ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নববর্ষ

এবারের বৈশাখ আয়োজন অসাধ্য সাধনের আশ্বাস

এবারের বৈশাখ আয়োজন অসাধ্য সাধনের আশ্বাস
×

কাবেরী গায়েন

কাবেরী গায়েন

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০২ | আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

পহেলা বৈশাখ আসছে– বোঝা যায় মার্চের মাঝামাঝি থেকেই। বেশ কয়েকটি উৎস ধরে। সামাজিক মাধ্যমের যুগ। চাইলেও এড়ানো যায় না। অন্তত ১০ বছর ধরে দেখে আসছি, এক ব্যাপক প্রচারণা শুরু হয়ে যায়– পহেলা বৈশাখ উদযাপন হিন্দুয়ানি ব্যাপার। আনুষঙ্গিকভাবে আসে লাল পাড় সাদা শাড়ি, নাচ-গান, ঢোলের আওয়াজ; এমনকি ইলিশ মাছ নিয়েও উত্তেজিত বিরূপ বক্তব্য ও বয়কটের ডাক। গত বছর থেকে চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। বেচারা ‘মঙ্গল’ শব্দটা সহি নয় কোনো কোনো মহলে। চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা থেকে মঙ্গল খসে পড়েছে, যদিও ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তালিকায় এই শোভাযাত্রা মঙ্গল শোভাযাত্রা নামেই স্থান পেয়েছে। সংস্কৃতিমন্ত্রীর আশ্বাস টেকেনি। এই শোভাযাত্রা ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’, ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ ইত্যাদি নাম ধারণ করেছে। পহেলা বৈশাখ উদযাপনের বিরোধিতাকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ কাড়তে সক্ষম হয়েছেন এক ধর্মীয় বক্তা। তাঁর ভাইরাল হওয়া উত্তেজিত বক্তব্য– পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে কেউ যদি পাঞ্জাবি বানায়, তবে সে তার ধর্ম হারাবে। প্রকৃতির রসিকতা বোঝা দায়। মঙ্গল শব্দ নিষিদ্ধ হলেও পহেলা বৈশাখ এবার মঙ্গলবারেই পড়েছিল।

এসব উত্তেজিত বক্তব্যের ভেতরেই পহেলা বৈশাখের প্রস্তুতির অন্য খবর আসে। দেশের সকল চারুকলায় শোভাযাত্রার প্রস্তুতি চলে। সারাদেশের মানুষ যার যার সাধ্য অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে থাকেন নতুন বছর বরণের। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য মহড়া চলে। তবে সারাদেশের চোখ থাকে দুটো আয়োজনে– ছায়ানটের নববর্ষ বরণ অনুষ্ঠান, যা সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় রমনার অশ্বত্থ গাছের নিচে। অন্যটা চারুকলার শোভাযাত্রা। 

খুব ইচ্ছা ছিল ছায়ানটের অনুষ্ঠান রমনায় গিয়ে দেখার। নানা কারণে সেটা হয়ে ওঠেনি, তবে সরাসরি সম্প্রচার দেখলাম। কে বলবে, মাত্র চার মাস আগে ছায়ানট ভবনে হামলা করে বাদ্যযন্ত্র ভেঙে পুড়িয়ে দিয়েছে মব; ভবনে আগুন দেওয়া হয়েছে। সবার বাড়তি দৃষ্টি ছিল ছায়ানটের অনুষ্ঠানে। হামলা, ভাঙন, আগুন; সব পেছনে ফেলে কী টান টান উদ্দীপনা জাগানো অনুষ্ঠান করল ছায়ানট! ২০০ শিল্পী, যাদের বেশির ভাগই কৈশোরে কিংবা সদ্য তারুণ্যে। রাগ ভৈরব থেকে শুরু করে বাংলা গানের মূলধারার প্রতিনিধিত্বকারী সকল গানের শুদ্ধ পরিবেশন করে ছায়ানট দেখিয়ে দিল তার অন্তর্নিহিত শক্তি। প্রতিটি গান নির্বাচনে যত্নের ছাপ স্পষ্ট। শেষের দিকে চন্দনা মজুমদারের উদাত্ত গলায় ‘বড় সংকটে পড়িয়া দয়াল বারে বার ডাকি তোমায়, ক্ষম ক্ষম অপরাধ’ শুনে গায়ে কাঁটা দিল। বাংলা ভাষা আর সংগীতের ভাবসম্পদ যে কত ঐশ্বর্যময়– নিজেকে হঠাৎ খুব সম্পন্ন মনে হলো। আর যখন শেষে জাতীয় সংগীতে ছায়ানটের সঙ্গে রমনায় অনুষ্ঠান শুনতে আসা সবাই গলা মেলালেন; নিজের অজান্তেই চোখ সজল হয়ে উঠল। গান শেষে ছায়ানটের সভাপ্রধান ডা. সারোয়ার আলী চাইলেন স্বাধীনভাবে গান গাওয়ার অধিকার থাকে এমন এক দেশ; চাইলেন সকলের নিরাপত্তা। এই ডাক ছায়ানট সেই ষাটের দশকে দিয়েছে, এখনও দিতে হচ্ছে। গতবার নানা উস্কানির মুখে ছায়ানট তৈরি ছিল রমনার অনুষ্ঠানে বাধা এলে কী করবে, সে বিষয়ে। পাকিস্তান আমলের বৈরী দিনগুলো থেকে ছায়ানট শুদ্ধ সংগীতচর্চার ভেতর দিয়ে এ দেশের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ জারি রেখেছে। ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা হয়েছে; ভবনে আগুন দেওয়া হয়েছে; কিন্তু বারবার ফিনিক্স পাখির মতো ফিরে প্রমাণ করে দিয়েছে– ছায়ানটকে পোড়ানো যায় না। সংস্কৃতিকে অবলম্বন করেই বাঙালি বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। গান এক অনন্যসাধারণ অস্ত্র।

