ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শিক্ষাঙ্গন

ইবি শিক্ষক হত্যা এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রুপিং 

ইবি শিক্ষক হত্যা এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রুপিং 
×

অনি আতিকুর রহমান

অনি আতিকুর রহমান

প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬ | ১৮:৫১ | আপডেট: ০৭ মার্চ ২০২৬ | ১৯:৫৬

ছাত্রজীবনে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক সুন্দর দিক দেখার পাশাপাশি কিছু অন্ধকার দিকও প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়েছিল। ক্যাম্পাস রিপোর্টার হিসেবে কাজ করার কারণেই ওই নেতিবাচক দিকগুলো গভীরভাবে দেখতে পাই। সম্প্রতি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) এক নারী শিক্ষক নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর সে বিষয়গুলো লেখা দরকার বলে মনে করছি। 

যাহোক, গত ৪ মার্চ কুষ্টিয়ায় নিজ দপ্তরে কর্মচারীর ছুরিকাঘাতে খুন হন ইবির সমাজকল্যাণ বিভাগের চেয়ারম্যান আসমা সাদিয়া রুমা। এ সময় নিজের গলায় ছুরি চালালেও ঘাতক ফজলুর রহমান জীবিত আছে। এদিকে ময়নাতদন্ত শেষে শিক্ষিকা আসমার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এ ঘটনায় চারজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন তাঁর স্বামী ইমতিয়াজ সুলতান। এতে অস্থায়ী কর্মচারী ফজলুর রহমানকে এক নম্বর আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া আসমার সহকর্মী দুই শিক্ষক ও এক সহকারী রেজিস্ট্রারকেও আসামি করা হয়েছে।

মামলায় আসামি ওই দুই শিক্ষক হলেন সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার ও হাবিবুর রহমান। শ্যাম সুন্দর আগে আসমা সাদিয়ার বিভাগের সভাপতি ছিলেন। অপর আসামি বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস উম্মুল মোমেনিন আয়েশা সিদ্দিকা হলের সহকারী রেজিস্ট্রার। কিছুদিন আগে সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে তাকে সেখানে বদলি করা হয়।
এজাহারে বলা হয়, ওই দুই শিক্ষক ও এক কর্মকর্তার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও নির্দেশে কর্মচারী খন্দকার ফজলুর রহমান শিক্ষককে হত্যা করেছেন। মামলায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদেরও আসামি করা রয়েছে। তবে সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি।

মামলার এজাহারে নিহতের স্বামী অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আসমা সাদিয়া রুনা বিভাগীয় সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর তাকে বিভাগের পূর্ববর্তী সময়ের আয়-ব্যয়ের কোনো হিসাব বুঝিয়ে দেননি আগের সভাপতি শ্যাম সুন্দর। স্বামীর অভিযোগ অনুযায়ী, বিভাগীয় কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার রুনাকে বলেছেন ‘আপনি সভাপতি হয়েছেন, আমরা যেভাবে বলি এবং যে কাগজ সামনে ধরবো আপনি শুধু স্বাক্ষর করবেন।’ তবে রুনা এতে রাজি না হয়ে বিভাগীয় তহবিল স্বচ্ছতার ভিত্তিতে ব্যবহারের কথা জানান। এরপর থেকেই তার সঙ্গে বিশ্বজিৎ কুমার ও শিক্ষক শ্যাম সুন্দর সরকারের মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়। বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস ও শ্যাম সুন্দর সরকার উভয়ে মিলে অফিস সহায়ক ফজলুর রহমানকে দিয়ে বিভিন্ন সময়ে রুনাকে অসহযোগিতা ও হেনস্তা করতে থাকে। এ ঘটনায় তখন ফজলুর রহমানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলে তিনি লিখিতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। (সমকাল, ৫ মার্চ ২০২৬)

এজাহার অনুসারে, কয়েক মাস আগে ডিনের নির্দেশে বিভাগীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও বিভাগীয় সভাপতিকে অসহযোগিতা করায় ফজলুরকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শিক্ষক হাবিবুর। তিনি ফজলুরকে পুনরায় সমাজ্যকল্যাণ বিভাগে আনতে আসমাকে চ্যালেঞ্জ ছোড়েন। অন্যদিকে বিভাগের অর্থ তছরুপের ঘটনায় বিশ্বজিৎকে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বদলি করা হয়। এর পর থেকে আসমাকে সবাই মিলে হত্যার পরিকল্পনা করতে থাকেন। দুই শিক্ষক ও এক কর্মকর্তার সরাসরি প্ররোচনায় এবং নির্দেশনায় ফজলুর ধারালো ছুরি নিয়ে আসমার অফিসকক্ষে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দেন এবং হত্যা করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব ঘটনা প্রায়ই স্বামীকে সাদিয়া জানাতেন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়। এজাহারের অভিযোগগুলো খেয়াল করা খুব জরুরি। কারণ, একজন অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীর এমন দুঃসাহস তৈরির ক্ষেত্র প্রস্তুত মূলত এভাবেই হয়েছে। শিক্ষকদের মধ্যে ঐক্যের পরিবর্তে দ্বন্দ্ব এমন পরিস্থিতি তৈরির পেছনে দায়ী।

