ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জাতীয় সংসদ

দ্বৈত নাগরিকের প্রার্থিতার বিতর্ক জারি থাকুক

দ্বৈত নাগরিকের প্রার্থিতার বিতর্ক জারি থাকুক
×

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১৫ | আপডেট: ১৫ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাহাত্তরের সংবিধানে জাতীয় সংসদের প্রার্থী হওয়ার অযোগ্যতা নির্ধারণে ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদে মুক্তিযুদ্ধের অহংকার ধারণ করে নিঃসংকোচে যুক্ত হলো– ‘তিনি কোন বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন’। কথা একদম পরিষ্কার। কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব শুধু নয়, যদি কেউ বিদেশি রাষ্ট্রের আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন, তাহলেও অযোগ্য হয়ে যাবেন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সদস্যপদে প্রার্থী হতে। সংবিধানের এই বিধানকে শিরোধার্য করে দেশে ২০০৮ পর্যন্ত ৯টি সংসদের নির্বাচন হয়েছে।

এরই মধ্যে বুড়িগঙ্গায় গড়িয়েছে অনেক জল। স্বচ্ছ জলের ধারা পেয়েছে কৃষ্ণ বরণ, বিলুপ্ত হয়েছে মাছের আবাস। নৌকা, লঞ্চ এমনকি নদীর ওপর দিয়ে সেতুতে পারাপারের সময়েও নাকে চাপতে হয় রুমাল। বুড়িগঙ্গার সেই কলুষিত হালতে বদলে গেল সংবিধানেরও চরিত্র। জুড়ে বসল নতুন অনুশাসন। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে ২০১১-এর ১৪ নম্বর আইনে সংবিধানে অতিরিক্ত পাঠ এলো: 

‘(২ক) এই অনুচ্ছেদের (২) দফার (গ) উপ-দফাতে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কোন ব্যক্তি জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হইয়া কোন বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করিলে এবং পরবর্তীতে উক্ত ব্যক্তি–
(ক) দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে, বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করিলে; কিংবা (খ) অন্য ক্ষেত্রে, পুনরায় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করিলে–

এই অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে তিনি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন না।’
সংবিধানে এই অনুশাসন যুক্ত হওয়ার পর নানা দোষে দুষ্ট তিনটি নির্বাচন হয়ে গেছে। তাতে দ্বৈত নাগরিকত্ব বা অন্যান্য বিধানের অনুকূলে-প্রতিকূলে কী হয়েছে না হয়েছে, সে ব্যাপারে কারও তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না। তবে সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র তৈরি হওয়ায় দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্ন জোরালো হয়ে সামনে এসেছে। 

নাগরিকত্ব-বিষয়ক আমাদের মূল আইন হয়েছে ১৯৫১ সালে। সময়ে সময়ে সংশোধিত হয়েছে। মূল আইনে দ্বৈত নাগরিকত্ব কঠোরভাবে বারিত ছিল। ক্রমান্বয়ে শিথিল হতে হতে ২০২৩ সাল পর্যন্ত একজন বাংলাদেশি দেশীয় নাগরিকত্ব বজায় রেখে বহির্বিশ্বে ১০১টি দেশের নাগরিকত্ব বহাল রাখতে পারেন। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ইরান, ইরাকসহ অনেক দেশ দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্নে এখনও একাট্টা। ওইসব দেশে দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকৃত নয়। বাংলাদেশের বিধান অনুযায়ী কোনো বাংলাদেশি বর্ণিত ১০১ দেশের নাগরিকত্ব লাভ করলে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বজায় রাখতে পারেন। তাহলে সরলীকরণ করলে কোনো ব্যক্তি ওই ১০১টি দেশের বাইরে কোনো দেশের নাগরিকত্ব লাভ করলে বাংলাদেশ তাঁর দ্বৈত নাগরিকত্ব অনুমোদন করে না। ১০১-এর বাইরের দেশ অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, রাশিয়া প্রভৃতি। প্রতিটি দেশের নাগরিকত্ব লাভ ও অন্য দেশের নাগরিকত্ব বহাল রাখার বিষয়টি সেই দেশের আইনের ওপর নির্ভরশীল।
এখন যে প্রশ্নটি বিবেচ্য, বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্জিত হয়ে যায়? ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কমপক্ষে ২০ জন প্রার্থীর বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন ও প্রয়োজনীয় অর্থ জমা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাদের মনোনয়নপত্র আপিলে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। এই তালিকায় শীর্ষস্থানীয় প্রায় সব রাজনৈতিক দলেরই প্রার্থী থাকায় বিষয়টি পারস্পরিক সহযোগিতায় হয়তো চাপা পড়ে গেছে। 