এবারের চারুকলার শোভাযাত্রায় মোরগ রাখার অভিনবত্ব ছিল। তবুও কী বিশাল স্বস্তি যদি গত বছরের শোভাযাত্রার সঙ্গে তুলনা করি! চারুকলার বর্ষবরণ শোভাযাত্রায় ক্রমশ সরকারি নিয়ন্ত্রণের ছায়া পড়ছে– এমন অভিযোগে ধানমন্ডি ২৭ থেকে একটি বিকল্প ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ বের হয়েছে ‘জাগাও পথিকে, ও সে ঘুমে অচেতন’ স্লোগান নিয়ে। বিভিন্ন জেলায়, এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামেও এবার অনুষ্ঠান হয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কারমাইকেল কলেজ; এমন সব প্রতিষ্ঠানে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান হবে, সেটা প্রত্যাশিত। কিন্তু দেশের উত্তরের প্রত্যন্ত গ্রাম উলিপুর; সেখানেও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় রঙিন পোশাকের শিশু-কিশোর-কিশোরী থেকে শুরু করে সব বয়সের নারী-পুরুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। চমকপ্রদ ছিল চাঁদপুরের বর্ণাঢ্য মুখোশ নাচ, নরসিংদীর পুতুলনাচ। ঘোষণা সত্ত্বেও হয়নি ‘আকবর-ই-শোভাযাত্রা’।

উপরি পাওনা রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর বৈশাখী শোভাযাত্রা, পান্তা খেতে বসার আয়োজন। অথচ দলটি বরাবর বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সমালোচনা করে এসেছে। শোভাযাত্রা তেমন গোছালো হয়নি। কিন্তু শুরু তো করল! পান্তা আয়োজনে মাটির সানকি বেশ পোক্ত দেখা গেল ছবিতে। অনুষ্ঠানের চেয়ে জামায়াতে ইসলামের ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে অধিকতর তাৎপর্যপূর্ণ– ‘জামায়াতে ইসলামী পহেলা বৈশাখকে ধারণ করে’ কিংবা ‘যারা পহেলা বৈশাখকে ধারণ করে না তারা সমাজের ভাইরাস’।  রাজনৈতিক কারণে এমন বক্তব্য; বলছেন অনেকে। তেমন হলেও দেশের এই অসাম্প্রদায়িক সর্বজনীন উৎসবে অংশগ্রণের রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে। 

লঞ্চডুবিতে মৃত্যু, পিটিয়ে মেরে ফেলা, হামে শিশুমৃত্যু, তেলের সংকট, সারা পৃথিবীর রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও এই পহেলা বৈশাখ দেশবাসীকে নানা উৎসবে শামিল করেছে। যার যেভাবে উৎসবে অংশগ্রহণে আগ্রহ, তিনি সেভাবেই করতে পারেন। শুধু অন্যের উদযাপনের বিরুদ্ধে না গেলেই হয়। আশান্বিত হতে গিয়েও মনে পড়ল আমার শিক্ষক সুব্রত শংকর ধরের মন্তব্য, ‘আমাদের অবস্থাটি গ্রিক পুরাণের সেই সিসিফাসের মতো। আমরা বারবার পাথরটাকে ঠেলে পাহাড়ের চূড়ায় তুলি, সেটি গড়িয়ে পড়ে। আবার তুলি, আবার পড়ে যায়। ছায়ানট ষাটের দশকে যা করেছে, যা বলেছে, আবার তা করতে হচ্ছে। আমাদের পিতা-পিতামহরা ভাষা নিয়ে, সংস্কৃতি নিয়ে, রাজনীতি নিয়ে যে যুদ্ধটি করেছেন পঞ্চাশ আর ষাটের দশকে, সেই যুদ্ধটি আবারও করতে হচ্ছে আমাদের। এই যুদ্ধের শেষ নেই।’ আমি বলি, পরিচয় ভুলিয়ে দেবার অপরাজনীতির বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ এক দীর্ঘ বিপ্লব, জীবনব্যাপী যুদ্ধ। 

আমার চাওয়া অবশ্য খুবই সামান্য– এ বছরটা আরও একটু সহনীয় হোক। সেটা সম্ভব হলে চারুকলার ‘মোরগ’ শোভাযাত্রার রসিকতাও মেনে নেব।

কাবেরী গায়েন: অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×