আছে মন্ত্রী-সচিব-প্রশাসকদের এত সুবিধা দেওয়ার? রাষ্ট্রের সামর্থ্যের প্রশ্ন যদি আসে, তাহলে তো ধৈর্য, ত্যাগ ও অল্পতুষ্টির সবক সব খাতের জন্যই প্রযোজ্য হওয়া উচিত। 

খতিয়ে দেখলাম, ফিনল্যান্ড তার সামর্থ্যের আলোকে সচিবদের কত বেতন দেয়, আর স্কুলশিক্ষকদের কত দেয়‍। তাদের মধ্যে গ্যাপ কেমন? রেশিও কেমন? বাংলাদেশের সচিব ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনুপাতও তুলনা করলাম‍। 

চার্টে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে একজন সচিব তার মূল বেতন, বাসা ভাড়া, চিকিৎসা, গাড়ি মেইনটেন্যান্স, কুক অ্যালাউন্স, সিকিউরিটি অ্যালাউন্স, টেলিফোন-ইন্টারেন্ট ভাতা ইত্যাদি মিলিয়ে মাসে দুই লক্ষাধিক টাকা পান‍। বছরে প্রায় ২০ হাজার ৬০০ ডলার‍। সচিবের কাজের পরিধি অনুযায়ী বিভিন্ন কমিটির মিটিং, বক্তৃতা, টিএডিএ, বিদেশ ট্যুর, প্রজেক্টসহ আরও অনেক রকম সম্মানী এই হিসাব থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে‍। 

এদিকে বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক তার মূল বেতন, বাসা ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা বাবদ মাসে আনুমানিক ১৯ হাজার টাকা ধরে বছরে প্রায় ১ হাজার ৮৬৪ ডলার‍ পেয়ে থাকেন। দুজনের অনুপাত ১১‍:১। অর্থাৎ শিক্ষকের চেয়ে সচিবের বেতন ১১০০ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে ফিনল্যান্ড তার সচিবকে বছরে দেয় প্রায় এক লাখ ২৮ হাজার ডলার‍। আর স্কুলশিক্ষককে দেয় ৭৬ হাজার ডলার‍। তাদের অনুপাত ১.৬৮:১‍। অর্থাৎ শিক্ষকের তুলনায় সচিবের বেতন ৬৮ শতাংশ বেশি।

সচিব-শিক্ষকদের এই অনুপাত আরও কয়েকটি দেশে চেক করে দেখলাম‍। কেবল ভারতেই দেখলাম তাদের কলোনিয়াল লিগ্যাসিতে সচিব-শিক্ষকের বেতনের গ্যাপ বেশ হাই‍। তাদের অনুপাত প্রায় ৮:১‍। তবে লিভিং কস্ট অনুযায়ী ভারতের শিক্ষকরা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই আছেন‍, তারা বেতন-ভাতার প্রায় ২০-২৫ শতাংশ সঞ্চয় করতে পারেন‍।
ছোট-বড় সব দেশের উদাহরণ দেখিয়ে প্রমাণ করা যাবে, বাংলাদেশের শিক্ষকদের বেতনবৈষম্য রাষ্ট্রের সামর্থ্যের কারণে নয়, বরং অগ্রাধিকারের সমস্যা‍। এই কারণে বাজেটে বলুন আর জিডিপির অনুপাতে বলুন, শিক্ষা খাত কখনোই গুরুত্ব পায় না‍। 

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কাছে শিক্ষকদের গুরুত্ব না থাকার কারণ দুটি‍। প্রথমত, রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষমতার খায়েশ পূরণে প্রশাসন-পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ‍। রাজনীতিবিদরা আমলাদের সমর্থন পেতে তাদের অন্যায্য দাবিতেও সায় দেয়‍। আবার সচিবরা নীতিনির্ধারকের ভূমিকায় থাকায় নিজেদের বেতন নিজেরাই বাড়িয়ে নেয়, নিজেরাই নানান সুযোগ-সুবিধা যুক্ত করে নেয়‍। 

দ্বিতীয়ত, ঔপনিবেশিক মানসিকতায় প্রশাসনিক কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী এবং শিক্ষকদের নিম্নমানের পেশা‍জীবী হিসেবে দেখা হয়। এই কারণে মেডিকেল পড়ুক বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুক, ক্যারিয়ারের লক্ষ্য হয়ে ওঠে প্রশাসন ক্যাডারে যাওয়া। 

