ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অর্থনীতি

নতুন ব্যাংক অনুমোদন যে কারণে অসংগত

নতুন ব্যাংক অনুমোদন যে কারণে অসংগত
×

মামুন রশীদ

মামুন রশীদ

প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:০৭ | আপডেট: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:০৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

অনেকেরই মতে, বর্তমানে দেশের অর্থনীতির বড় ক্ষত হলো ব্যাংক খাত। একদিকে দেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা অনেক বেশি। অন্যদিকে অধিকাংশ ব্যাংক বহুমুখী সমস্যায় জর্জরিত, যার মধ্যে প্রধানতম হলো ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, স্বল্প সেবাপণ্য ও সুশাসনের সংকট। এমন পরিস্থিতিতে আবারও নতুন ব্যাংক অনুমোদন দেওয়ার উদ্যোগ চলছে। নতুন ব্যাংক অনুমোদনের উদ্যোগ হিসেবে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ‘ক্ষুদ্র ঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৫’ শীর্ষক যে খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে, তা চূড়ান্ত করার আগে দেশের ব্যাংক খাতের বাস্তব প্রেক্ষাপট নিবিড় পর্যালোচনার দাবি রাখে।

দেশে বর্তমানে তপশিলভুক্ত ব্যাংকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬২। এর মধ্যে ৪৩টি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেসরকারি উদ্যোগে। ব্যাংকের সংখ্যায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে ২০০৯ সালের পর। সে সময় থেকে আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী বিবেচনায় প্রতিনিয়তই নতুন নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেয়। কেবল তা-ই নয়, বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদসহ নানা পর্যায়ে ক্ষমতাসীনদের পছন্দমতো পরিবর্তন আনা হয়। ব্যাংকের সংখ্যা বাড়লেও গ্রাহকসেবার মানে কিন্তু তেমন পার্থক্য আসেনি। দেশব্যাপী ব্যাংকগুলোর শাখা-প্রশাখা বাড়ানো হয়েছে। এতে ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। তা সামাল দিতে উদারহস্তে ঋণ দেওয়ার নীতি নেওয়া হয়, বিশেষত ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ঘনিষ্ঠরা ছিল যার সুবিধাভোগী। এসব ঋণের বড় একটি অংশই বর্তমানে খেলাপি। এভাবে ব্যাপক রাজনীতিকীকরণের শিকার হয়েছে ব্যাংক খাত, সুশাসনের অভাব তীব্র হয়েছে তাতে। অধিকাংশ ব্যাংকের মূলধন কাঠামোও দুর্বল হয়ে পড়েছে।

এমন বাস্তবতায় অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর ব্যাংক খাতের সংস্কার নিয়ে আলোচনা ওঠে, যেখানে গুরুত্ব পায় ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে আনার কথা। এর অংশ হিসেবে শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করে একটি ব্যাংকে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে এসব ব্যাংকের গ্রাহকরা হতাশার মধ্যে রয়েছেন। আমানতকারীরা টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। আবার কেবল সোনালী ব্যাংক ছাড়া অন্য সব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। তারপরও সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক খাত সংস্কারের মাধ্যমে পুনর্গঠনের দিকে না গিয়ে নতুন করে সরকারি উদ্যোগেই ব্যাংক অনুমোদনের দিকে হাঁটছে। এটি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। ব্যাংকের সংখ্যা বাড়ানো নয়, এ খাতে পূর্ণ সুশাসন ও সক্ষমতা শক্তিশালী করা সরকারের মনোযোগ ও অগ্রাধিকারে থাকা সমীচীন। অর্থ উপদেষ্টা নিজেই সম্প্রতি বলেছেন, ২০০১-০৬ সময়কালে তৎকালীন সরকার শত সুপারিশ সত্ত্বেও কোনো নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেয়নি এবং এটা খুবই ভালো হয়েছে।

