সংবাদমাধ্যম
সাংবাদিকতায় ফেলোশিপ সমাচার
ফেলোশিপে পক্ষপাত নতুনত্ব বিকাশে বাধা দেয়
মোছাব্বের হোসেন
প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ | ২০:০০
বাংলাদেশে ও বিশ্বে সাংবাদিকতায় ‘ফেলোশিপ’ নতুন নয়। আগে তেমন আলোচনা না থাকলেও সাম্প্রতিককালে মিডিয়া-এথিক্স ও গেটকিপিং নিয়ে গবেষণায় এই ফেলোশিপের বিষয়টি উঠে এসেছে। আমি নিজেও বেশ কয়েক বছর ধরে সাংবাদিকতা করছি। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কাজের জন্য ফেলোশিপ পেয়েছি। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজের জন্য ফেলোশিপ পেতে গেলে পিচিং বা প্রস্তাব লেখা, জমা দেওয়া, ফলোআপ প্রশ্নের উত্তর দেওয়াসহ নানা কাজ থাকে। প্রস্তাব থেকে প্রশ্নোত্তরের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হয়, ধারণাটি ইউনিক কিনা। ইউনিক হলেই যে ফেলোশিপ পাওয়া যাবে, সে নিশ্চয়তাও নেই। এসব পর্যায় অতিক্রম করেই একজন সাংবাদিক তাঁর কাজের জন্য ফেলোশিপ পান। ফেলোশিপের ফান্ডে গুরুতর অথচ অদ্বিতীয় কোনো ইস্যুতে দীর্ঘসময় ধরে কাজ করা সহজ হয়। কিন্তু সাম্প্রতিককালে আমাদের মতো ছাপোষা সাংবাদিকদের জন্য ফেলোশিপ পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে।
এর একটি কারণ– আন্তর্জাতিক, এমনকি দেশীয় কোনো সংস্থার ফেলোশিপের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত বা সম্পর্কিত এবং দেশীয় প্রেক্ষাপটে প্রভাবশালী সাংবাদিক বা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতার শিক্ষকরা ফেলোশিপ আবেদন পর্যালোচনা বা মূল্যায়নের দায়িত্বে থাকেন। যখন কোনো ফেলোশিপ, প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক রিপোর্টিং গ্রান্ট বা রেসিডেন্সি নির্বাচন করা হয়, তখন আবেদনকারীর দক্ষতা ও যোগ্যতার পাশাপাশি তাদের আবেদনগুলো মূল্যায়ন বা পর্যালোচনার দায়িত্বে থাকা দেশীয় সাংবাদিকদেরও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা থাকে। অনেক সময় তারা পরিচিত ছাত্র, সহকর্মী বা ঘনিষ্ঠ মহলকেই অগ্রাধিকার দেন। ঢালাওভাবে অভিযোগ করা যাবে না; কিন্তু কখনও কখনও এমন উদাহরণও পাওয়া যাবে, মূল্যায়ন বা পর্যালোচনার দায়িত্বে থাকা সাংবাদিকই আবেদনের প্রক্রিয়া, খসড়া আবেদন দেখে দিচ্ছেন।
এতে যোগ্যতর আবেদনকারীরা স্বাভাবিকভাবেই হতাশ হন এবং একসময় এসব আবেদন করা বন্ধ করে দেন। এতে সবচেয়ে ক্ষতি হয় আসলে সাংবাদিকতার; ভালো আইডিয়া জমা পড়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
এই পরিস্থিতি সাংবাদিকতাকে আরও কয়েকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। প্রথমত, এটি বৈচিত্র্য সীমিত করে। সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বুর্দিয়ো (১৯৯৮) এবং মিডিয়া স্কলার বার্বি জেলিজার (২০০৪) দেখিয়েছেন, নিউজরুমের ক্ষমতাবানরা প্রায়ই নিজেদের মতো পটভূমি ও দৃষ্টিভঙ্গির মানুষদেরই বেছে নেন। ফলে প্রান্তিক গোষ্ঠী, প্রথম প্রজন্মের সাংবাদিক অথবা আন্তর্জাতিক আবেদনকারীরা যারা পশ্চিমা নেটওয়ার্কে নেই তারা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।
দ্বিতীয়ত, এটি ন্যায্যতা ও আস্থা নষ্ট করে। সাংবাদিকতা স্বাধীনতা ও সততার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু ফেলোশিপের ক্ষেত্রে পক্ষপাতমূলক মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় আবেদনকারীর দক্ষতার চেয়ে ‘কাকে চেন’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মিডিয়া নৈতিকতাবিদ স্টিফেন জে অ্যানসন ও স্টিফেন জে ওয়ার্ড (ওয়ার্ড, ২০০৪) বলেন, এ ধরনের পক্ষপাত সাংবাদিকতার নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে।
তৃতীয়ত, ফেলোশিপে পক্ষপাত নতুনত্ব বিকাশে বাধা দেয়। গল্পের ধরন, ফ্রেমিং ও বিষয় নির্বাচনেও পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। ফলে নতুন ধারার চিন্তা, ভিন্ন সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি বা উদীয়মান প্রতিবেদকদের সৃজনশীলতা জায়গা পায় না। সৎ সাংবাদিক একটা ফেলোশিপ পেলে উৎসাহিত হন, কিছু টাকা পান, নেটওয়ার্ক বাড়ানোর সুযোগ পান। কিন্তু সেটা না পেয়ে যখন পক্ষপাতদুষ্টতার শিকার হন তখন সেটা দীর্ঘমেয়াদে সাংবাদিকতার ক্ষতি তো বটেই।
একই কথা বলা চলে সাংবাদিকতাবিষয়ক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সগুলোয় বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল বাছাই করার ক্ষেত্রে। আগে যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্ব ছিল মূলত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হাতে। তখন যোগ্যরা অনেকে সুযোগ পেতেন। এখন সেই হার আগের তুলনায় অনেক কমে এসেছে।
এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে খাটো করা নয়; বরং নতুন ও উদ্ভাবনীমূলক সাংবাদিকতা বিকাশের স্বার্থেই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। কারণ ফেলোশিপের ক্ষেত্রে পক্ষপাতমূলক পরিস্থিতি সাংবাদিকতা পেশার ভবিষ্যৎকেই দুর্বল করে দিতে পারে। যে তরুণ সাংবাদিকদের শক্ত নেটওয়ার্ক নেই, তারা বহুবার বাদ পড়তে পড়তে পেশাই ছেড়ে দিতে পারেন– দক্ষতার অভাবে নয়, সুযোগের অযৌক্তিক বণ্টনের কারণে।
মোছাব্বের হোসেন: সাংবাদিক, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মন্টানায় অধ্যয়নরত
- বিষয় :
- সাংবাদিকতা
- ফেলোশিপ
