অর্থনীতি
কর ব্যবস্থা সংস্কারে আশু মনোযোগ
মামুন রশীদ
মামুন রশীদ
প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১০:৪৬
নির্বাচনের আগে দুটি বড় দল থেকেই অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল। নির্বাচনের পর সেসব আশাবাদ বাস্তবায়নে যে অনেক টাকা লাগবে, তাতে সন্দেহ নেই। শর্তহীনভাবে টাকা জোগাড় করতে হলে নজর দিতে হবে রাজস্ব আয়ে; আর শর্তযুক্ত হলে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে। শর্তাধীনেও যে অনেক টাকা পাওয়া যাবে, তার নিশ্চয়তা নেই। সে ক্ষেত্রে আমাদের রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে।
ওদিকে, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার পথে অন্যতম বাধা ব্যবসায়ের বৈরী পরিবেশ। এ ক্ষেত্রে নানামুখী প্রতিবন্ধকতার অন্যতম জটিল ও অযৌক্তিক শুল্ক ও রাজস্ব কাঠামো। এ কারণে ব্যবসা সম্প্রসারণ ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রেও ঝুঁকির আশঙ্কা রয়ে গেছে। এসব ঝুঁকি কাটিয়ে উঠতে হলে প্রয়োজন ন্যায্য শুল্ক কাঠামো।
সন্দেহ নেই, গেল কয়েক বছরে দেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। অর্থনীতির আকার বেড়েছে। এর পরও দেশের জিডিপির বিপরীতে কর আহরণ বাড়েনি। কর-জিডিপির অনুপাত এখনও জিডিপির ৭ শতাংশ মাত্র; উন্নয়নশীল ও অনেক স্বল্পোন্নত দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে কম। কিন্তু এলডিসি থেকে উত্তরণের পর যখন শুল্কছাড়, বাণিজ্যিক সুবিধা ও নীতিসহায়তা ক্রমেই কমবে, তখন দুর্বল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে একটি টেকসই ও যৌক্তিক শুল্ক কাঠামো গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
আমরা জানি, বাংলাদেশের কর ব্যবস্থা মূলত পরোক্ষ করকেন্দ্রিক; বিশেষত সম্পূরক ও আবগারি শুল্ক রাজস্ব আহরণের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত। বর্তমানে জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশ আসে এ শুল্ক থেকে, যা আধুনিক অর্থনীতির কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সাধারণত অর্থনীতি যত উন্নতির দিকে যায়, তত প্রত্যক্ষ করের অবদান বাড়ে। কিন্তু বাংলাদেশে বিপরীত চিত্রই দেখা যাচ্ছে।
আবগারি ও সম্পূরক শুল্ক আরোপের নীতিগত উদ্দেশ্য স্পষ্ট। এসব শুল্ক একদিকে রাজস্ব সংগ্রহে সহায়তা করে, অন্যদিকে স্বাস্থ্য ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর কিংবা বিলাসী পণ্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। আন্তর্জাতিকভাবে তামাক, অ্যালকোহল বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ স্বীকৃত নীতি। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ শুল্ক অনেক সময় নীতিগত সীমা অতিক্রম করে অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
বাস্তবতা হলো, বহু পণ্যে সম্পূরক ও আবগারি শুল্কহার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা ব্যবসা পরিচালনার খরচ অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে একদিকে ভোগ সংকুচিত হচ্ছে, অন্যদিকে সেসব পণ্যের উৎপাদন ও বিনিয়োগও ব্যাহত হচ্ছে। দেশীয় থেকে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো উচ্চ শুল্ককে অন্যতম প্রধান ব্যবসায়িক ঝুঁকি হিসেবে দেখছে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এটি নেতিবাচক সংকেত।