২.
দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা শিক্ষকদের গ্রুপিং ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সর্বশেষ শিকার বলা যায় শিক্ষক আসমা সাদিয়াকে। এর আগে এই দ্বন্দ্বের ভুক্তভোগী হতেন শুধুমাত্র শিক্ষার্থীরা। আমার ছাত্রজীবনে রিপোর্টার হিসেবে দেখা অভিজ্ঞতা তা-ই বলে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক বিভাজনের মধ্যে পড়ে কত মেধাবীর ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়েছে; তা গবেষণার দাবি রাখে। একজন শিক্ষার্থী জানতেও পারে না- দিনরাত এক করে পড়াশোনা করে, পরীক্ষার খাতায় দারুণভাবে উপস্থাপন করে, দুর্দান্ত ভাইভা দিয়ে রেজাল্ট কমে যায়। আবার পাশেই তার গো-বেচারা টাইপের বন্ধুটি কীভাবে যেন অসাধারণ রেজাল্ট করে ফেলে। ভালো করে কোর্সের নামগুলোও হয়তো বলতে পারবে না। সেই আবার একদিন বড় পদও পেয়ে যায়! আর এই সবই হয় শিক্ষকদের বিশেষ গ্রুপিংয়ের মাধ্যমে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই যে শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং, এটি অত্যন্ত শক্তিশালী। যেখানে আদর্শ বা দলীয় পরিচয় বড় কোনো ব্যাপার নয়। বরং ব্যক্তিস্বার্থই মূখ্য। ব্যক্তিস্বার্থবাদী কিছু চতুর লোকের সমষ্টিই এই একেকটি গ্রুপ। এই গ্রুপের মধ্যে বিভিন্ন দলের বা মতাদর্শের ব্যক্তিরা থাকে। সেটা বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াত কিংবা বামপন্থী সবাই।

শিক্ষকদের এই গ্রুপই মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় নীতি, নিয়োগ প্রক্রিয়া ও আর্থিক প্রকল্পের নিয়ন্ত্রক। এদের সঙ্গে সহায়ক শক্তি হিসেবে জড়িত থাকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ, ছাত্রনেতা ও সাংবাদিকদের অংশও। তবে চালকের আসনে শিক্ষকরা।
এই গ্রুপই বিশেষ শিক্ষার্থীকে বেশি নম্বর দেয়, অপছন্দের জনকে কম; বিশেষ জনকে পাস করায়, আরেকজনকে ফেল। নিয়োগও প্রক্রিয়াও এই গোপন সিন্ডিকেটের দখলে। এরা প্রশাসনকে বাধ্য করে তাদের মনোনীত প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে। অন্যাথায় নিয়োগ বোর্ডই ভন্ডুল করে ফেলে। 

বিশেষ করে শিক্ষক হিসেবে ভবিষ্যতে যাদের নিয়োগ দেওয়া হবে; এদের একটি অংশকে এরা তৈরি করে। প্রার্থীদের শুরু থেকেই টার্গেট করে রেজাল্ট টেম্পারিং করা হয়। এক্ষেত্রে মেধাবী ও সাহসী শিক্ষার্থীদের চেয়ে এদের পছন্দ তুলনামূলক কম মেধাবী ও নতজানু শিক্ষার্থীদের। যাতে এদের থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়া যায়, এবং সেই তথ্য সংগ্রহে রেখে ব্লাকমেইল করে আজীবন নিজেদের বলয়ে রাখা যায়।

এরা পরিকল্পিতভাবে কোর্স বন্টন করে; পরীক্ষা কমিটি গঠন করে, দ্বিতীয় পরীক্ষক নির্বাচন করে, ভাইভাতে নিজ বলয়ের এক্সপার্ট রাখে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় যোগসাজশে ওইসব বিশেষ শিক্ষার্থীর রেজাল্ট বাড়িয়ে দেওয়া হয়। আর সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীদের রেজাল্ট তুলনামূলক কমিয়ে দেওয়া হয়। পরে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ওই কৃত্রিমভাবে তৈরি করা শিক্ষার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। 

