ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নির্বাচন

এক জায়গায় বসবাস, আরেক জায়গায় ভোট কেন

এক জায়গায় বসবাস, আরেক জায়গায় ভোট কেন
×

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৪০

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে যেকাল থেকে নির্বাচন শুরু হয়েছে, সেই গোড়া থেকেই নিয়ম ছিল জাতীয় নির্বাচনের আগে আগে ভোটার তালিকা তৈরি। এর অন্যতম শর্ত থাকত– ভোটার তালিকা প্রণয়নের সময় সেই এলাকায় অন্তত ছয় মাস ধরে বসবাস। সেই বসবাস স্থায়ী আবাস হতে পারত। হতে পারত ভাড়ার বাসা কিংবা হল, হোস্টেল বা মেসবাড়ি। হতে পারত সরকারি আবাসন। মোটকথা, সেখানে বসবাস করছেন এবং সামনে বেশ কিছুদিন সেই বসবাস অব্যাহত থাকবে। ফলে একজন নাগরিক তাঁর বসবাসের স্থানের ভোটার হতেন। তাঁর ভাবনায় থাকত বসবাসের স্থানের নেতা নির্বাচনের। সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনায় যে নেতা তাঁর পাশে থাকবেন। কেউ হয়তো আগ্রহী হতে পারেন তাঁর স্থায়ী ঠিকানায় ভোটার হতে।

জাতীয় পরিচয়পত্র হওয়ার পর পরিস্থিতি গেল বদলে। এখন প্রতিবছর ২ জানুয়ারি থেকে মাসব্যাপী নতুন ভোটার করা হয়; বাদ দেওয়া হয় মৃত ভোটার। হিসাব পরিষ্কার। কোনো সমস্যা নেই। মৃত ভোটার বাদ যাচ্ছেন; যাদের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হয়েছে, তারা ভোটার হয়ে যাচ্ছেন। নির্বাচনের পর নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়ে ভোটার স্থানান্তরের আবেদন নিয়ে তা নিষ্পত্তি করে। আর কী চাই! এর থেকে ভালো আর কী হতে পারে? কিন্তু শুভঙ্কর দূরে বসে হাসে। তার ফাঁকির শিকার যারা হন তারা অশ্রুপাত করেন।

ছবিযুক্ত ভোটার আইডি কার্ড মতান্তরে জাতীয় পরিচয়পত্র চালুর পর প্রথম ভোটে কোনো সংকট হওয়ার কথা না। কেননা, ভোটার তালিকা হওয়ার পরপরই নির্বাচন হয়েছিল। তারপরের তিন নির্বাচনে মানুষের আগ্রহ ছিল না। তাই কোথায় ভোটার, কোথায় ভোট– তা কাউকে ভাবায়নি। কিন্তু এবারের ত্রয়োদশ নির্বাচনে হাসিমুখে খাস নিয়তে ভোটার গেছেন ভোটকেন্দ্রে। ভোটার যাতে ভোট দিতে নির্বাচনী এলাকায় যেতে পারেন, সে কারণে ভোটের আগে দুদিন ছুটিও হলো। ভোটের পরের দুদিন সাপ্তাহিক ছুটি। দল বেঁধে ভোটার ছুটলেন বসবাসের এলাকা থেকে গ্রামের বাড়ি। কেউবা পাঁচ দিনের ছুটি কাটাতে কক্সবাজার। একজন প্রথিতযশা সাংবাদিক, সচেতন ভোটার এক যুগের বেশি সময় ধরে বাস করেন মোহাম্মদপুরে। অথচ ভোট দিতে ছোটেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি স্কুলে। কবে সেই ১৯ বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ছবিযুক্ত ভোটার আইডি কার্ডে নাম লিপিবদ্ধ হয়েছিল, তাই এখনও ভোটার জসীম উদ্‌দীন হলের বিপরীতে। এমন অনেকেই। 

