ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নগরায়ণ

সত্যিকার বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া ঢাকার ওপর চাপ কমবে না

সত্যিকার বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া ঢাকার ওপর চাপ কমবে না
×

ইকবাল হাবিব

ইকবাল হাবিব

প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৩৮ | আপডেট: ২৮ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৩৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের ‘বৈশ্বিক নগর ধারণা ২০২৫’ প্রতিবেদনে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল নগরগুলোর চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, আগামী ২৫ বছরের মধ্যে ঢাকা পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল নগর হয়ে উঠবে। আমরা জানি, একই সংস্থার ২০০০ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের এই রাজধানী ছিল নবম জনবহুল নগরী। এখন, ২০২৫ সালে এর অবস্থান দ্বিতীয়। 

মাত্র ২৫ বছর পর ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল নগরী হওয়ার প্রাক্কলন নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। কারণ, এখনই যে ৩ দশমিক ৬৬ কোটি জনসংখ্যায় পৌঁছেছে; তাদেরই আবাসিক, বাণজ্যিক, শিল্পমূলক ও পরিবহন ব্যবস্থাপনা সামলানো যাচ্ছে না। এটাও মনে রাখতে হবে, এ পরিস্থিতি এক দিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পরিসরে ঢাকা নগরের অব্যবস্থাপনা গুরুতর হয়ে ওঠার কথা আমরা তুলে ধরছিলাম। কিন্তু নীতিনির্ধারকরা আগেও এ বিষয়ে তেমন গুরুত্ব দেননি, এখনও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। ২০৫০ সালে জনসংখ্যা যখন ৫ কোটি ২২ লাখে পৌঁছাবে, তখন আমরা কী করব?
বস্তুত ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকেই বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে এক অদ্ভুত রাজনৈতিক সমীকরণে রাজধানীর সাংঘাতিক কেন্দ্রীভূতকরণ ঘটেছে। এর উদ্দেশ্য ছিল শাসনকে সহজ করা। এই ধারণার মধ্যেই সবকিছু একটা জায়গায় আটকে থাকা এবং আমাদের নীতিহীনভাবে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী না করা, সম্পদের বিকেন্দ্রীকরণ না করা, কাজের পরিধি বিস্তৃত না করার কারণে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তা ছাড়া এতে বিপুলসংখ্যক মানুষ ভীষণ উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। আমরা যদি অবিলম্বে কিছু উদ্যোগ না নিতে পারি, তাহলে এ অবস্থা আরও প্রকট হতে থাকবে। 
প্রসঙ্গত, পদ্মা সেতু নির্মিত হওয়ার পর অনেকে সকালে ঢাকায় এসে সারাদিন কাজ সেরে সন্ধ্যার পর ফরিদপুর বা বরিশাল ফিরে যেতে পারে। এ পরিবর্তনের ফলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের মধ্যে যে দক্ষিণমুখিতা তৈরি হয়েছে, তাতে বিকেন্দ্রীকরণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আমরা যদি প্রতিবেশী ভারতের কলকাতা, মুম্বাই অথবা দিল্লির দিকে তাকাই, তারা দীর্ঘদিন ধরে বিকেন্দ্রীকরণে জোর দিয়েছে। সেখানে বিপুলসংখ্যক পেশাজীবী প্রতিদিন সুদূর কর্মস্থলে যায় এবং দিনে দিনে ফিরে আসে। যেমন দিল্লির ৩০ শতাংশ মানুষ দিনে এসে দিনে চলে যায়। এটা সম্ভব হয়েছে গণপরিবহনকে সহজ করে তোলার কারণে।

আমাদের দেশেও বিকেন্দ্রীকরণ না ঘটলে ঢাকার ঘনবসতি ও অবাসযোগ্য শহরের সংকট নিরসন করা সম্ভব নয়। পরিবহন এ ক্ষেত্রে অন্যতম সমস্যা। ঢাকায় যানজট এতই প্রকট, কোথাও কোথাও গাড়ির চেয়ে মানুষের পা বেশি গতিশীল। অফিস-আদালত ও অন্যান্য সংস্থার বিকেন্দ্রীকরণের সঙ্গে সরকার ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণও জরুরি। না হলে ঢাকাসহ প্রধান প্রধান শহর বাসযোগ্য করে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দিকে তাকালেও বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়। দেশজুড়ে সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও ঢাকার ওপর নির্ভরশীলতা কোনোভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়নি, বরং দিন দিন বাড়ছে।

চিকিৎসার মতো অতি জরুরি প্রয়োজন এখনও বিকেন্দ্রীকরণ হয়নি; ঢাকার ওপরেই চাপ বেড়ে চলেছে। প্রতিদিন শুধু চিকিৎসার জন্য বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকায় আসে এবং কয়েকদিনের জন্য অবস্থান করতে হয়। এই প্রয়োজনের কারণে স্বাভাবিকভাবে নগরেই বড় বড় হোটেল-মোটেলের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে ছোট ছোট থাকার জায়গা।

