ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

শিক্ষা ও প্রযুক্তি

মোবাইল ফোন কি পাঠ্যপুস্তকের বিকল্প হতে পারে?

মোবাইল ফোন কি পাঠ্যপুস্তকের বিকল্প হতে পারে?
×

মাহবুবুর রাজ্জাক

মাহবুবুর রাজ্জাক

প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:০৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস যেমন–ল্যাপটপ, ট্যাব বা মোবাইল ফোন শিশুদের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। প্রাথমিক শিক্ষার্থীরাও মোবাইলের বিভিন্ন অ্যাপ, ভিডিও ও ইন্টার‌অ্যাকটিভ কনটেন্ট ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। কভিড মহামারির সময় শিক্ষা ব্যবস্থায় ডিজিটাল পদ্ধতি আশীর্বাদ হয়ে বিস্তার লাভ করে। ছাত্র-শিক্ষকের মাঝে ল্যাপটপ-মোবাইলের ব্যবহার বেড়ে যায়। তারা জুম, গুগল ক্লাসরুম ইত্যাদি সফটওয়্যারের মাধ্যমে ক্লাসরুম ইন্টারেকশনের প্রয়োজনটি ডিজিটাল উপায়ে সমাধানের চেষ্টা করে। এমনকি তখন কোথাও কোথাও ডিজিটাল উপায়ে পরীক্ষা পর্যন্ত নেওয়া হয়। 
কিছুদিন আগেও ডিজিটাল দেশ গড়ার যে হাইপ তৈরি হয়েছিল, তা ইতোমধ্যে কমে এসেছে। তখন বলা হতো, সবার হাতেই থাকবে হয় ট্যাব, নয়তো নিদেনপক্ষে একটি ডিজিটাল মোবাইল সেট। এতে থাকবে ডিজিটাল বই। সঙ্গে তথ্যের অফুরন্ত ভান্ডার। দেশে-বিদেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার নিয়ে ইতোমধ্যে যে গবেষণা হয়েছে, তাতে এখন আর কেউ ট্যাব বা মোবাইল সেটকে পাঠ্যপুস্তকের বিকল্প হিসেবে দেখছে না; সহায়ক হিসেবে দেখছে।                

পাঠ্যপুস্তক হলো জাতীয় শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রম অনুযায়ী অনুমোদিত জ্ঞানভিত্তিক দলিল। এতে শিক্ষার্থীর বয়স ও মানসিক পরিপক্বতা অনুযায়ী বিভিন্ন বিষয় সাজানো হয়। পরীক্ষা ব্যবস্থা ও যথোপযুক্ত মূল্যায়ন পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ পর্যবেক্ষণ করা হয়। অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশগুলোতে গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক স্তরে মুদ্রিত পাঠ্যপুস্তক শিশুদের মনোযোগ, গভীর পাঠ ও শিখনক্ষমতা বাড়াতে বেশি কার্যকর। অন্যদিকে মোবাইল ফোনে গভীর পাঠে সমস্যা থেকে যায়। স্ক্রিনে পড়া তুলনামূলকভাবে দ্রুত ভুলে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি করে। শিশুরা ডিজিটাল ডিভাইসে পড়াশোনায় দীর্ঘ মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। মোবাইলে একসঙ্গে গেম ও বিভিন্ন ধরনের ভিডিও থাকায় মনোযোগ বিচ্যুত ও শেখার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়।

ডিজিটাল ডিভাইসের অতি ব্যবহার স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তৈরি করে, তাও কারও অজনা নয়।  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শিশুদের স্ক্রিন টাইম সীমিত রাখার পরামর্শ দিয়েছে। অধিকন্তু, সব শিশুর সমান মানের স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট নেই। ফলে শিক্ষা সমতা ব্যাহত হয়, যা শিশুদের কোমল মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে অনুপযুক্ত কনটেন্টের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। সহিংস বা অনৈতিক কনটেন্ট শিশুদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত স্ক্রিন-টাইম শিশুদের মৌখিক ও সামাজিক যোগাযোগের ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। ভাষা ও যোগাযোগের দক্ষতার বিকাশে এর প্রভাব পড়ে। মানুষ সামাজিক জীব। ব্যক্তিগত পর্যায়ে যে দক্ষতাই অর্জিত হোক না কেন, সামাজিক যোগাযোগে পারঙ্গম না হলে কোনো ব্যক্তির পরিপূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়। মানুষ অনেক সময় শিক্ষকদেরই আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে। কখনও কখনও শিক্ষকরা আদর্শ মানুষকে অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করে থাকেন। অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভরতা ছাত্রের মানসিক বিকাশের পথে শিক্ষকের ভূমিকাকে সংকুচিত করে ফেলতে পারে। মানবিক স্পর্শ ও নৈতিক শিক্ষার সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে।

