পরিবেশ-প্রতিবেশ
মাটি ও মানবস্বাস্থ্যের ক্ষতি সত্ত্বেও উত্তরবঙ্গে বাড়ছে তামাক চাষ
কেবল তামাক চাষ নিরুৎসাহিত করার আহ্বান যথেষ্ট নয়
রানা ভিক্ষু
প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬ | ১৫:৫৮
উত্তরবঙ্গের কৃষি অর্থনীতিতে তামাক চাষ এখনো এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা। স্বাস্থ্যঝুঁকি, মাটির উর্বরতা হ্রাস এবং আর্থিক অনিশ্চয়তার মতো গুরুতর সমস্যাগুলো সম্পর্কে কৃষকেরা অবগত থাকলেও প্রতিবছরই এ অঞ্চলে তামাকের আবাদ বাড়ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী– গত বছর রংপুর অঞ্চলে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে। চলতি মৌসুমে এ আবাদ আরও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় তামাকচাষি ও বিড়ি-সিগারেট কোম্পানির এজেন্টরা।
সাম্প্রতিক তামাকের বাজার পরিস্থিতি ও কৃষকের বাস্তবতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি মৌসুম শুরু হওয়ার আগে (অক্টোবর–ডিসেম্বর ২০২৫) ক্ষুদ্র কৃষকদের ঘরে থাকা তামাক স্থানীয় মজুতদারদের গুদামে চলে যায়। ফলে বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় তামাকপাতা মনপ্রতি প্রায় পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। তুলনামূলক এই ভালো দাম ক্ষুদ্র কৃষকদের মনে আশার সঞ্চার করেছিল। সেই আশাতেই চলতি মৌসুমে অনেক কৃষক ব্যাপকভাবে তামাক চাষে ঝুঁকেছেন। কিন্তু বাজারের স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম কমে গেছে। ফলে আবারও কৃষকেরা লোকসানের মুখে পড়ছেন।
তামাকচাষিদের ভাষ্য অনুযায়ী– তামাক চাষে ধাপে ধাপে পাতা সংগ্রহ করা হয় এবং প্রতিটি ধাপের জন্য আলাদা বাজার রয়েছে। প্রথম ধাপে কচি গাছ থেকে যে পাতা সংগ্রহ করা হয়, সেটিকে স্থানীয়ভাবে ‘বিষপাতা’ বলা হয়। কিন্তু চলতি মৌসুমে এই পাতার প্রায় কোনো ক্রেতাই নেই। দ্বিতীয় ধাপে প্রাপ্তবয়স্ক গাছ থেকে সংগ্রহ করা পাতাকে বলা হয় ‘হারকাট’। এ পাতার জন্য বিড়ি কারখানার দালালরা মনপ্রতি সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা পর্যন্ত দাম প্রস্তাব করছে, যা উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় অত্যন্ত কম। তৃতীয় ধাপে প্রবীণ গাছ থেকে সংগ্রহ করা পাতা ‘দোকাট’ নামে পরিচিত। কিন্তু বেশিরভাগ কৃষক এবার দোকাট তুলতে পারেননি। চৈত্র মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া কয়েক দফা শিলাবৃষ্টিতে তামাকগাছ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে তামাকচাষিদের ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়েছে।
তামাক গাছের মাথা কেটে দিয়ে চাষীরা গাছের পাতাকে বড় ও মোটা করে থাকেন। তামাক তাছের কেটে ফেলা সেই মাথাকে স্থানীয়ভাবে ‘ডেমা’ বলা হয়, যা শুকিয়ে আলাদাভাবে বিক্রি করা হয়। কিন্তু এ বছর তামাকের আবাদ বেশি হওয়ায় ডেমা বিক্রির সম্ভাবনাও কমে গেছে। অর্থাৎ উৎপাদনের প্রায় প্রতিটি ধাপেই কৃষকের সামনে অনিশ্চয়তা ও লোকসানের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
প্রশ্ন হলো– এসব ঝুঁকি জেনেও অভিজ্ঞ কৃষকেরা কেন তামাক চাষে ঝুঁকছেন? এর উত্তর খুবই সহজ– বিকল্প ফসল উৎপাদনের হতাশাজনক অভিজ্ঞতা। যেমন, বাম্পার ফলন হওয়া সত্ত্বেও ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় কৃষকেরা ধান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন। আলু চাষেও একই পরিস্থিতি বিরাজমান। ফলে তুলনামূলক নিশ্চিত বাজারের আশায় তারা তামাকের দিকে ঝুঁকছেন।
এ ক্ষেত্রে তামাক কোম্পানিগুলোর প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। কোম্পানিগুলো কৃষকদের আগাম বীজ, সার ও অন্যান্য উপকরণ সরবরাহ করে চাষে উৎসাহিত করে। এতে কৃষকেরা শুরুতেই এক ধরনের নির্ভরশীলতার মধ্যে পড়ে যান। মৌসুম শেষে বাজারদর কমে গেলে সেই ক্ষতির ভার শেষ পর্যন্ত কৃষকের কাঁধেই এসে পড়ে।
