ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

বাগাড়ম্বর নয়, শিক্ষায় উন্নয়নের রোডম্যাপ চাই

বাগাড়ম্বর নয়, শিক্ষায় উন্নয়নের রোডম্যাপ চাই
×

মাহবুবুর রাজ্জাক

মাহবুবুর রাজ্জাক

প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬ | ০৭:০৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

ছোটবেলায় একটি গল্প পড়েছিলাম। এক পথিক গ্রামের পথে হাঁটছে। সময়টা গ্রীষ্মকাল। প্রচণ্ড তাপদাহে মাঠ-ঘাট ফেটে চৌচির। এমন গরমে হেঁটে হেঁটে পথিক ক্লান্ত ও পিপাসার্ত হয়ে এক প্রকাণ্ড বট গাছের নিচে এসে বসল। বটের ছায়ায় ঠান্ডা বাতাসে তার ক্লান্তি কিছুটা লাঘব হলো। এমন সময় টুপ করে সামনে একটি বটের ফল এসে পড়ল। বটের ফল মানুষ খায় না। ক্ষুধার্ত পথিকের কাছে মনে হলো, এত বড় একটি গাছ, অথচ পুরোই অকেজো। বটের ছায়া যে তাকে গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপদাহ থেকে রক্ষা করে স্বস্তি এনে দিয়েছে, সেটি আর তার মনে থাকল না। মানুষের মন বলে কথা! 

এমনকি মাঝে মাঝে মনে হতে পারে, আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থাও অকেজো। বলা হয়ে থাকে, উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর আমাদের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক স্কেলে সপ্তম শ্রেণি পাস করার দক্ষতা অর্জন করে থাকে। আমাদের দেশে সামগ্রিকভাবেই শিক্ষার মান নিয়ে সংশয় আছে। তবে উচ্চশিক্ষার প্রতি বিদ্বেষ সম্প্রতি বেড়েছে বলে মনে হয়। কিছুদিন আগে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই সাংবাদিকদের সামনে দেশের প্রকৌশল শিক্ষার সেরা প্রতিষ্ঠান বুয়েটকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করে বসলেন। তাঁর কথায় মনে হয়েছে, বুয়েটের পেছনে টাকা খরচ করা মানেই অপচয়। বুয়েটের শিক্ষার্থীরা পাস করার পর বেশির ভাগই দেশ ছেড়ে যায়। অথচ তিনি চিন্তা করে দেখলেন না যে দেশের ভেতরে সব বুয়েট পাস করা প্রকৌশলীর জন্য প্রত্যাশিত চাকরি নেই। অধিকন্তু যারা আরও পড়াশোনা করতে চায়, তাদের জন্য দেশে তেমন ভালো সুযোগও নেই।

বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এই জাতীয় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের জন্য অনেকটা বটের ছায়ার মতো; দুর্জনেরা যতই নিন্দা করুক, সাধ্যমতো দায়িত্ব পালন করে গিয়েছে। জাতি যখনই ইতিহাসের ক্রান্তিলগ্নে এসে দাঁড়িয়েছে, তখনই পথের দিশা দেখিয়েছে। অনেকেই তা মনে রাখেন না। আজকাল দায়িত্বশীল কারও কারও কথা শুনে মনে হয়, দেশে উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন নেই। পড়াশোনা শেষে দেশ ছেড়েই যদি যাবে, তবে তাদের পেছনে রাষ্ট্র পয়সা ঢালবে কেন? একথা সত্য, আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষিত এবং চৌকস জনশক্তির একটি বড় অংশই দেশের বাইরে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। তারা শিল্পোন্নত দেশগুলোতে পড়াশোনা ও কাজের মাধ্যমে আরও দক্ষ হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলেছে। 