সমস্যাগুলোর তীব্রতা অনুভব করলেও কোথাও কার্যকরী সমাধানের চেষ্টা দেখা যায় না। ঢাকা নগরবাসী রয়েছে উভয় সংকটে; ছাড়াও যাচ্ছে না আবার বিকল্পও গড়ে তোলা হচ্ছে না। সব মিলিয়ে ঢাকাবাসী এখন ভারাক্রান্ত। বিকেন্দ্রীকরণের মধ্য দিয়ে পুনরায় ঢাকার নদীময়তা ও বাসযোগ্য পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। জনসংখ্যার যে ঘনত্ব আমরা তৈরি করেছি, তাতে এ শহর কোনোভাবে এখন বাসযোগ্য বলা যাচ্ছে না। এ কারণে আমরা অনেকেই নিজের শহরের জন্য গৌরবান্বিত হতে পারছি না। 

আমরা এখনই যদি এ অবস্থার পরিবর্তনে উদ্যোগ না নিই, তাহলে আর কখনও পরিবর্তন করা সম্ভব হবে না। এই নিবন্ধ যখন লিখছি, সেদিনও ভূমিকম্প হয়েছে। এ নিয়ে গত এক সপ্তাহে চারটি ভূমিকম্প হলো, যেগুলোর কেন্দ্রস্থল ঢাকার উপকণ্ঠের নরসিংদী। মঙ্গলবারই কড়াইল বস্তিতে আগুন লেগেছে। ঢাকা মহানগরীতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এ দুর্যোগ মানবসৃষ্ট। এত কিছুর পরও কর্তৃপক্ষগুলো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। সম্ভাবনা যা আছে তাও নিঃশেষ করে দেওয়া হচ্ছে। 

আরও উদ্বেগের বিষয়, দুর্যোগের কারণ চিহ্নিত করা হচ্ছে না। ক্ষতি কমিয়ে আনতে কী করণীয়, তারও কোনো দিকনির্দেশনা নেই; বরং বিষয়গুলো অবজ্ঞা করা হচ্ছে বিভিন্নভাবে। দুর্যোগের এসব পূর্বাভাস বহু আগে থেকে দেওয়া হলেও সেদিকে আমরা গুরুত্ব দিইনি। এখন এসব আশঙ্কা দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। এর বাইরে ঢাকার আশপাশে যেসব নদী ও খাল রয়েছে, কোনোটাই এখন স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। নদী ভরাট, দখল, সব ধরনের অপতৎপরতার মাধ্যমে পরিবেশ-প্রকৃতি ধ্বংস করা হচ্ছে। এতে ঢাকা হারিয়েছে নগর হিসেবে সব ধরনের যোগ্যতা। 
এভাবে একটা শহরের নগর পরিকল্পনা হতে পারে না।

আমরা ক্রমাগত একটা আত্মঘাতী অবস্থানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টাও করছি না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য– সর্বক্ষেত্রে বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন। সেটা একমাত্র রাজনৈতিক সদিচ্ছার মধ্য দিয়েই সম্ভব। এর সঙ্গে সাম্যের ভিত্তিতে সম্পদেরও পুনর্বণ্টন এবং বিভিন্ন অঞ্চলজুড়ে কর্মক্ষম তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা আবশ্যক। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করে কুমিল্লা, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, গাজীপুরসহ ঢাকার আশপাশ এলাকাজুড়ে বিকেন্দ্রীকরণের শক্তিশালী পাটাতন গড়ে তোলা জরুরি। শুরুতেই বিকেন্দ্রীকরণের প্রাথমিক কাজগুলো করতে পারি। ধীরে ধীরে আমরা বাকি কাজগুলো নিয়ে এগোতে পারব। এসব কাজ মাত্র তিন থেকে পাঁচ বছরের ব্যাপার। এসব ব্যাপারে বহু আলাপ-আলোচনা, নীতিমালা গৃহীত হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন করতে না পারলে তা কোনো কাজে আসবে না। তাই নীতিগুলো হতে হবে বাস্তবসম্মত ও জনকল্যাণমুখী। অথচ নতুন বন্দোবস্ত কিংবা নতুন সংস্কারের ক্ষেত্রে কোথাও স্থানীয় সরকারের বিন্যাসের কথাটি গুরুত্ব পায়নি। ঢাকার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নগরের বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়কে কোথাও প্রাধান্য দেওয়া হয়নি। কেবল রাজনৈতিক দলগুলোর কে কোথায় ক্ষমতা নেবে, কোথায় ক্ষমতা পাবে, সেখানে সীমাবদ্ধ। এর মানে হলো, ঢাকা নিয়ে আমরা এখনও যথেষ্ট উদ্বিগ্ন নই এবং আমাদের কোনো বাস্তবসম্মত পরিকল্পনাও হাতে নেই। 

আমার প্রত্যাশা, অচিরেই একটি কমিশন গঠন করে ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণ করা হবে; নীতিমালার সঙ্গে সঙ্গে প্রায়োগিক দিকটা স্পষ্ট থাকবে। এভাবে নীতিগুলো বাস্তবায়নে চার-পাঁচ বছর কাজ করলে ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব। আশা করি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে নীতিনির্ধারক মহল এ ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে আসবে। 

ইকবাল হাবিব: স্থপতি 

আরও পড়ুন

×