ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

উন্নয়ন

কৃষকের জন্য স্মার্টকার্ড কতটা কাজে দেবে

কৃষকের জন্য স্মার্টকার্ড কতটা কাজে দেবে
×

সুস্মিতা দাস

সুস্মিতা দাস

প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

সরকার মঙ্গলবার পহেলা বৈশাখে কৃষক কার্ড উদ্বোধন করতে যাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃষিসেবা সহজতর করার জন্য কৃষক কার্ড চালু করা হয়েছে। সব দেশের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, ডিজিটাল কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের ডিজিটাল কৃষিসেবা যেমন– কৃষি ভর্তুকি, প্রযুক্তিগত পরামর্শ, আর্থিক সেবা ও বাজার সুবিধা ইত্যাদি সহজতর হয়েছে। উল্লেখ্য কেনিয়া, নাইজেরিয়া, ব্রাজিল, থাইল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃষকদের জন্য ডিজিটাল পরিচয়পত্র, মোবাইল ব্যাংকিং, ভর্তুকি প্রদান ও প্রশিক্ষণ সেবা চলমান রয়েছে। এসব দেশে কৃষি উপকরণ সরবরাহ, কৃষিঋণ, টেকসই চাষাবাদের প্রযুক্তি সম্প্রসারণসহ সার্বিক কৃষি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করতে কৃষক কার্ড ব্যবহার করছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশ সরকারও আধুনিক মানের কৃষক কার্ড ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষকদের কৃষিবিষয়ক সব তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণসহ প্রয়োজনীয় ডিজিটাল কৃষিসেবা দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। কৃষক কার্ড শুধু একটি কার্ড নয়, এটি হবে বাংলাদেশের প্রতিটি কৃষকের ন্যায্য অধিকারসহ মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রতীক, যেখানে কৃষক থাকবেন সবচেয়ে অগ্রাধিকার ও সম্মানের আসনে। 

স্মার্ট কৃষক কার্ড হলো এমন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা, যেখানে একজন কৃষকের সমস্ত তথ্য তার জমির পরিমাণ, মাটির ধরন, উৎপাদিত ফসল এবং আর্থিক লেনদেনের ইতিহাস একটি ডিজিটাল চিপে সংরক্ষিত থাকবে। এটি এমন এক ব্যবস্থার সূচনা করবে, যেখানে কৃষক আর সরকারের মাঝখানে কোনো দেয়াল থাকবে না। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, প্রাথমিক পর্যায়ে এক কোটি ৬৫ লাখ কৃষককে এ কার্ডের আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ কার্ডের মাধ্যমে কৃষি খাতের ডেটাবেজ এমনভাবে সাজানো হচ্ছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় উদাহরণ হয়ে থাকবে। কৃষকদের কাঠামোগত বঞ্চনা দূর করতে সরকার আগামী চার বছরে এক কোটি ৬৫ লাখ কৃষকের মাঝে এ কার্ড বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ কার্ডের মাধ্যমে মৎস্য চাষি ও দুগ্ধখামারিরাও বিশেষ সুবিধা পাবেন।

কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষিসংশ্লিষ্ট সব সেবা স্বচ্ছতার সঙ্গে দ্রুততম সময়ে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। এর মধ্যে রয়েছে ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ বিতরণ, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা, স্বল্পমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি প্রাপ্তির সুবিধা, ন্যায্যমূল্যে সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, কৃষি বীমা সুবিধা, বাজার তথ্য সরবরাহ, পণ্য সংরক্ষণ ও ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রয়ের সুবিধা, কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আবহাওয়া ও ফসলের রোগবালাই দমনের পরামর্শ প্রদান। তা ছাড়া, এ কার্ডের মাধ্যমে মোবাইলে আবহাওয়া ও বাজার তথ্য এবং ফসলের চিকিৎসা সুবিধা পাওয়া যাবে। এটি মূলত কৃষকের একটি ডিজিটাল প্রোফাইল, যা তার সক্ষমতা ও প্রয়োজনকে রাষ্ট্রের কাছে দৃশ্যমান করবে।

সরকার এ প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষি ব্যবস্থায় যে পরিবর্তন আনতে চায়, তার মূল ভিত্তি হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। এর অন্যতম লক্ষ্য হলো প্রকৃত কৃষক চিহ্নিতকরণ। অনেক সময় সরকারি সুযোগ-সুবিধা অকৃষকদের হাতে চলে যায়। এ কার্ডের মাধ্যমে প্রকৃত চাষীকে শনাক্ত করা হবে; যারা সরাসরি মাটির সঙ্গে যুক্ত, কেবল তারাই রাষ্ট্রের বিশেষ সহায়তা পাবেন। আরেকটি যুগান্তকারী পরিবর্তন হলো সরাসরি ভর্তুকি প্রদান বা জিটুপি পদ্ধতি। সার, বীজ বা নগদ প্রণোদনার টাকা এখন থেকে আর কোনো দপ্তরের টেবিলে আটকা পড়বে না। সরাসরি কৃষকের নিবন্ধিত ব্যাংক বা মোবাইল অ্যাকাউন্টে জমা হবে। এর ফলে মধ্যস্বত্বভোগী নির্মূল হবে এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে।

এত বিশাল এক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ মাথায় রাখতে হবে। আমাদের অনেক কৃষক এখনও প্রযুক্তি ব্যবহারে পুরোপুরি অভ্যস্ত নন। গ্রামীণ এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট এবং স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা একটি বড় বিষয়। তবে সরকার প্রতিটি ইউনিয়নে ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে কৃষকদের প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে এই কার্ড ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেবেন। 

স্মার্ট কৃষক কার্ড কেবল কৃষি খাতের উন্নয়ন নয়, বরং এটি গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনের একটি প্রধান হাতিয়ার হবে। যখন একজন কৃষক জানবেন যে রাষ্ট্র তাঁকে চেনে এবং সরাসরি তাঁকে সহায়তা দিচ্ছে, তখন তাঁর আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাবে। এর ফলে কৃষিকাজ কেবল পেশা হিসেবে নয়, বরং একটি সম্মানজনক ব্যবসায় পরিণত হবে। শিক্ষিত তরুণরা কৃষিতে আগ্রহী হবে, যা কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে বিশাল ভূমিকা রাখবে। যখন একজন কৃষক তাঁর পকেটে একটি স্মার্টকার্ড নিয়ে বাজারে যাবেন, তখন তিনি কেবল একজন উৎপাদক নন, বরং একজন আধুনিক ডিজিটাল নাগরিক হিসেবে নিজের অধিকার প্রয়োগ করবেন।

ড. সুস্মিতা দাস: পরিচালক, কৃষি তথ্য কেন্দ্র (এআইসি), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি)
 

আরও পড়ুন

×