অনেক ক্ষেত্রেই এই দক্ষতা দেশের মাটিতে কাজে লাগানোর সুযোগই তৈরি হয়নি। একজন দক্ষ পেশাজীবীকে যদি কাজে লাগানো না যায়, তবে তার ফেরায় দেশের কি কোনো লাভ আছে? এই যে না ফিরে আসা, এর দায় এককভাবে দেশান্তরী জনশক্তির ওপর চাপিয়ে দিলে অন্যায় করা হবে। দেশের ভেতরে কেন তাদের জন্য উপযুক্ত কর্মপরিবেশ তৈরি করা যাচ্ছে না, সেই প্রশ্নটিও মাথায় রাখতে হবে। কোরিয়া, তাইওয়ান, চীন আর ভারতের মতো দেশগুলো যদি তাদের ডায়াস্পোরা তথা প্রবাসী জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে শিল্প-বাণিজ্যে বিপ্লব ঘটাতে পারে, আমরা কেন আমাদের ডায়াস্পোরা জনশক্তিকে কাজে লাগানোর কথা ভাবব না? 

আমাদের বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। এ রেমিট্যান্সও আমাদের জন্য বটের ছায়ার মতো। অথচ যারা চাকরির প্রয়োজনে অথবা উন্নত জীবনের সন্ধানে দেশ ছেড়ে গিয়েছেন, অনেকেই তাদের তাচ্ছিল্য করে থাকেন। এমনকি কখনও কখনও তাদের দেশপ্রেম নিয়েও সন্দেহ ছড়ানো হয়। তবে আমাদের ডায়াস্পোরা জনশক্তিকে দেশের প্রয়োজনে ডাকলে তারা যে সাড়া দেয়, সেই উদাহরণ আমরা ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেখেছি। দেশের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আমাদের ডায়াস্পোরা বিশেষজ্ঞরা পথ দেখাচ্ছেন। 
এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার উচ্চপ্রযুক্তির কর্মক্ষেত্রে যেখানে সম্ভব সেখানে বিদেশি বিশেষজ্ঞের তুলনায় আমাদের ডায়াস্পোরা বিশেষজ্ঞদের সহায়তা গ্রহণের নীতিকে অগ্রাধিকার দিলে দেশের শিল্প ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটতে বাধ্য। তেমনিভাবে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লব্ধপ্রতিষ্ঠ ও বিশ্বখ্যাত বিশেষজ্ঞদের সংযুক্ত করার ব্যবস্থা হলে অনেক ডায়াস্পোরা বাংলাদেশি দেশের উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ অবদান রাখার সুযোগ পাবেন। এর ফলে আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষার মানের দৈন্য কিছুটা হলেও ঘুচবে।

বিগত নির্বাচনের সময় প্রকাশিত ইশতেহারে প্রায় সব দলই শিক্ষা খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছে। সেই অঙ্গীকার আংশিক পূরণ হলেও শিক্ষা ক্ষেত্রে দৃশ্যমান উন্নতি করা সম্ভব। এই উন্নয়ন সুষম হলে তা হবে দেশের জন্য সবচেয়ে বেশি কল্যাণকর। উচ্চশিক্ষায় পরিকল্পিতভাবে অর্থায়নের সঙ্গে সঙ্গে কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষাকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মূল ধারায় পরিণত করতে হবে। কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়লে দক্ষ জনবল তৈরির সঙ্গে সঙ্গে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ কাজের তাগিদে দেশের বাইরে গেলেও অর্থ উপার্জনের সঙ্গে সঙ্গে উন্নত নতুন নতুন প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে সক্ষম হবে। তারা পুঁজি ও প্রযুক্তি নিয়ে দেশে ফিরে এলে নতুনদের জন্য কাজের সুযোগ আরও প্রসারিত হবে।
কাজেই সরকারের দায়িত্বশীলদের কাছ থেকে শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য নয়, বাগাড়ম্বর নয়, দুর্বলতা নিরসনের কার্যকর উদ্যোগ চাই। আগামী বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ বেড়েছে এমনটি দেখতে চাই। সেই বরাদ্দের টাকা খরচ করে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে একটি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, সেই রোডম্যাপ চাই।  

ড. মাহবুবুর রাজ্জাক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট।

আরও পড়ুন

×