ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আয়োজন

‘সেই রাতের কথা বলতে এসেছি’ প্রামাণ্যচিত্রের রজত জয়ন্তী 

‘সেই রাতের কথা বলতে এসেছি’ প্রামাণ্যচিত্রের রজত জয়ন্তী 
×

‘সেই রাতের কথা বলতে এসেছি’ প্রামাণ্যচিত্রের পোস্টার

প্রমিতি প্রভা চৌধুরী 

প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬ | ১৯:৫০

২০০১ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘সেই রাতের কথা বলতে এসেছি’ ২৫ বছর পূর্ণ করেছে ২৫ মার্চ। এই চলচ্চিত্র দেশের গণমাধ্যম, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এখনো প্রাসঙ্গিক এবং আলোচিত। একটি চলচ্চিত্রের জন্য বিষয়টি গর্বের, স্বস্তির। এই চলচ্চিত্রের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ৩১ মার্চ মঙ্গলবার ঢাকার ধানমণ্ডিতে বেঙ্গল ফাউণ্ডেশন মিলনায়তনে একটি অনুষ্ঠান হতে যাচ্ছে। 
বস্তুত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ২৫ মার্চ ১৯৭১, অর্থাৎ অপারেশান সার্চলাইট শুধু একটি সামরিক অভিযান নয়; এটি ছিল পরিকল্পিত গণহত্যার সূচনা। সেই রাতের নির্মমতা, প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতি এবং প্রমাণভিত্তিক পুনর্গঠনকে চলচ্চিত্রভাষায় ধারণ করার এক অনন্য প্রয়াস- আমার বাবা কাওসার চৌধুরীর প্রামাণ্যচিত্র ‘সেই রাতের কথা বলতে এসেছি’। চলচ্চিত্র অধ্যয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি কেবল একটি ডকুমেন্টারি নয়; বরং স্মৃতি, সাক্ষ্য, পুনর্নির্মাণ ও আর্কাইভাল উপাদানের এক সাহসী সংমিশ্রণ—যা সময়ের তুলনায় অনেক এগিয়ে ছিল।

এই প্রামাণ্যচিত্রের অন্যতম শক্তি এর পুনর্নির্মাণ কৌশল। ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞের বিভিন্ন দৃশ্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহায়তায় পুনর্নির্মাণ করা হয়—যা সেই সময়ের প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে বিরল ছিল। চলচ্চিত্রের ভাষায় এটি একটি সচেতন ন্যারেটিভ কৌশল: সাক্ষাৎকারভিত্তিক স্মৃতিকে দৃশ্যমান করে তোলা। নির্মাতা পুনর্নির্মিত দৃশ্যগুলোর জন্য ব্যবহার করেছেন ‘সেপিয়া টোন’ (চলচ্চিত্রে সেপিয়া টোন হলো একধরনের একরঙা বা মনোক্রোমেটিক বাদামি আভাযুক্ত ভিজ্যুয়াল প্রভাব, যা সাধারণত নস্টালজিয়া, অতীতের অনুভূতি, বা একটি উষ্ণ পরিবেশ তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়)। যার ফলে দর্শক সহজেই বুঝতে পারেন কোনটি সাক্ষাৎকার, আর কোনটি অতীতের পুনর্নির্মিত স্মৃতি। 

