অর্থনীতি
কর বাড়ানো নয়, ন্যায্যতা নিশ্চিত হোক
মামুন রশীদ
মামুন রশীদ
প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০০ | আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০১
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশে কর নিয়ে আলোচনা নতুন কিছু নয়, বরং আরও বেশি হওয়া উচিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে করের পরিধি বাড়ানোর সম্ভাবনা ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা আমাদের রাজস্ব ব্যবস্থার একটি গভীর ও অস্বস্তিকর বাস্তবতা আবার সামনে নিয়ে এসেছে। প্রশ্নটা খুব সরল– রাষ্ট্র কি অতিরিক্ত কর তুলবে, নাকি ন্যায্যভাবে কর তুলবে?
নতুন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর কিছু বক্তব্য গণমাধ্যমে এমনভাবে এসেছে, যেন সামনে বড় ধরনের কর বৃদ্ধি অপেক্ষা করছে। আমার মনে হয়, বিষয়টা কিছু ভুল ব্যাখ্যার ফল। বাস্তবতা হলো, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর আরও চাপ বাড়ানোর মতো অবকাশ খুবই সীমিত।
বাংলাদেশের যে ক্ষুদ্র একটি অংশ নিয়মিত কর দেয়– মূলত বেতনভুক্ত পেশাজীবী, স্বচ্ছ ব্যবসায়ী এবং করপোরেট কাঠামোর মধ্যে থাকা কিছু ব্যক্তি, তারা ইতোমধ্যে চাপে আছেন। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তিগত ব্যয়ের চাপ– সব মিলিয়ে তাদের সঞ্চয় কমছে, ভোগ কমছে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
অভিজ্ঞতা থেকেই বলি। গত নভেম্বর মাসে যথারীতি মাসের শুরুতেই কর রিটার্ন দাখিল করেছি। ফলাফল, আট অঙ্কের কর প্রদান, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সম্পদ কর বা ওয়েলথ সারচার্জ। এর বাইরে প্রতিদিনের ভোগব্যয়ের জীবনে আমরা যে ভ্যাট দিচ্ছি, ৫ থেকে ১৫ শতাংশ, তা হিসাব করলে একজন সৎ করদাতার জাতীয় রাজস্ব আয়ে মোট অবদান যে কত বড়, তা আলাদা করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। আপনি যখন দেখবেন, আপনার আশপাশেই এমন অনেকে আছেন, যাদের জীবনযাত্রা আপনার চেয়ে কোনো অংশে নিম্নের নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে বেশি বিলাসী কিন্তু কর দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা প্রায় অদৃশ্য, তখন প্রশ্ন জাগে। তখনই সেই কথাটা সামনে আসে: এই দেশে কর দেন মূলত পেশাজীবীরাই, তাও ‘পেট কেটে’।
এই ‘পেট কেটে’ কথাটার মধ্যে গভীর বাস্তবতা আছে। একজন বেতনভুক্ত বা স্বচ্ছ আয়কারী মানুষের জন্য কর দেওয়া কোনো বিমূর্ত বিষয় নয়। এটি সরাসরি তাঁর পরিবারের বাজেটে আঘাত করে। এখানে কোনো কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নেই; কোনো হিসাবের কৌশল নেই; কোনো বিদেশি নিরাপদ আশ্রয় নেই। করটা সরাসরি তাঁর আয়ের ভেতর থেকেই কেটে নেওয়া হয়।
আয় দিয়ে সে সন্তানের পড়াশোনা, পরিবারের চিকিৎসা, ভবিষ্যতের সঞ্চয় সবকিছু চালায়।
অন্যদিকে দেশের বিশাল একটি সম্পদ ভান্ডার কার্যত করের বাইরে রয়ে গেছে। এ বৈষম্যই আমাদের রাজস্ব ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
এ বাস্তবতার মধ্যেই সরকার উচ্চ আয়ের মানুষের ওপর করহার বাড়ানোর কথা ভাবছে– ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব এসেছে। নীতিগতভাবে এটি ভুল নয়। বরং এটি প্রয়োজনীয় স্বীকৃতি– যাদের সক্ষমতা বেশি, তাদের অবদানও বেশি হওয়া উচিত।

তবে এখানেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আসে– আমরা কাকে ‘ধনী’ বলছি? এক কোটি টাকা আয় আজকের বাস্তবতায় নিশ্চয় বড় অঙ্ক। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত এ সময়ে সম্পদের প্রকৃতি বদলে গেছে। অনেক সম্পদ এখন দৃশ্যমান নয়। অনেক আয় দেশের বাইরে সরে যায়; অনেক লেনদেন ডিজিটাল বা অনানুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে থাকে। ফলে কর ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও তথ্যনির্ভর হতে হবে।
বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের একটু বেশি, যা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম নিম্ন এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর তুলনায়ও পিছিয়ে। এ বাস্তবতায় শুধু করহার বাড়ানো কোনো সমাধান নয়। বরং কর সংগ্রহের দক্ষতা বাড়ানো, করের আওতা বিস্তৃত করা– এগুলোই হওয়া উচিত মূল অগ্রাধিকার।
নির্মম সত্য হলো, আজকের কর ব্যবস্থা মূলত সেসব মানুষের ওপর নির্ভরশীল, যাদের কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নেই। উৎসে কর কেটে নেওয়া হয়। ফলে তারা চাইলেও দেরি করতে পারেন না। অন্যদিকে প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বিভিন্ন ফাঁকফোকর ব্যবহার করেন বা রাজনৈতিক সংযোগের মাধ্যমে করের দায় এড়িয়ে যান। এই দ্বৈত বাস্তবতায় দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এখানেই আসে প্রয়োগ বা এনফোর্সমেন্টের প্রশ্ন। করহার বাড়ানো সহজ, কিন্তু তা কার্যকর করা কঠিন। আয় শনাক্তকরণ, সম্পদের সঠিক মূল্যায়ন, তথ্য বিনিময়, ডিজিটাল ট্র্যাকিং– এসব ছাড়া উচ্চ করহার কেবল কাগজ-কলমে থেকে যাবে।
একই সঙ্গে জবাবদিহিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন নাগরিক তখনই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর দিতে আগ্রহী হন, যখন তিনি দেখতে পান তাঁর দেওয়া অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে। রাস্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গণপরিবহন– এসব খাতে দৃশ্যমান উন্নয়ন না হলে করের প্রতি অনীহা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
ডিজিটালাইজেশন এখানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কর ব্যবস্থাকে যত বেশি স্বয়ংক্রিয় ও স্বচ্ছ করা যাবে, তত কমবে হয়রানি ও দুর্নীতি। ব্যক্তি অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্ত কমলে করদাতার আস্থাও বাড়বে।
সবশেষে, কর সংস্কারের মূল দর্শনটি স্পষ্ট হওয়া দরকার। এটি কোনোভাবেই বিদ্যমান করদাতাদের ওপর আরও চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হতে পারে না। বরং এটি হতে হবে একটি ন্যায্যতার প্রক্রিয়া, যেখানে করের আওতা ওপরের দিকে বিস্তৃত হবে এবং দীর্ঘদিন ধরে যারা নজরদারির বাইরে থেকেছেন, তাদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশে আয়কর দেওয়ার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বড় একটি অংশ কর জালের বাইরে থাকা অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৪ সালের শুরুতে অর্থনীতি সমিতির এক হিসাবে দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৮৭ শতাংশ ধনীই কর দেয় না। বর্তমান অবস্থা আমরা জানি না। তাদের অবশ্যই করের আওতায় আনতে হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র, বিআরটিএ, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্যের সঙ্গে টিআইএন ডেটাবেজ যুক্ত করলে কারও লাইফস্টাইল বা স্থাবর সম্পত্তির সঙ্গে আয়ের অসংগতি ধরা পড়লে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নোটিশ পাঠানো সম্ভব হবে। বিলাসবহুল গাড়ি, দ্বিতীয় ফ্ল্যাট বা বিদেশ ভ্রমণের ডেটা বিশ্লেষণ করে উচ্চবিত্তদের শনাক্ত করা যায়। প্রভাবশালী বা রাঘববোয়ালদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া বন্ধ করে কর ফাঁকির দায়ে দৃষ্টান্তমূলক জরিমানা ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। আরও জরুরি হলো, কর প্রদান প্রক্রিয়াকে শতভাগ অনলাইন ও হয়রানিমুক্ত করা। সেই সঙ্গে আদায়কৃত কর জনকল্যাণে কীভাবে ব্যয় হচ্ছে তা স্বচ্ছভাবে তুলে ধরা, যাতে ধনীদের মধ্যে কর দেওয়ার ব্যাপারে সামাজিক মর্যাদা ও নৈতিক দায়বদ্ধতা তৈরি হয়।
কার্যকর কর ব্যবস্থা মানে এই নয় যে, সবাই বেশি কর দেবেন। বরং এর অর্থ হলো, প্রত্যেকে তাঁর প্রকৃত সামর্থ্য অনুযায়ী ন্যায্য কর দেবেন। তখনই হয়তো কর আর ‘পেট কেটে’ দেওয়ার মতো কষ্টের বিষয় থাকবে না। বরং তা হয়ে উঠবে নাগরিক দায়িত্বের একটি স্বাভাবিক অংশ।
মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক
- বিষয় :
- মামুন রশীদ