এ প্রেক্ষাপটে যৌক্তিক শুল্কহার নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যৌক্তিক শুল্কহার বলতে এমন কাঠামো বোঝায়, যেখানে শুল্কের মাত্রা রাজস্ব প্রয়োজন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও ব্যবসা পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অযৌক্তিকভাবে উচ্চ শুল্ক আরোপ করে স্বল্প মেয়াদে কিছু রাজস্ব পাওয়া গেলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা টেকসই হয় না। বরং কর ফাঁকি বাড়ে, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির আকার বাড়তে থাকে। পাশাপাশি রাজস্ব আহরণের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা আরও প্রকট হয়ে দাঁড়ায়। যদিও এ খাতই দেশের কর্মসংস্থান ও অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের প্রধান চালিকাশক্তি, কিন্তু জটিল ও উচ্চ শুল্ক কাঠামোর কারণে তারা কর ব্যবস্থার বাইরে থাকে। এতে রাজস্ব আহরণ কমে এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে নিরুৎসাহিত হয়। ফলে ব্যবসা সহজীকরণের লক্ষ্য ব্যাহত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়।
শুল্ক কাঠামোর জটিলতাও বড় সমস্যা। দেশে প্রায় এক হাজার ৭০০ আবগারি শুল্ক লাইন এবং হাজার হাজার আদর্শমাত্রা বিদ্যমান। এত বেশি স্তর ও হার ব্যবসায়ীদের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করে এবং রাজস্ব প্রশাসনের সক্ষমতাকেও দুর্বল করে। তাই ব্যবসা সহজীকরণের পূর্বশর্ত হলো সহজ, স্বচ্ছ ও পূর্বানুমেয় শুল্ক ব্যবস্থা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আবগারি শুল্ক নির্ধারণের পদ্ধতি। বাংলাদেশে এখনও মূলত মূল্যভিত্তিক শুল্ক ব্যবস্থা প্রচলিত। এতে পণ্যের মূল্য কম দেখিয়ে কর ফাঁকির সুযোগ তৈরি এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়। আধুনিক বিশ্বে পরিমাণভিত্তিক আবগারি শুল্ক বেশি কার্যকর ও স্বচ্ছ হিসেবে বিবেচিত। এ পদ্ধতিতে রূপান্তর রাজস্ব স্থিতিশীলতা ও নীতিগত স্বচ্ছতা বাড়াতে পারে। এ ছাড়া দেশীয় ও আমদানি করা পণ্যের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন আবগারি শুল্কহার আরোপও দীর্ঘ মেয়াদে সমস্যা হয়ে উঠতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে দেশীয় শিল্প সুরক্ষার যুক্তি দেওয়া হলেও এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্য রাখতে হবে। বৈষম্যমূলক শুল্ক কাঠামো তখন বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এলডিসি থেকে উত্তরণ শুধু মর্যাদাগত অর্জন নয়; নীতিগত শৃঙ্খলা ও কাঠামোগত সংস্কারেরও বিষয়। উত্তরণের পর শুল্কছাড়, রপ্তানি সুবিধা ও নীতিগত সুরক্ষা কমে যাবে। তখন অভ্যন্তরীণ রাজস্ব কাঠামো শক্তিশালী ও যৌক্তিক না হলে উন্নয়নের গতি ধরে রাখা কঠিন হবে। এ জন্য প্রয়োজন একক ও সহজ শুল্ক কাঠামো। সেই সঙ্গে প্রতিটি স্তরে যৌক্তিক ও টেকসই শুল্কহার নির্ধারণ করতে হবে। শুল্কনীতিতে হঠাৎ পরিবর্তনের প্রবণতা কমিয়ে আনা এ ক্ষেত্রে জরুরি।
ব্যবসা সহজীকরণ ও এলডিসি থেকে উত্তরণ; এ দুটি অনেকাংশে পরস্পর সম্পৃক্ত। যৌক্তিক শুল্ক কাঠামো ছাড়া কোনোটিই টেকসই হবে না। অযৌক্তিক উচ্চ শুল্ক-নির্ভরতা থেকে সরে এসে আধুনিক, ন্যায্য ও ব্যবসাবান্ধব শুল্ক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত জাতীয় কর কাঠামো পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত টাস্কফোর্স প্রতিবেদনেও এ বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে।
পাশাপাশি শুল্ক কাঠামো আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে রপ্তানি ও আমদানির বিকল্প পণ্যের কার্যকর সুরক্ষা সমান করারও সুপারিশ করেছে। এগুলোর পাশাপাশি সবচেয়ে বড় প্রয়োজন রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে অনিয়ম-দুর্নীতি দূর করা। বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন দক্ষ প্রশাসন ও প্রযুক্তির সম্পৃক্ততা অগ্রাধিকার পেতে হবে। এতে রাজস্ব আয় বাড়ানোর পথ প্রশস্ত হবে।
মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক
- বিষয় :
- অর্থনীতি
- মামুন রশীদ