এই ভিজ্যুয়াল ডিস্টিংশন কেবল নান্দনিকই নয়; এটি তথ্যকে গ্রহণযোগ্য ও বোধগম্য করার একটি কার্যকর মাধ্যমও বটে। ফলে সাক্ষাৎকারের বয়ানগুলো নিছক কথোপকথন হয়ে থাকে না—বরং দৃশ্যমান ইতিহাসে রূপ নেয়।
চলচ্চিত্রটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের পিয়ন মোহাম্মদ সাজউদ্দিন শেখ সেই রাতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন—যা গণহত্যার প্রত্যক্ষ দলিল। একইভাবে জগন্নাথ হলের ছাত্র হরিধন দাস বর্ণনা করেছেন কীভাবে তিনি অল্পের জন্য মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যান। তাদের কণ্ঠস্বর কেবল ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়; বরং পাকিস্তান রাষ্ট্রের সহিংসতার এক ঐতিহাসিক দলিল।
প্রামাণ্যচিত্রটির অন্যতম লোমহর্ষক অংশ হলো পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ওয়্যারলেস বার্তার রেকর্ডিং। প্রকৌশলী এম এম হুসাইন শর্টওয়েভ রেডিওর মাধ্যমে সেসব বার্তা ধারণ করেছিলেন, যেখানে হত্যার নির্দেশ ও সামরিক যোগাযোগের ভয়াবহ প্রমাণ পাওয়া যায়। এই অডিও উপাদানগুলো শুধু নাটকীয়তাই সৃষ্টি করে না; বরং এগুলো গবেষণা ও ইতিহাসচর্চার জন্য অত্যন্ত মূল্যবান আর্কাইভাল উপাদান।
চলচ্চিত্রে রয়েছে শহীদদের পরিবারের আর্তি ও ন্যায়বিচারের দাবি। শহীদ শিক্ষক ড. মনিরুজ্জামানের ছেলে আবু মুসা মোহাম্মদ মাসুদুজ্জামান এবং শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার মেয়ে মেঘনা গুহঠাকুরতা- তাদের কণ্ঠে উঠে আসে বিচারহীনতার দীর্ঘ বেদনা। ড. মনিরুজ্জামানের স্ত্রী সৈয়দা মাহমুদাজ্জামান বর্ণনা করেছেন কীভাবে ড. মনিরুজ্জামানকে পাকিস্তানি সেনারা বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়; এই ঘটনাটিও চলচ্চিত্রে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। ব্যক্তিগত শোক এখানে জাতীয় ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে। 
আরো প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী, যিনি সেই সময়ের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ফলে চলচ্চিত্রটি কেবল আবেগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; বরং বিশ্লেষণাত্মক ও তথ্যভিত্তিক একটি কাঠামো তৈরি করে।

পরে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয় ২০১০ সালে। এই ট্রাইব্যুনাল ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীদের সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু করে। সেই বিচারের রায়ে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা মতিউর রাহমান নিজামি, আলি আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, আব্দুল কাদের মোল্লাসহ কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং তা কার্যকর হয়।

কিন্তু ইতিহাসের এই নির্মম সত্যের মাঝেও আজকের বাস্তবতা অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলে। স্বাধীনতার চুয়ান্ন বছর পরে, যখন দেশের সংসদে যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের নাম শোকপ্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব ওঠে, তখন সেই দৃশ্য যেন এই প্রামাণ্যচিত্রের সাক্ষ্যগুলোকেই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয় কেন স্মৃতি, প্রমাণ ও ইতিহাস সংরক্ষণ জরুরি।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে ‘সেই রাতের কথা বলতে এসেছি’ কেবল একটি চলচ্চিত্রই নয়; এটি ইনফোটেইনমেন্টের মাধ্যমে ইতিহাস চর্চার এক আদর্শ উদাহরণ- যেখানে তথ্য, ইতিহাস, নাট্যরূপ ও মানবিক বয়ান একত্রে কাজ করে। সাক্ষাৎকারের সঙ্গে সেপিয়া টোনে পুনর্নির্মিত দৃশ্যের সংযোজন দর্শকের জন্য ঘটনাগুলোকে আরও স্পষ্ট ও অনুভবযোগ্য করে তোলে। শুধুমাত্র সাক্ষাৎকারভিত্তিক নির্মাণ হলে যে আবেগ ও তীব্রতা তৈরি হতো না, সেই ঘাটতি পূরণ করেছে এই চলচ্চিত্রভাষা।
চলচ্চিত্র অধ্যয়নের ভাষায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ– যেখানে ডকুমেন্টারি, আর্কাইভ ও ড্রামাটাইজড রিকনস্ট্রাকশন একসঙ্গে ব্যবহার করে ইতিহাসকে জীবন্ত করে তোলা হয়েছে। সময়ের তুলনায় অনেক এগিয়ে থাকা এই নির্মাণ আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়— স্মৃতি শুধু অতীত নয়; এটি ন্যায়বিচারের দাবিও বহন করে।

প্রমিতি প্রভা চৌধুরী: গণমাধ্যমে কর্মরত এবং প্রামাণ্যচিত্রটির নির্মাতা কাওসার চৌধুরীর কন্যা
 

আরও পড়ুন

×