তামাক চাষের সঙ্গে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিও জড়িয়ে আছে। তামাকপাতা সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করার সময় কৃষকেরা নিকোটিনসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসেন। অনেক ক্ষেত্রে যারা নিজেরা ধূমপান করেন না, তারাও তামাক প্রক্রিয়াজাত করার সময় অজান্তেই শরীরে নিকোটিন গ্রহণ করেন। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব উত্তরবঙ্গের জনস্বাস্থ্যে পড়ছে। ইতোমধ্যে ‘বার্জারস রোগ’-এর প্রকোপ বৃদ্ধির বিষয়টি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
উনিশ শতকের শুরুতে মার্কিন চিকিৎসক লিও বার্জারস প্রথম এই রোগ শনাক্ত করেন। শরীরে অতিরিক্ত নিকোটিন প্রবেশ করলে রক্তনালিতে বাধা সৃষ্টি হয় এবং ধীরে ধীরে হাত-পায়ের রক্তসঞ্চালন ব্যাহত হয়। শুরুতে ঝিঁঝি ধরা ও ব্যথা অনুভূত হলেও সময়মতো চিকিৎসা না হলে তা পচনশীল ক্ষতে পরিণত হয়। অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত অঙ্গ কেটে ফেলাই একমাত্র চিকিৎসা হয়ে দাঁড়ায়। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় দরিদ্র কৃষিশ্রমিকদের মধ্যেই এ রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে।
তামাক চাষের আরেকটি বড় সমস্যা হলো─ মাটির স্বাস্থ্যহানী ঘটানো। তামাক চাষ মাটির উর্বরতা কমিয়ে দেয়। প্রকারান্তরে যা খাদ্যশস্য চাষযোগ্য জমির পরিমাণকে সংকুচিত করছে। ভবিষ্যতের যার নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি পড়বে খাদ্যনিরাপত্তার ওপর। উত্তরবঙ্গে ক্রমবর্ধমান তামাক চাষ নীরবে সেই আশঙ্কাকার পটভূমি তৈরি করছে।
অন্যদিকে কৃষকের আর্থিক বাস্তবতাও কঠিন। নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ এবং রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত মৌসুমে বোরো ধান চাষ করে তারা প্রতি বিঘায় এক হাজার থেকে এক হাজার দুইশ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনেছেন। বাধ্য হয়ে তারা চলতি মৌসুমে তামাক চাষে ঝুঁকেছেন। অর্থাৎ কৃষকের কাছে তামাক চাষ এখন অনেকটা অর্থনৈতিক অভিযোজনের বিকল্প কৌশলে পরিণত হয়েছে, যদিও সেটিও ঝুঁকিমুক্ত নয়।
বাস্তবে কৃষকেরা সচেতনভাবে ঝুঁকি নিচ্ছেন এমনটিও নয়; বরং বিকল্প ফসল চাষ করে ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির অনিশ্চয়তা এবং বাজার কাঠামোর দুর্বলতার কারণে তারা অনেকটা বাধ্য হয়েই এই পথে হাঁটছেন। সবকিছু মিলিয়ে উত্তরবঙ্গে তামাক চাষ একটি জটিল অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন।
এই বাস্তবতায় ঘাতক ফসল তামাক চাষ থেকে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করতে হলে তাদের সামগ্রিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় কৃষি পরিকল্পনায় কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, কার্যকর বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং কৃষিবীমা চালুর বিষয়টিকে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এমন কৃষিবীমা দরকার, যা শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগে সৃষ্ট ক্ষতিই নয়, বাজারদর কমে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট আর্থিক ক্ষতিও আংশিকভাবে পূরণ করতে পারে।
সঙ্গতকারণে কেবল তামাক চাষ নিরুৎসাহিত করার আহ্বান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন লাভজনক বিকল্প ফসল, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা এবং কৃষকবান্ধব কৃষিনীতি। তবেই উত্তরবঙ্গের কৃষকেরা স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আর্থিক অনিশ্চয়তার এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসার বাস্তব পথ খুঁজে পাবেন।
রানা ভিক্ষু: লেখক, গবেষক ও নীতি বিশ্লেষক
[email protected]
- বিষয় :
- তামাক
- চাষ
- উত্তরাঞ্চল
