ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রাজনীতি

রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে মতভিন্নতা মিটুক আলোচনায়

রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে মতভিন্নতা মিটুক আলোচনায়
×

হাসান মামুন

হাসান মামুন

প্রকাশ: ১৮ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৩০ | আপডেট: ১৮ মার্চ ২০২৬ | ২০:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রথম অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ বিষয়ে বিরোধীদলীয় নেতা যে বিধিতেই বক্তব্য রাখুন না কেন, সেটা প্রত্যাশিত ছিল। দিনটি ছিল ওই পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের শেষ দিন। এ বিষয়ে সংস্কার আলোচনায় বিএনপির পক্ষে নেতৃত্ব প্রদানকারী বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যা বললেন, সেটাও অপ্রত্যাশিত নয়। সংবিধানের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবর্তন তথা রাষ্ট্র সংস্কার ঘিরে কিছু মতপার্থক্য নিয়েই গণভোটে গিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তখনই বলাবলি হচ্ছিল, নির্বাচনের মাধ্যমে বিশেষত বিএনপি ক্ষমতায় এলে সংস্কারের প্রশ্নটি জটিলতায় পড়বে। কেননা, দলটির তরফ থেকে অন্তর্বর্তী সরকার অনুসৃত সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছিল। সময়মতো নির্বাচন নিশ্চিত করতে সেটা হয়তো তারা তীব্র করেননি। জয়ের ব্যাপারেও দলটি ছিল আশাবাদী। 

৫০ শতাংশ ভোট ও দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে সরকার গঠনের পর রাষ্ট্র সংস্কারে বিএনপির অবস্থান বিপরীতমুখী হয়ে পড়েছে– এমনটা বলার অবশ্য সুযোগ নেই। জামায়াত, এনসিপি যেভাবে সংস্কার চেয়েছে; মাঠে থাকা প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি কখনোই সেভাবে চায়নি; সেটাও ঠিক। রাষ্ট্র সংস্কারের যেসব বিষয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে, সেগুলো স্পষ্ট করেই বলা হচ্ছিল। তাদের সব অবস্থান এই লেখকেরও পছন্দ নয়। কিছু প্রশ্নে বিএনপির অনড় অবস্থানকে যৌক্তিকভাবে নাকচ করে দেওয়াও সম্ভব। কিন্তু বিপুলভাবে নির্বাচিত একটি দলকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সংস্কারে রাজি করানো কীভাবে সম্ভব– এর কোনো সদুত্তর নেই। অবশ্য জুলাই সনদে সই করিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং এর ভিত্তিতে একটি গণভোটও হয়েছে। সেই বাস্তবতা আবার বিএনপির পক্ষে উড়িয়ে দেওয়া সহজ নয়। এ কারণেই দলটির অবস্থান বোধহয়– রাষ্ট্র সংস্কারে নতুন করে সংলাপে যাওয়া। এটা সংসদে তো হতেই পারে। এমনকি ঈদের ছুটিতে সেটা শুরু হতে পারে সংসদের বাইরে। 

সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে সম্পর্কিত যে ৪৮টি প্রস্তাব গণভোটে তোলা হয়েছিল, তার মধ্যে ১৮টির বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো সংকট নেই। এসব ক্ষেত্রে বিজয়ী দল ইশতেহার অনুযায়ী এগোবে। এর বাইরে যে ৩০টি প্রস্তাব নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাস্তবায়ন করার কথা, সেটা নিয়েই তৈরি হয়েছে বিতর্ক। কেননা, বেশ কিছু প্রস্তাবে বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের ভিন্নমত রয়েছে। এটাকে গুরুত্ব না দিয়ে অবশ্য বলা হচ্ছিল, ৩০টি প্রস্তাবে সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা একমত। মোটাদাগে একমত হয়েও কোনো ইস্যুতে যে ভিন্নমত জানানো যায়; সেটা তো সংবিধান সংস্কারের মতো বিষয়ে উপেক্ষণীয় নয়। তারপরও বলতে হয়, এ সীমাবদ্ধতা নিয়েই সবাই গণভোটে গিয়েছিল। এক ধরনের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায় পড়ে বোধ হয় তারেক রহমানও একটি নির্বাচনী সমাবেশে বিএনপি সমর্থকদের ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এখান থেকে দলটির পক্ষে পুরোপুরি বেরিয়ে যাওয়াও সহজ নয়। 

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে, যখন এ সম্পর্কে কোনো অনুমানও করা যাচ্ছিল না, তখনই বিএনপি নিজে থেকে ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব উপস্থাপন করেছিল। এর একাংশ ছিল রাষ্ট্র সংস্কার সম্পর্কিত। অতঃপর গণঅভ্যুত্থানে দলটির কর্মী-সমর্থকদের বিপুল অংশগ্রহণ ও হতাহতের ঘটনাও অনস্বীকার্য। অন্তর্বর্তী সরকার আয়োজিত সংস্কার আলোচনায়ও তারা সোৎসাহে অংশ নিয়েছেন, যখন নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে আবার ছিল তীব্র অস্বস্তি। বিএনপি এটাও বলছিল, তাদের ৩১ দফার সঙ্গে সংস্কার আলোচনায় উত্থাপিত অনেক প্রস্তাবেরই মিল রয়েছে। খুঁজে দেখা যেতে পারে, সেসব প্রশ্নেও দলটি অবস্থান বদলে ফেলেছে কিনা। রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে পেয়ে অনেক সময়ই অবস্থান বদলে ফেলে সরকারি দল। তার জন্য দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেতে হয় না। অন্য দলের সমর্থনে এসেও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দৃষ্টান্ত রয়েছে। বর্তমানে ক্ষমতাসীনরা তেমন কিছু করে থাকলে সেটা অবশ্যই সমালোচনার যোগ্য। কিন্তু আগে থেকে জানানো আপত্তিতে অটল থাকলে তো কাউকে দায়ী করা যায় না। দেখতে হবে, ক্ষমতাসীন দলটি নতুন কোনো আপত্তি জানাচ্ছে কিনা। 

‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ অনুযায়ী নির্বাচনের ফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের কথা থাকলেও তা হয়নি বলে অনেকের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিকল্পের কথা নাকি আদেশে বলা হয়নি। এমন ‘আদেশ’ জারির বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আদালতে রিটও হয়েছে। এ অবস্থায় দীর্ঘ সংস্কার আলোচনার প্রতি সম্মান রেখে অনিষ্পন্ন প্রস্তাবগুলোর ওপর নতুন করে সংলাপ হতে পারবে না, তা নয়। সরকারি দল থেকে বলা হয়েছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়েও আলোচনা হতে পারে। তবে এমন পরিষদ গঠিত হলেই সংসদ বসার ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে উল্লিখিত ৩০টি মৌলিক সংস্কারের বাস্তবায়ন হয়ে যাবে– সে নিশ্চয়তাও নেই। ক্ষমতাসীন দল তার ভিন্নমত পাশে সরিয়ে জামায়াত-এনসিপির সঙ্গে দ্রুতই একমত হবে, এমনটা মনে করার কারণ নেই। সেটি ঘটার কিছুটা সম্ভাবনা হয়তো ছিল নির্বাচনের আগে। এখন পরিস্থিতি গুণগতভাবেই ভিন্ন। 

যেসব প্রশ্নে সব দল সম্পূর্ণ একমত, সেগুলোর বাস্তবায়নে অবশ্য দ্রুত এগোনো যেতে পারে। আর যেসব প্রশ্নে সামান্য মতপার্থক্য রয়ে গেছে, সেগুলো দূর করতে প্রয়োজন নতুন করে সংলাপের। উদাহরণস্বরূপ, সংসদের দ্বিতীয় কক্ষ গঠনে বিএনপিকে আপত্তি প্রত্যাহারের কথা বলা যেতে পারে। গভীর মতপার্থক্য নিয়েও আলোচনা সম্ভব; এমনকি হতে পারে বিতর্ক। যুক্তি দিয়ে বিএনপিকে চেপে ধরা যেতে পারে সংসদে। তবে মনে হয় না, এ নিয়ে রাজপথে যাওয়ার হুমকিতে ক্ষমতাসীন দল ভীত হবে। জনগণও এ প্রশ্নে এখনই আন্দোলন পছন্দ করবে না। ক্ষমতায় আসার পর ১৮০ দিনকে সরকারের ‘হানিমুন পিরিয়ড’ বলেও বিবেচনা করা হয়। এ সময়ে তারা কিছু ‘বেদনাদায়ক সংস্কার’ কাজে হাত দিলেও লোকে মেনে নেয়। জামায়াত-এনসিপিকে বুঝতে হবে, তাদের প্রভাব বলয়ে থাকা অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিয়েছে। নতুন সরকারের কাছ থেকে বাড়তি কিছু আদায় করতে হলে প্রয়োজনে সংসদে ‘বাহাস’ করে আগে নিজ দাবির যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাতেও সরকার রাজি না হলে তার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো যেতে পারে। এতে তার অজনপ্রিয় হওয়ার ঝুঁকি থাকলে সেটা সরকার বুঝবে। 

আওয়ামী লীগকে বাইরে রাখা হলেও দেশে-বিদেশে মোটাদাগে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রে উত্তরণ করা গেছে– এটা কম নয়। নতুন সংসদ বসেছে। এতে উপস্থিত শক্তিশালী বিরোধী দল সরকারকে চাপে রাখবে; সেটা সংসদের শক্তির দিকও বটে। তবে তাদের হঠকারিতা কাম্য নয়। রাষ্ট্রের খোলনলচে দ্রুত পাল্টে ফেলা যায় না– নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থানের পরও কিন্তু তারা এ সত্যের মুখোমুখি হয়েছেন। সিংহভাগ মানুষের মত উপেক্ষা করে চললে সুফল মেলে না– এরও প্রমাণ মিলেছে। তার অর্থ আবার এই নয়, সংস্কারের আবশ্যকতা নেই। মৌলিক সংস্কারও হতে হবে। অন্তর্বর্তী শাসনামলে যেসব সংস্কার গুরুত্ব পায়নি, সেগুলোও পর্যায়ক্রমে সামনে আনা প্রয়োজন। আর কোনো সংস্কারে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজনীয় হলে সংসদেই সেটা করা যাবে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত না হলে উল্লিখিত ৩০টি সংস্কারে এগোনো যাবে না– সেটা তো ঠিক নয়। ১৮০ কার্যদিবসের পরও এসব করার সুযোগ থাকবে।

হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন

×