কোনো দেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে চাইলে মুখ দিয়ে উচ্চারণ করলেই হয়ে যায় না। যেসব দেশের নাগরিকত্ব নেওয়ার পরও নিজ জন্মভূমির নাগরিকত্ব বহাল থাকে সেসব দেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ কিছুটা সহজ। অন্যদিকে নিজ দেশের দ্বৈত নাগরিকত্ব বজায় না থাকলে যে দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করা হয়েছে, তা ত্যাগ করা সময়সাপেক্ষ। কোনো কোনো দেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হলে তিন মাস থেকে এক বছর বা তারও বেশি সময় লেগে থাকে। ব্যক্তি যাতে রাষ্ট্রবিহীন নাগরিক না হয়ে যায়, সে কারণে অন্য দেশের নাগরিকত্ব অর্জনের প্রমাণ দেখানোর পরে পূর্বোক্ত দেশ নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদন মঞ্জুর করতে পারে। আর কেউ কোনো কিছু মঞ্জুরের অধিকারী হলে নামঞ্জুরের এখতিয়ারও সংরক্ষণ করে থাকে।

যেসব প্রার্থীর বৈদেশিক নাগরিকত্ব বাতিলের নিশ্চয়তাপত্র ছাড়াই মনোনয়নপত্র বৈধ করা হয়েছিল, তার যথার্থতা নির্ধারণের দায় আদালতের। ক্ষতিগ্রস্ত কেউ আদালতের আশ্রয় না নেওয়ায় ধরে নেওয়া সংগত– মনোনয়নপত্রের বৈধতা দানে কোনো ত্রুটি হয়নি। তারা সবাই বা কেউ কেউ  নির্বাচিত হয়ে গেলে বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব বাতিলের নিশ্চয়তাপত্র না আসা পর্যন্ত দ্বৈত নাগরিক হিসেবে বহাল থাকা অবস্থাতেই কি সংসদে আসন নেবেন? যদি তাদের আবেদন সংসদের মেয়াদকাল শেষ হওয়ার আগে নিষ্পন্ন না হয়, তাহলে কি পুরো মেয়াদটিই তারা দ্বৈত নাগরিক হিসেবে সংসদ সদস্যপদে বহাল থাকবেন? দ্বৈত নাগরিকদের কেউ নির্বাচনে পরাজিত হলে অনায়াসেই তিনি দ্বিতীয় দেশে গিয়ে নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদন প্রত্যাহার করে নিয়ে ব্যক্তিগত ঝামেলা মিটিয়ে ফেলতে পারেন।

ত্রয়োদশ নির্বাচনে অন্তত ২০ জন প্রার্থীর ভিনদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ নিশ্চিত না করেই প্রার্থিতা বৈধ করা হয়েছে। এতে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের ২ক(ক) ও ২ক(খ) কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়নি। সম্ভবত নির্বাচন কমিশন ‘ইনক্লুসিভ’ নির্বাচনের স্বার্থে ২০২৫ সালের ভোটার দিবসের প্রতিপাদ্য ‘তোমার আমার বাংলাদেশে, ভোট দিব মিলেমিশে’ নীতিকে গুরুত্ব দিয়েছে। তবে ভবিষ্যতে দ্বৈত নাগরিকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা বা না-করা প্রশ্নে সংবিধানে কতিপয় সংশোধনী আনা যেতে পারে। যদি কোনোকালে সংবিধান অনুমোদন করে যে দ্বৈত নাগরিকত্ব জাতীয় সংসদের সদস্যপদে প্রার্থী হতে কোনো প্রতিবন্ধক নয়, তবে তা অবশ্যই হালাল হয়ে যাবে। বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণকারীকে সংসদ সদস্যরূপে দেখতে না চাইলে পঞ্চদশ সংশোধনীবলে অন্তর্ভুক্ত অনুচ্ছেদ ৬৬(২ক) বাতিল করতে হবে। দ্বৈত নাগরিকদের ভিনদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ অব্যাহত রাখতে চাইলে ‘প্রার্থিতা দাখিলের নির্দিষ্ট কোনো সময়ের আগে ভিনদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের সার্টিফিকেট থাকতে হবে’– এমন উপ-অনুচ্ছেদ জুড়তে হবে। আর এবারের নির্বাচনের মতো উদারতা প্রদর্শন করতে চাইলে জুড়তে হবে ‘বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন ও ফি জমা দেওয়ার প্রমাণ দেখাতে পারলে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা অর্জিত হবে’– এমন ধরনের উপ-অনুচ্ছেদ। মোদ্দাকথা, কারও ইচ্ছা-অনিচ্ছার বাতাবরণে নয়, স্পষ্টভাবে নির্ধারিত হোক দ্বৈত নাগরিকদের নির্বাচনে প্রার্থিতার বিষয়টি।

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: কলাম লেখক; অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব
 

আরও পড়ুন

×