এই সিন্ডিকেটের সুনজর পাওয়ায় এমনও হয় যে, একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল বিশেষ কোটায়, তিনিও এখন শিক্ষক। যার ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা ছিল না তার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়ানোর মতো এক্সিলেন্সি থাকবে না এটা স্বাভাবিক।

এই দুষ্টচক্রের অপকর্মের ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছে বছরের পর বছর। যোগ্য ও মেধাবীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া না গেলে শিক্ষা-গবেষণার মান কেমন হয় তা অজানা নয়। বৈশ্বিক র‍্যাংকিংয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান দেখলেও তা বোঝা যায়। আর অশিক্ষক যদি শিক্ষকতার সুযোগ পায় সে পরিবেশ নষ্ট করবেই।

৩. 
যেই গ্রুপের কথা এতক্ষণ আলোচনা করা হলো, তারা মূলত শক্তি সঞ্চয় করে রাজনৈতিক পরিসর থেকে। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়াশীল ছাত্র ও শিক্ষক সংগঠনগুলো ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করে। কিংবা ভিন্নভাবে বললে রাজনৈতিক দলের পরিচয়কে এরা সাইনবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করে।
শিক্ষকদের এক গ্রুপ আরেক গ্রুপকে ডোবানোর জন্য চেষ্টা করে। অপছন্দের ব্যক্তি যদি বিভাগের সভাপতি, পরীক্ষা কমিটির সভাপতি হয় তাকে অসহযোগিতা করতে থাকে। সময় মতো কোর্স শেষ করে না,  প্রশ্নপত্র জমা দেয় না, খাতা মূল্যায়ন করে না। এতে বিভাগ স্থবির হয়ে পড়ে। শুরু হয় সেশনজট। চাপ সহতে না পেরে অনেক সময় বিভাগের সভাপতি পদত্যাগ করতেও বাধ্য হয়। অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এগুলো দেখে নিয়ম ভঙ্গ করার সাহস পায়।

এছাড়া মেকানিজম করে অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষক-কর্মচারীরা সবসময়ই ভিন্ন পথ খোঁজে। পেশাদারিত্বের বদলে তারা অর্থ উপার্জনের বৈধ-অবৈধ পথ খুঁজে। নিজেরা দায়িত্ব পেলে আর্থিক সচ্ছতা বজায় রাখে না। তছরুপের সুযোগ পেলে তারা সেই সুযোগ হাতছাড়া করে না।

নিহত শিক্ষিকের স্বামীর দায়ের করা মামলার এজাহারে বিভাগের অন্যান্য শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়ে যে অভিযোগ করা হয়েছে; তা এখন মেলানো খুবই সহজ। এভাবেই তার স্ত্রী হত্যাযোগ্য হয়ে উঠেছিল। এবং সংগঠিত চক্রের অপকর্মের বলি হলেন সেই শিক্ষিকা।

৪.
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত এই সব অপরাধ বা অনিয়ম কেন্দ্রীয়ভাবে তত্বাবধানের ব্যবস্থা নেই। ফলে শিক্ষকরা ইচ্ছেমতো অফিস করেন, মর্জিমতো ক্লাস নেন, পরীক্ষা নেন, খাতা মূল্যায়নে দেরি করেন।
আবার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগের অর্থ অডিট করারও ধরাবাঁধা কোনো নিয়ম নেই। ফলে শুরুতে এসব অব্যবস্থাপনা থেকে অনিয়ম, অনিয়ম থেকে দুর্নীতি আর দুর্নীতি থেকে বৈরিতা তৈরি হয় সহকর্মীদের মধ্যে। এর ফলে সম্প্রীতি নষ্ট হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় একাডেমিক পরিবেশ।
এছাড়া শিক্ষার্থীদের ফলাফল টেম্পারিংয়ের ভয়াবহ অভিযোগ থাকলেও তা রিভিউ করার সুযোগ নেই। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্ট নিয়ে অসন্তোষ থাকলে তা বোর্ড চ্যালেঞ্জ করা যায়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স-মাস্টার্স পর্যায়ে সেই সুযোগও নেই, যা সময়ের দাবি।

পরিশেষে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হত্যাকাণ্ডকে কেবল একটি ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ বিষয় বা আঞ্চলিক বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি দীর্ঘ সিস্টেম লসের নৃশংস বহিঃপ্রকাশ। এটি পুরো দেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার জন্য এলার্মিং। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সুশাসন নিশ্চিত করতে অসম পদন্নোতির বিষয়টি সংস্কার করে আরও গঠনমূলক করতে হবে এবং অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ ব্যবস্থা চিরতরে বন্ধ করতে হবে। সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করে শিক্ষক কর্মকর্তা কর্মচারী পদে নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। 

অনি আতিকুর রহমান: লেখক ও সাংবাদিক
[email protected]

আরও পড়ুন

×