ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

তথ্য প্রযুক্তি

আগামী নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি মোকাবিলায় করণীয়

আগামী নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি মোকাবিলায় করণীয়
×

গৌতম মণ্ডল

গৌতম মণ্ডল

প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:১৬ | আপডেট: ১৯ নভেম্বর ২০২৫ | ২২:২১

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঘটনাটি ২০২৩ সালের। স্লোভাকিয়ায় ন্যাশনাল কাউন্সিলের নির্বাচন। ৩০ সেপ্টেম্বর ভোট। এর ঠিক দুদিন আগে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে একটি অডিও। তাতে দুটি কণ্ঠ। লোকজনের বলাবলি, অডিওটি উদারপন্থি ‘প্রোগ্রেসিভ স্লোভাকিয়া পার্টি’ নেতা মাইকেল সিমেকা এবং দৈনিক ‘ডেনিক এন’ সাংবাদিক মোনিকা টোডোভারের কথোপকথন। তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু ভোটে কারচুপি। একটি অংশে দেশের প্রান্তিক রোমা জনগোষ্ঠীর ভোট কেনার প্রসঙ্গ। এই অডিও নিয়ে তখন দেশজুড়ে হইচই। 

আরেকটি ঘটনার কথা বলি। গত বছর ১৯ এপ্রিল থেকে ১ জুন ভারতে অনুষ্ঠিত হয় লোকসভা নির্বাচন। ওই সময়ে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে বলিউড তারকা আমির খান ও রণবীর কাপুরের দুটি ভিডিও। তারা লোকসভায় বিরোধী দল কংগ্রেসের জন্য ভোট চান। দুজনের মুখ দিয়ে বলানো হয়, ‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেননি, অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছেন।’ ভিডিওর একদম শেষ অংশে ভেসে ওঠে কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রতীক; পাশে লেখা– ‘ভোট ফর জাস্টিস, ভোট ফর কংগ্রেস’।

এই অডিও-ভিডিও স্লোভাকিয়া এবং ভারতে ভোটের ফলাফলে কী প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়ে গবেষণার খোঁজ পাওয়া যায় না। তবে নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বলেন, সাধারণ ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলার মতো শক্তি ওইসব কনটেন্টের ছিল। 

কনটেন্ট দুটি তাহলে কী? ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিসহ একাধিক ফ্যাক্ট চেকার প্রতিষ্ঠান পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানায়, দুটিই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে বানানো ‘ডিপফেক কনটেন্ট’, যা ভোটারকে বিভ্রান্ত করে। নির্বাচনী বিধিতে এমন কনটেন্ট বা আধেয় বানানোর ওপর বরাবরই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। কিন্তু আজকের দিনের নির্বাচনে ‘ফেক কনটেন্ট’ রূঢ় বাস্তবতা; ভিন্ন ধরনের এক চ্যালেঞ্জ।

দেশে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে। সেটি কি এই বাস্তবতা বা চ্যালেঞ্জের বাইরে? আমার বিবেচনায়– মোটেও নয়। নির্বাচন কমিশনও বিষয়টি সেভাবে অনুধাবন করে বলে মনে হয়, যার প্রতিফলন মেলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের কথায়। গত ২১ অক্টোবর রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে এক কর্মশালায় তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের সময় বিশেষ করে ভোটের রাতে এআইর অপব্যবহার নিয়ে আমাদের দিনরাত কাজ করতে হবে। এখন এটি বৈশ্বিক সমস্যা। আমরা নির্বাচনে এআইর অপব্যবহার রোধ করতে চাই। মিস ইনফরমেশন ও ডিজইনফরমেশন নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি সেল গঠন করব। ভোটের পরিবেশ এআই জেনারেটেড কনটেন্টের প্রভাবমুক্ত রাখতে ২৪ ঘণ্টার মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলব’ (সমকাল, ২১ অক্টোবর ২০২৫)।

সিইসির এই ভাবনার প্রতিফলন দেখা যায় প্রার্থীদের আচরণবিধি-সংক্রান্ত গেজেটে। ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা না হলেও গত ১০ নভেম্বর ‘বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সচিবালয়’ থেকে প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনে সামাজিক মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণা এবং এআই কনটেন্ট সম্পর্কে বেশ কিছু নির্দেশনা জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনের ১৬ নম্বর ধারায় বলা হয়– ‘কোনো প্রার্থী বা তাহার নির্বাচনী এজেন্ট বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করিয়া নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা পরিচালনা করিতে পারিবেন।’ তবে সেই ক্ষেত্রে–