চীনের ব্যাংক খাতের সংস্কার নিয়ে আমার কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেদিকে তাকালে বোঝা যায় ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৮ সালের পর ধাপে ধাপে আর্থিক সংস্কারের মাধ্যমে চীন একক ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে আধুনিক, ব্যাংকনির্ভর আর্থিক ব্যবস্থায় উত্তরণ ঘটায়। একসময় দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ছিল ঊর্ধ্বমুখী। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রম ঢেলে সাজানোসহ, বাণিজ্যিক ব্যাংক আইন প্রণয়ন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ঋণ শ্রেণিবিন্যাস, কার্লাইল, মরগান স্ট্যানলির মতো সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির মাধ্যমে অকার্যকর ঋণ স্থানান্তর এবং পর্যায়ক্রমে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির মতো কাঠামোগত সংস্কার দেশটির ব্যাংক খাতকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে। প্রতিটি ব্যাংকের রয়েছে সুনির্দিষ্ট কাজ। কোনো ব্যাংক তার নির্ধারিত খাতের বাইরে ঋণ প্রদান করে না। যে কারণে প্রতিটি খাতের উন্নয়নে ব্যাংকগুলোর রয়েছে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা। অথচ আমাদের দেশের সব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংককে প্রায় একই কাজ করতে দেখা যায়। এ দেশের কৃষি ব্যাংকের বিরুদ্ধে কৃষককে ঋণ না দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ফলে অর্থনীতিতে ব্যাংক খাত বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনীয় একাধিক অর্থনীতির দেশে ব্যাংকের সংখ্যা সীমিত রাখা হয়েছে। থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার অর্থনীতির আকার বিবেচনায় স্থানীয় ব্যাংকের সংখ্যা বাড়েনি। থাইল্যান্ডের জিডিপির আকার ছাড়িয়েছে ৫০০ বিলিয়ন ডলার। সে তুলনায় দেশটিতে সরকারি খাতে মাত্র ছয়টি এবং বেসরকারি খাতে মাত্র ১২টি ব্যাংক। অর্থাৎ সব মিলিয়ে দেশটিতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত নিজস্ব ব্যাংকের সংখ্যা ১৮। এশিয়ার অন্যতম ধনী দেশ সিঙ্গাপুরে স্থানীয় ব্যাংক মাত্র পাঁচটি। উদীয়মান অর্থনীতির দেশ মালয়েশিয়ায় স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা ব্যাংকের সংখ্যা মাত্র আটটি। এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতেও বাংলাদেশের চেয়ে ব্যাংকের সংখ্যা কম। দেশটিতে ১২টি সরকারি ও ২২টি বেসরকারি ব্যাংক রয়েছে। যদিও ভারতে অঞ্চলভিত্তিক ৪৩টি ব্যাংকের পাশাপাশি ৪৬টি বিদেশি ব্যাংকও কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ভিয়েতনামের চিত্রও প্রায় একই রকম। এ ছাড়া যেসব উন্নত দেশে ব্যাংকের সংখ্যা বেশি, সেসব দেশের ব্যাংকগুলো কখনোই একই কার্যক্রম পরিচালনা করে না। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় পাঁচ হাজারেরও বেশি ব্যাংক থাকলেও রাজ্য, শহর ও অঞ্চলকেন্দ্রিক কার্যক্রম পরিচালনা করে বেশির ভাগ ব্যাংক। সব মিলিয়ে এসব দেশের ব্যাংক খাত একটি বার্তাই দেয় যে ব্যাংকের সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে বিদ্যমান ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা ও পণ্যের সমারোহ ঘটানো বেশি জরুরি। এ জন্য সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য।

দেশের ব্যাংক খাত সুসংগঠিত থাকলে এখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তোলা যেত; দেশের অনেক অর্থনৈতিক সংকট এড়ানো সম্ভব হতো। ব্যাংক খাতের মূল সম্পদ হলো ঋণ। কিন্তু ঋণের নামে দেশের ব্যাংক খাত লুণ্ঠন করেছে একটি নির্দিষ্ট অলিগার্ক গোষ্ঠী। এ কারণে দিন দিন খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। ব্যাংক খাতের সঙ্গে লুণ্ঠনের শিকার হয়েছে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও। বর্তমানে অন্তত ২০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান রুগ্‌ণ পরিস্থিতিতে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন ব্যাংক অনুমোদন না দেওয়াই সংগত, তাতে সন্দেহ নেই।

নতুন ব্যাংক অনুমোদনের যুক্তি হিসেবে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, উদ্যোক্তা সৃষ্টি বা সামাজিক ব্যবসার কথা প্রায়ই বলা হয় বা হয়েছে। নতুন নতুন ব্যাংক অনুমোদন দিয়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো যায় না। বরং বিদ্যমান ব্যাংকের মধ্যেই বিশেষায়িত উইন্ডো, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা ও লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে এ কাজ ভালোভাবে করা যায়। এতে ব্যাংক খাতও টেকসই হয়। ব্যাংকের সংখ্যা না বাড়িয়ে কীভাবে অতিরিক্ত ব্যাংকের বোঝা কমানো এবং ব্যাংকিং সেবার মানোন্নয়ন ঘটানো যায়, সেগুলো সরকারের বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সরকারের জন্যও একই পরামর্শ প্রযোজ্য।

মামুন রশীদ: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

আরও পড়ুন

×