অন্যান্য দেশে যেখানে শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীদের আকর্ষণ করা হয় তাদের উচ্চবেতন ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে‍; সেখানে বাংলাদেশের শিক্ষকদের জীবনধারণের চাহিদা বলতে গিয়ে প্রাণও দিতে হয়‍। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তঃসমন্বয় ও খাতভিত্তিক যথাযথ গুরুত্ব না থাকলে সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও ন্যায্য বণ্টন কোনোদিন সম্ভব হবে না; বৈষম্য, বঞ্চনা ও ক্ষুব্ধতাও কাটবে না।

অনেকের হয়তো প্রশ্ন সচিবের সঙ্গে শিক্ষকের তুলনা বাস্তবসম্মত বা যৌক্তিক কিনা। শিক্ষকতা গুরুত্বপূর্ণ ঠিক আছে কিন্তু তাদের কাজের প্রকৃতি সচিবের কাজের তুলনায় ভিন্ন। দুটি আলাদা পেশার দায়িত্ব, কাজের পরিধি ও অবদান আলাদা। তাদের শিক্ষাগত ও অন্যান্য যোগ্যতাতেও পার্থক্য আছে। সচিবরা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন, সরকারের নীতিনির্ধারণ, বাস্তবায়ন ও সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাদের সিদ্ধান্ত সরাসরি দেশের পরিচালনা, অর্থনীতি এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে শিক্ষকরা কেবল ক্লাসরুমে পড়ান, শিক্ষার্থীদের মানসিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য কাজ করেন। তবে সচেতন পাঠক মাত্রই বুঝবেন, এই লেখার উদ্দেশ্য হচ্ছে, পেশা হিসেবে শিক্ষকতার অবমূল্যায়ন ও আর্থমাসাজিক বাস্তবতায় বৈষম্যের জায়গাটা চিহ্নিত করা। সচিবদের সমান বেতন-ভাতা শিক্ষকদের দেওয়ার জন্য বলা হচ্ছে না। তাদের মতো ক্ষমতা-কর্তৃত্ব ও আনুষঙ্গিক সুবিধাও চাওয়া হচ্ছে না। কিন্তু রাষ্ট্রের সামর্থ্যের আলোকে অগ্রাধিকার ও মূল্যায়ন কীভাবে করা হচ্ছে, সেই প্রশ্ন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। 

সচিব ও শিক্ষকের বেতন-ভাতা সুযোগ-সুবিধার পার্থক্য অবশ্যই হবে। প্রশ্ন হলো, সেটা কতটুকু? অন্যান্য দেশে শিক্ষকের চেয়ে সচিবের বেতন ২-৫ গুণ বেশি। বাংলাদেশে কি সেটা ১০-১৫ গুণ বেশি হতে পারে? রাষ্ট্রের অন্যান্য কর্মচারী, আমলা ও সচিবের বেতন গ্রেড নির্ধারণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সামর্থ্যের প্রশ্ন বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না, বড় অফিসারদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সামর্থ্যকেও ছাড়িয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে, কেবল শিক্ষকদের ক্ষেত্রেই গরিব দেশের আর্থিক অসহায়ত্ব পুষিয়ে নিতে ত্যাগ ও দায়িত্বশীলতার সবক দেওয়া হচ্ছে। মানসম্মত শিক্ষা ও যোগ্যতার প্রশ্ন তুললে মানসম্মত ব্যুরোক্রেসির প্রশ্নও আসে। আর শিক্ষকদের যোগ্যতা নির্ধারণ, প্রশিক্ষণ ও উন্নয়নের দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়-সচিবের ওপরে বর্তায়। শিক্ষকদের জীবনযাপনের মৌলিক খরচ বহন করতে হিমশিম খাওয়ার বিপরীতে অন্য কর্মকর্তারা বিলাসিতা করে বেড়ানোটা রাষ্ট্রের কোন সামর্থ্য বিবেচনায় যৌক্তিক হতে পারে?

তানিম ইশতিয়াক : শিক্ষক ও গবেষক

আরও পড়ুন

×