(ক) প্রার্থী বা তাঁহার নির্বাচনী এজেন্ট বা দল বা প্রার্থী সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নাম, অ্যাকাউন্ট আইডি, ইমেইল আইডিসহ অন্যান্য শনাক্তকরণ তথ্যাদি উক্তরূপে প্রচার-প্রচারণা শুরুর পূর্বে রিটার্নিং অফিসারের নিকট দাখিল করিবেন।

(খ) প্রচার-প্রচারণাসহ নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করিতে পারিবেন না।

(গ) ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ভুল তথ্য, কাহারো চেহারা বিকৃত করা ও নির্বাচন-সংক্রান্ত বানোয়াট তথ্যসহ কোনো প্রকার ক্ষতিকর আধেয় তৈরি ও প্রচার করিতে পারিবেন না।

(ঘ) প্রতিপক্ষ, নারী, সংখ্যালঘু বা অন্য কোনো জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করিয়া ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা উস্কানিমূলক ভাষা ব্যবহার করিতে পারিবেন না।

(ঙ) নির্বাচনী স্বার্থ হাসিল করিবার জন্য ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতির অপব্যবহার করা হয় এইরূপ কোনো কর্মকাণ্ড করিতে পারিবেন না।

(চ) সত্যতা যাচাই ব্যতিরেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্বাচন সংক্রান্ত কোনো কনটেন্ট শেয়ার ও প্রকাশ করিতে পারিবেন না।

(ছ) রাজনৈতিক দল, প্রার্থী বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি, ভোটারদের বিভ্রান্ত করিবার জন্য কিংবা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কোনো প্রার্থী বা ব্যক্তির চরিত্র হনন কিংবা সুনাম নষ্ট করিবার উদ্দেশ্যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যমে, সাধারণভাবে বা সম্পাদনা করিয়া কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা কোনো মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, পক্ষপাতমূলক, বিদ্বেষপূর্ণ, অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ এবং মানহানিকর কোনো আধেয় তৈরি, প্রকাশ, প্রচার ও শেয়ার করিতে পারিবেন না।

এই নির্দেশনায় মিথ্যা তথ্য, অপতথ্য, কুতথ্য বা ডিপফেক কনটেন্টের প্রবাহ থেমে যাবে- এমন ধরে নেওয়া নিশ্চয় ঠিক হবে না। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে তেমনটি দেখা যায়নি।

বেশি দিন আগের কথা নয়। ২০২৪ সালের নভেম্বরে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশ রোমানিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বাতিল হয়ে যায় কিছু ভুয়া ভিডিওকে কেন্দ্র করে। দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার দাবি, রাশিয়া একটি ‘হাইব্রিড অভিযান’-এর অংশ হিসেবে সামাজিক মাধ্যম বিশেষ করে টিকটক ব্যবহার করে, যা ক্যালিন জিওর্জেস্কুকে ব্যাপক সমর্থন জোগায়। প্রথম ধাপের ভোটের সময় ২৫ হাজারের বেশি টিকটক অ্যাকাউন্ট হঠাৎ সক্রিয় হয়ে তাঁর পক্ষে প্রচারণা চালায়। এ জন্য বৈধ-অবৈধ উৎস থেকে প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়। রোমানিয়ার জনগণ এ ঘটনাকে রাশিয়াপন্থি জাতীয়তাবাদী নেতা ক্যালিন জিওর্জেস্কুর ‘কারসাজি’ হিসেবে দেখে। প্রবল বিতর্কের মুখে নির্বাচন বাতিল করে দেশটির সাংবিধানিক আদালত বলেন, ‘রাশিয়ার হস্তক্ষেপ ও ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন নির্বাচনের বৈধতা প্রবলভাবে ক্ষুণ্ন করেছে’ (পলিটিকো, ৬ ডিসেম্বর ২০২৪)। এ ঘটনায় টিকটক অ্যালগরিদম ও ব্যবহার প্রক্রিয়ায় স্বয়ংক্রিয় ‘অ্যামপ্লিফিকেশন’ হয়েছে কিনা– সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। তবে সামাজিক মাধ্যম বা মাইক্রোব্লগিং সাইটের ‘অস্বাভাবিক কনটেন্ট’ কীভাবে একটি গোছানো নির্বাচন ভণ্ডুল করে– রোমানিয়ার ঘটনা তার দৃষ্টান্ত হতে পারে।

