সমকালীন প্রসঙ্গ
মানবতাবাদী বাউলরা কেন আক্রান্ত
বাউলরা কেন আক্রান্ত
আলমগীর শাহরিয়ার
প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২৫ | ১৩:৫৬
উপমহাদেশের একজন প্রখ্যাত লোকসংগীতশিল্পী কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য ছিলেন বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের দারুণ অনুরাগী। আসামের শিলচরে কাকা অনন্ত ভট্টাচার্যের কাছে প্রথম যে গানটি শিখেছিলেন সেটি ছিল বাউল আবদুল করিমের ‘তোমার কি মায়া লাগে না আমার দুঃখ দেখিয়া, প্রাণ বন্ধুয়া, যত দোষী তোমারও লাগিয়া’। একই সঙ্গে একটু বড় হয়ে জেনে বিস্মিত হয়েছিলেন যে বাউল আবদুল করিম তখনও বেঁচে আছেন। তারপর একদিন সিদ্ধান্ত নেন সুনামগঞ্জের দিরাইর উজানধল গ্রামে জন্ম নেওয়া বাউল আবদুল করিমের সঙ্গে দেখা করবেন। দেখা হওয়ার পর আলাপচারিতার সময় বাউল দর্শন নিয়ে আবদুল করিম তাঁকে বলেছিলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, এই পৃথিবীটা একদিন বাউলের হবে।’
বলাবাহুল্য যে, বাউলের হবে মানে বাউলদের সহজিয়া জীবন দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হবে। ষোল থেকে সতেরো শতকে বাংলায় বাউল গান বিস্তার লাভ করে। বাউল গান হলো আধ্যাত্মবাদের চেতনাপুষ্ট উদার ও মানবতাবাদী এক লোকদর্শন। লোকসংগীতের এক বিশেষ ধারা; যা বৈষ্ণব ও একই সঙ্গে সুফিবাদ দ্বারা প্রভাবিত। একুশে পদকপ্রাপ্ত একজন শিল্পদার্শনিক যেখানে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন পৃথিবীটা একদিন বাউলের হবে সে দেশে বাউলেরা আজ দিনদুপুরে কথিত তৌহিদি জনতার দ্বারা আক্রান্ত। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলে গ্রেপ্তার করা হয়েছে মানিকগঞ্জের বাউলশিল্পী আবুল সরকারকে।
তাঁর মুক্তির দাবিতে শহরের শহীদ মিনারে বাউলভক্তরা প্রতিবাদে মিলিত হলে তাদের ওপর উগ্রবাদীরা রোববারে সংঘবদ্ধভাবে হামলা চালায়। অনেকেই আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। কেউ কেউ ডোবায় ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাণ বাঁচিয়েছেন। যে শহীদ মিনারে তারা জড়ো হয়েছিলেন সেই শহীদ মিনার আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির গৌরবময় স্বাধীনতা ও লড়াইয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ভাষার জন্য আন্দোলন করে আমাদের কিংবদন্তি বাউল শাহ আবদুল করিম একদিন জেল খেটেছিলেন। গান গেয়ে বাংলার মানুষকে উজ্জীবিত করেছিলেন।
বাউলরা নির্বিবাদী। সহজিয়া জীবনের অনুসারী। সচরাচর নগরজীবন থেকে দূরে গ্রামীণ জনপদে বসবাসকারী চারণ কবি হিসেবেই আবহমান কাল থেকে পরিচিত। সহজে বৈষয়িক লোভ, স্বার্থ, মায়া, মোহ তাদের আচ্ছন্ন করে না বলে পরিযায়ী পাখির মতো তাদের জীবন। অনেকটা সচেতনভাবে সন্ন্যাসব্রত পালন করেন। ছুটে বেড়ান গ্রাম থেকে গ্রামে, জনপদ থেকে জনপদে। গানের ভাষা, কথা, সুর সবই তারা নিজেরাই রচনা করে থাকেন। বাউলসংগীত অনেকটা গুরুগৃহকেন্দ্রিক বিদ্যার মতো। গুরু থেকে শিষ্যে মুখে মুখে গান, গানের কথা, সুর, ভাব যুগ যুগ ধরে চলমান থাকে। বাউল দর্শনে কোনো বিশেষ ধর্ম, জাত, পাত, গোত্র, সমাজ, সম্প্রদায়, আশরাফ, আতরাফ, ব্রাহ্মণ, শুদ্র, বর্ণ বা নির্দিষ্ট কোনো স্রষ্টা বা দেবতার বিশ্বাসের গণ্ডিতেও সীমাবদ্ধ নয়। যে যার বিশ্বাসের অনুরাগী হতে পারেন।
স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির সম্পর্কে কোনো মাধ্যম বা এজেন্ট নেই। ভেদবুদ্ধি নেই। এমন অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী চেতনাই বাউল দর্শনকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সতেরো শতকে লালন সাঁই যে গান রচনা করে গেছেন সে গান আধুনিক পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দর্শন। আজকের পৃথিবীতে মানুষ ও সভ্যতা বিনির্মাণে লড়াইয়ের মূলমন্ত্র ‘এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে। যেদিন হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, জাতি-গোত্র নাহি রবে।’ বাউলরা এ দেশে বহিরাগত নয়, তাদের জীবন ও সংস্কৃতি এই জনপদের, দূর কোনো দেশ থেকে আরোপিত নয়, এই গান স্বতঃস্ফূর্ত, বাংলার মাটি ও মানুষসংলগ্ন। আপামর জনতার মরমিয়া সুর, বাউলের একতারা দেশের কথা বলে। বাউল গান শুধু আমাদের সাংস্কৃতিক সম্পদ নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত বিশ্বসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। জাতিসংঘের ইউনেস্কো বিশ্বব্যাপী ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে চিহ্নিত করে এবং স্বীকৃতি দিয়ে থাকে।
মানবতার ইতিহাসে এই বাউলসংগীতের অপরিসীম সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যগত গুরুত্ব বিবেচনায় ২০০৫ সালে ইউনেস্কো একে ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা দেয়। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালে ইউনেস্কোর অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষাসংক্রান্ত তৃতীয় অধিবেশনে বাংলাদেশের বাউলসংগীতকে ঐতিহ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বাউল গানের শিল্পীরা আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের জীবনের নিরাপত্তাহীনতাকে আমরা আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর হামলা হিসেবে দেখি। গভীর উদ্বেগের সঙ্গে আমরা লক্ষ্য করছি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সারাদেশে অসংখ্য মাজারে হামলা হয়েছে, বাউলরা আক্রান্ত হচ্ছেন। সারাদেশে সাংস্কৃতিক আয়োজন উগ্রবাদীদের হামলা কিংবা হুমকির ভয়ে বাতিল হচ্ছে। লালন, হাসন, রাধারমণ, করিম, দুর্বিন শাহ, উকিল মুন্সির দেশে এসব অপতৎপরতা আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিপন্ন করে। মানিকগঞ্জের বাউলশিল্পী আবুল সরকারের জীবনের নিরাপত্তা চাই। তাঁর গান গাইবার স্বাধীনতা চাই। বাউল দর্শন অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি-চেতনার প্রতীক।
জাতির সংস্কৃতি আক্রান্ত হলে, বিপন্ন হলে, তার গৌরব করার কিছু থাকে না।
আলমগীর শাহরিয়ার: বিলেতপ্রবাসী কবি ও গবেষক
- বিষয় :
- বাউল গানের অনুষ্ঠান
- সংস্কৃতি