পাঠ্যবইয়ের জটিল বিষয়গুলো ব্যাখ্যার জন্য ভিডিও অ্যানিমেশন, কুইজ, ইন্টার‌অ্যাকটিভ অনুশীলন শিক্ষার্থীদের জন্য উপকারী হতে পারে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য অডিও-ভিজুয়াল সহায়তা দারুণ কার্যকর। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে শিক্ষাসংক্রান্ত অ্যাপ, ইন্টারনেটভিত্তিক পাঠ ইত্যাদি শিশুদের জন্য সহজে এবং আকর্ষণীয়ভাবে শেখার সুযোগ সৃষ্টি করে। শিক্ষার্থীরা মোবাইল ফোনের সাহায্যে শিক্ষামূলক তথ্য খুঁজে পেতে সক্ষম হয়। এতে নিজে নিজে শেখার সক্ষমতা ও আগ্রহ বাড়ে।

গবেষণায় দেখা গেছে, পাঠ্যপুস্তকের সঙ্গে ডিজিটাল কনটেন্ট যুক্ত করলে শেখার ফল ভালো হয়। গণিত ও বিজ্ঞানের জটিল বিষয় সহজে বোধগম্য হয়। অনলাইন যোগাযোগ, তথ্য ভাগাভাগি ও বিভিন্ন ডিজিটাল লার্নিং প্ল্যাটফর্ম শিশুদের শিক্ষাগত সহযোগিতা বাড়াতে সাহায্য করে। তাই কর্তৃপক্ষের উচিত শিক্ষামূলক কনটেন্ট নিজেই তৈরি করার ব্যবস্থা করা অথবা নেটে প্রাপ্ত শিক্ষা সহায়ক কনটেন্ট বাছাই করে তার তালিকা প্রস্তুত করে শিক্ষার্থীদের জানিয়ে দেওয়া। এতে শুধু প্রমাণিতভাবে উন্নতমানের শিক্ষামূলক অ্যাপ ও রিসোর্স ব্যবহার নিশ্চিত হবে। সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষক ও অভিভাবকের তদারকির জায়গাটি নিশ্চিত করতে হবে। 

ইউরোপে ক্লাসে মোবাইল ফোনের ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন ধরনের নীতি আছে, কিন্তু সাধারণভাবে এটিকে স্কুলশিক্ষার মূল উপকরণ হিসেবে এখনও ব্যবহার করা হচ্ছে না। বরং অনেক দেশে নিয়ন্ত্রিত বা নিষিদ্ধ আছে, আবার কোথাও কোথাও শিক্ষানীতিতেই শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অনুমতি আছে। বর্তমানে শিক্ষা ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষার অন্তর্ভুক্তি নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। মফস্বল অঞ্চলের অনেক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সবার জন্য কম্পিউটার ব্যবহারের সুবিধা দেওয়া কঠিন হতে পারে। তখন প্রাথমিকভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষার কাজে স্মার্টফোন ব্যবহার করতে দিতে হবে।   
মোদ্দাকথা, মোবাইল ফোন পাঠ্যপুস্তকের বিকল্প হতে পারে না, বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষায় তো নয়ই। তবে পাঠ্যপুস্তকের সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তির সমন্বয়ে সবচেয়ে কার্যকর শিক্ষাকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। অতএব, পাঠ্যপুস্তক থাকবে শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আর ডিজিটাল ডিভাইস থাকবে সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে। মানসিক ও স্বাস্থ্যগত কারণে শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষামূলক উদ্দেশ্য ছাড়া অন্যান্য সময় মোবাইল ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা থাকা উচিত। দিনের পুরো কর্মঘণ্টা মোবাইল ফোনে আটকে ফেললে মানুষের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের দক্ষতা কমে যাবে। 

ড. মাহবুবুর রাজ্জাক: অধ্যাপক, 
যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট 
[email protected]

আরও পড়ুন

×