আমাদের ঝুঁকি কোথায়
এশিয়া ফাউন্ডেশনের সহায়তায় সম্প্রতি ‘ট্যাকলিং ইলেকশন ডিজইনফরমেশন ইন বাংলাদেশ: বিল্ডিং কালেকটিভ রেসপন্সেস ফর ইলেক্টোরাল ইন্টেগ্রিটি’ শীর্ষক গবেষণা করে দেশের বেসরকারি সংস্থা ডিজিটালি রাইট। তাদের গবেষণাপত্রে বলা হয়, ‘বাংলাদেশে অনলাইনে জনপরিসর ভীষণভাবে ভঙ্গুর ও বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের শেষ ভাগ থেকে ভুয়া রাজনৈতিক তথ্য ছড়ানোর মাত্রা বাড়তে থাকে, যা মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে তা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা, সামাজিক স্থিতি এবং নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে।’ এতে আরও বলা হয়, ‘রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি ধর্মীয় গোষ্ঠী, বিদেশি ও প্রবাসীদের একটি অংশ এক ধরনের ডিজিটাল প্রতিযোগিতায় নেমেছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কনটেন্ট, প্রোপাগান্ডা নেটওয়ার্ক, এবং বাণিজ্যিক কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’ 

এ গবেষণায় মোটামুটি পরিষ্কার– কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার নিয়ে এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ভোটের সময় এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার আরও কীভাবে হতে পারে, তার কিছু নমুনা দেখা যাক।

নির্বাচনী প্রচারণায় ভুয়া ভিডিও প্রকাশ সাধারণ ব্যাপার। ইউটিউব, ফেসবুক, এক্স, থ্রেড ও ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দেওয়া এসব ভিডিও ভোটারদের মনোযোগ আকৃষ্টেও সক্ষম হচ্ছে। এর বাইরে আরেকটি কাজের বেশ ঝুঁকি রয়েছে। সেটি হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাইপার টার্গেটিং ক্ষমতা ব্যবহার করে ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য, তাদের মানসিকতা, মূল্যবোধ ও মিডিয়া ব্যবহারের প্যাটার্ন জানার চেষ্টা, যাকে বলা হয় ‘পলিটিক্যাল মাইক্রো-টার্গেটিং’। এটি ভোটারদের ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। এতে তাদের চিন্তার স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়। কারণ এই প্রক্রিয়ায় এআই টুল ব্যবহার করে তাদের ডিজিটাল আচরণ বিশ্লেষণ করা হয় গোপনে। যেমন তারা কোন ওয়েবসাইটে যান, কী ধরনের পোস্টে লাইক দেন, কোন বিষয়ে মন্তব্য করেন ইত্যাদি। এরপর তাদের ফেসবুক/ইউটিউব নিউজফিডে ‘নির্দিষ্ট বিজ্ঞাপন’ বা রাজনৈতিক বার্তা পাঠানো হয়।

ব্রিটিশ ডেটা-অ্যানালেটিকস কোম্পানি ‘ক্যামব্রিজ অ্যানালেটিকা’র কথা অনেকের মনে আছে। এখন পর্যন্ত ‘পলিটিক্যাল মাইক্রো-টার্গেটিং’য়ের সবচেয়ে বড় ক্যালেঙ্কারি ঘটে এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৪-১৬ সময়ে গোপনে বিপুলসংখ্যক ফেসবুক ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে। পরে ওই তথ্য ব্যবহার হয় রাজনৈতিক প্রচারণায়, বিশেষ করে ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে। ক্যামব্রিজ অ্যানালেটিকা তখন রাজনৈতিক পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে। ‘দিস ইজ ইওর ডিজিটাল লাইফ’ অ্যাপের মাধ্যমে প্রায় ৫ কোটি, মতান্তরে ৮ কোটি ৭০ লাখ ব্যবহাকারীর তথ্য সংগ্রহ করেছিল অ্যানালেটিকা (দ্য গার্ডিয়ান, ১৭ মার্চ ২০১৮)। এই কেলেঙ্কারি সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনেরও একটি বড় দৃষ্টান্ত।