নির্বাচন কমিশনের এ ক্ষেত্রে নীতিটি দুমুখো। আসন যখন পুনর্বিন্যাস করে, তখন ভিত্তি হচ্ছে আদমশুমারি। ২০০১-এর আদমশুমারিকে আমলে নিয়ে ২০০৮-এর নির্বাচনে ঢাকা মহানগরীতে বদলে গেল জাতীয় সংসদের আসন মানচিত্র। ১৩ আসনের ঢাকা জেলা হয়ে গেল ২০ আসনের জেলা। চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও গাজীপুরে একটা করে আসন বাড়ল। নেত্রকোনা সাড়ে চারটা আসন হতে বেড়ে পূর্ণ পাঁচ হলো। এই ১১টি আসন বৃদ্ধির খেসারত দিল বিভিন্ন জেলা। তারা হারাল আসন; কমে গেল সংসদে তাদের প্রতিনিধির সংখ্যা। দৃশ্যত ঢাকায় জনসংখ্যা বিবেচনায় আসন বাড়ানো হলেও সদ্য সমাপ্ত ভোটের সময় দেখা গেল, দল বেঁধে ভোটার ছুটছেন গ্রামে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে বা পুরাতন আবাসস্থলে, যেখানে তিনি ভোটার। ঢাকায় অধিবাসীর তুলনায় ভোটার কম; আবার কেন্দ্রপ্রতি ভোটারসংখ্যার তুলনায় উপস্থিতি কম। এর প্রধান কারণ ২০০৯ সালের ভোটার তালিকা প্রণয়ন আইনের ফাঁকি। সেই আইনের ১০(গ) ধারায় চমৎকারভাবে বর্ণিত আছে– ‘যিনি বাসস্থান পরিবর্তনের কারণে নূতন ভোটার এলাকা বা, ক্ষেত্রমত, নির্বাচনী এলাকার অধিবাসী হইয়াছেন, পূর্বের ভোটার এলাকার বা, ক্ষেত্রমত, নির্বাচনীর এলাকা তালিকা হইতে তাহার নাম কর্তনপূর্বক নূতন নির্বাচনী এলাকায় বা, ক্ষেত্রমত, ভোটার এলাকার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা।’ কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভব না। 

বাস্তবতা হচ্ছে, একজন ভোটারের তাঁর ভোট এলাকা বদলাতে হলে জাতীয় পরিচয়পত্রের বর্তমান ঠিকানা বদলাতে হবে। আর বদলাতে হলেই দিতে হবে নির্ধারিত ফি। ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তকারী কাগজে-কলমে আইনের ১০(গ) ধারা অনুযায়ী ভোটার স্থানান্তরের আশ্বাস দিলেও ফির মায়াজালে পড়ে সে ঠিকানা সহজে বদল হয় না। বদল হয় না বলেই ২০০৮ থেকে এ যাবৎ বিপুলসংখ্যক ভোটার হয়েছেন, যাদের বসবাস এক ঠাঁই হলেও ভোটকেন্দ্র অন্যত্র। সে কারণেই এবার ভোটের আগে দুদিন নির্বাহী আদেশে ছুটি দিতে হয়েছে ভোটারদের স্থানান্তরের সুবিধায়। অথচ আমরা বাতেলা করি, বিলাত-আমেরিকায় ভোটের দিনও ছুটি থাকে না। মানুষ কাজে যাতায়াতের পথে ভোট দিয়ে দেয়। এই শুভঙ্করের ফাঁকির বিধান আইনেই রাখা হয়েছে। এই ফাঁকি বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে নির্বাচন প্রহসনের শামিল হয়ে উঠতে পারে। নির্বাচনী এলাকার সঙ্গে ভোটারের সংশ্লিষ্টতা হ্রাস পাবে। ফলে ভোটার আগ্রহ হারাবে ভোট দিতে। সমাধান খুব সহজ– জাতীয় নির্বাচনের আগে বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা করতে হবে। কম্পিউটার ডেটাবেজে সংরক্ষিত বিদ্যমান সকল ভোটার তালিকাকে চিরন্তনী ধরে নেওয়ার প্রবণতা থেকে সরে আসতে হবে। একজন নাগরিক ভোটার হবেন সেখানেই, যেখানে তিনি বসবাস করছেন। জানুয়ারির ২ তারিখ থেকে ভোটার তালিকা প্রণয়নের মাসে নির্বাচন কমিশন নিজ দায়িত্বে বিনা ফি-তে ভোটারের ঠিকানা পরিবর্তন করে দেবে। নইলে বিকল্প সমাধান– নির্বাচন কমিশন জাতীয় পরিচয়পত্রের দায়িত্বে থাকবে না। অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ সামলাবে জাতীয় পরিচয়পত্র। নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা প্রণয়ন করবে এবং তাতে জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বরকে তালিকাভুক্ত করবে। সে ক্ষেত্রে ভোটারকে জাতীয় পরিচয়পত্রের কোনো তথ্য পরিবর্তনের তকলিফ পোহাতে হলো না। জাতীয় পরিচয়পত্রে হাল ঠিকানা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল লেখা থাকলেও ভোটারের কোনো বাধা হবে না খুলনার মহসিন কলেজ ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে। আগামীর ভোট হোক ভোটারের বসবাসের এলাকায় ভোট দেওয়ার স্বাধীনতা।

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: কলাম লেখক, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব
 

আরও পড়ুন

×