প্রার্থী বা নির্বাচন-সংশ্লিষ্টদের কণ্ঠস্বর নকল বা ‘ভয়েস ক্লোন’ করে বানানো অডিও-ভিডিও আমাদের ভোটারদের বিভ্রান্ত করবে, তাতে সন্দেহ নেই। ভুয়া দলিল সামনে এনে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেওয়া হতে পারে কোনো নির্বাচনী কর্মকর্তাকে। ‘ডিপফেক’ ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে নারীদের টার্গেট করা হতে পারে, ভোটের সময়ে যেমনটি আমরা দেখেছি দেশে দেশে। সম্প্রতি ব্রাজিলে ঘটেছে এমন ঘটনা। দেশটিতে পাঁচ নারী প্রার্থীর আপত্তিকর ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়া হয় মূলত তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে। পরে ডিএফআর ল্যাবের পরীক্ষায় জানা যায়, সেগুলো ‘এআই জেনারেটেড’। ভয়েস ক্লোন করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষকে ভোটকেন্দ্রে যেতে নিষেধ করার ঘটনাও অস্বাভাবিক নয়। তবে ভয়ংকর ব্যাপার হবে, যদি অপতথ্য বা কুতথ্য দিয়ে ধর্মীয় উস্কানির প্রতিযোগিতা শুরু হয়। তখন সত্য-মিথ্যা প্রমাণ হওয়ার আগেই সংঘাতের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়ে যাবে।

যা আছে করণীয়
আসলে চ্যাটজিপিটি, ক্লাউড এআই কিংবা গুগল জেমিনির এই যুগে কোনো কিছু ফ্রেমে ফেলা কঠিন। ভোটের প্রচারণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একদিকে যেমন সম্ভাবনা, অন্যদিকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য ঝুঁকি। এই দুইয়ের মাঝামাঝি শক্ত জায়গা করে নিয়েছে এআই প্রযুক্তি।

গত বছরের একটি ঘটনা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভোটের প্রচারণায় একটি অ্যাপ ব্যবহার করেন– নাম ‘ভাষিণী’। জনসভায় গিয়ে তিনি বক্তৃতা করেন হিন্দিতে আর মুহূর্তে তা তামিলে অনুবাদ করে দেয় এআই টুল ‘ভাষিণী’। সুতরাং প্রযুক্তি নিয়ে আমাদের এগোতে হবে; বন্ধ করতে হবে এর অপব্যবহার। সত্য-মিথ্যা খবর শনাক্তে জনগণকে সচেতন করতে হবে। দায়িত্বশীল হতে হবে রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন-সংশ্লিষ্টদের। কেননা, সামাজিক মাধ্যমে মিনিটে মিনিটে যখন কুতথ্য বা অপতথ্যের বন্যা বয়ে যায়, তখন বিধিবিধান করে সঠিক তথ্যের প্রবাহ ঠিক রাখা কঠিন।

আমাদের আরেকটি সংকট হলো ডিজিটাল লিটারেসির ঘাটতি। গত কয়েক বছরে দেশের কোটি কোটি মানুষের হাতে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট পৌঁছে গেছে। তারা রাতদিন ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করেন। হোয়াটসঅ্যাপ-টেলিগ্রামের মতো শত শত অ্যাপস তো আছেই! সমস্যা হলো, সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মের তথ্যের সত্য-মিথ্যা তাৎক্ষণিক যাচাই করে খুব কম সংখ্যক মানুষ, যার নজির বিরল নয়। বরং তারা যা বিশ্বাস করে, সে ধরনের কনটেন্টে প্রভাবিত হয়।

এমন বাস্তবতায় নির্বাচন কমিশন ফ্যাক্ট-চেকিং সেল গঠন করে জনপ্রিয় সব সামাজিক মাধ্যম ২৪ ঘণ্টা মনিটর করলে সেটি হতে পারে ফেক বা ডিপফেক কনটেন্টের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা। নিশ্চয় দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো এতে সহযোগিতামূলক ভূমিকা রাখবে। কারণ, এআই জেনারেটেড ফেক কনটেন্ট এখন তাদের জন্যও নয়া বাস্তবতা। অন্য অর্থে নয়া চ্যালেঞ্জ।

আমার স্বল্প জ্ঞানবুদ্ধি বলে, আজকের দিনে নির্বাচন শুধু মাঠের প্রচার-প্রচারণা নয়। বরং তথ্য, অ্যালগরিদম ও ডিপফেক কনটেন্ট দিয়ে মানুষের মনোজগৎ প্রভাবিত করার লড়াইও। এই লড়াইয়ের বেশিটা চলে সামাজিক প্ল্যাটফর্মে, যার ক্ষমতা এরই মধ্যে প্রমাণিত। তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ময়দান যা-ই হোক, প্রযুক্তি ব্যবহারে সবার দায়িত্বশীলতা অত্যন্ত জরুরি। গুগলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুন্দর পিচাই যেমন বলেছেন- ‘এআই ইজ পাওয়ারফুল। গুড পিপল মাস্ট ইউজ ইট রেসপন্সিবলি’।

গৌতম মণ্ডল: ইনচার্জ অব অনলাইন, সমকাল

আরও পড়ুন

×