অন্যদৃষ্টি
মোবাইল তল্লাশির মনস্তত্ত্ব
মো. আসাদুজ্জামান
প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ | ১০:৪৫
বিশেষ পরিস্থিতিতে সড়ক ও মহাসড়কের চেকপোস্টে পথচারী ও যাত্রীদের থামিয়ে মোবাইল ফোন তল্লাশির খবর সংবাদমাধ্যমে আসে। এ ধরনের ঘটনার ভিডিওচিত্র প্রায়ই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা ভুক্তভোগীদের সামাজিক মর্যাদাকে আরও বেশি ক্ষুণ্ন করে। পুলিশের সদরদপ্তর থেকে অবশ্য জানানো হয়েছে, ঢালাওভাবে সাধারণ নাগরিকদের ফোন বা সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট চেক করার কোনো দাপ্তরিক নির্দেশনা বা আইনি অনুমোদন নেই। কেবল সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধের ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহের ক্ষেত্রে ডিভাইস পরীক্ষার বিধান রয়েছে।
সংবিধানের ৪৩ (খ) অনুচ্ছেদে স্পষ্টাক্ষরে নাগরিকের চিঠিপত্র এবং যোগাযোগের অন্যান্য উপায়ের গোপনীয়তার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। আধুনিক বিচারিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মানুষের স্মার্টফোনে রক্ষিত ইমেইল, চ্যাট হিস্ট্রি, ছবি ও নথি এই যোগাযোগের ডিজিটাল সম্প্রসারণ, যা সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদের সুরক্ষার আওতাভুক্ত। তবে এই সাংবিধানিক অধিকারের বিপরীতে বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধি এবং বিশেষ নিরাপত্তা আইনগুলোর মধ্যে এক ধরনের আইনি অসংগতি লক্ষ্য করা যায়।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা অনুযায়ী পুলিশকে কোনো ওয়ারেন্ট ছাড়াই কেবল ‘যৌক্তিক সন্দেহের’ ভিত্তিতে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যার অপব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আইনি বিতর্ক চলছে। হাইকোর্ট বিভাগ এই ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে ১৫ দফা সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছিলেন।
ডিজিটাল ডিভাইস তল্লাশির এই নির্বিচার চর্চা নাগরিক সমাজে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব বিস্তার করে। মোবাইল ফোন কেবল একটি সাধারণ যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এটি মানুষের ব্যক্তিত্ব ও চিন্তার ডিজিটাল সম্প্রসারণ। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা যখন সাধারণ নাগরিকদের ফোন কেড়ে নিয়ে তাদের মেসেঞ্জার বা হোয়াটসঅ্যাপের চ্যাট হিস্ট্রি পড়তে শুরু করে, তখন নাগরিকদের মনে এক ধরনের স্থায়ী অনিরাপত্তা ও ভীতি তৈরি হয়। এই ভীতি স্বাধীন মতামত প্রকাশ এবং যৌক্তিক সমালোচনা থেকে বিরত রাখে। যা পরোক্ষভাবে গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল করে। তদুপরি এ ধরনের তল্লাশির ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে পুলিশ বাহিনীর প্রতি গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতি আস্থা যেখানে সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান শর্ত, সেখানে চেকপয়েন্টে নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয় হয়রানি ও প্রাইভেসির লঙ্ঘনে এই আস্থার সম্পর্ক মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এবং পেশাজীবীদের মধ্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি এক ধরনের বৈরিতা ও বিচ্ছিন্নতাবোধের জন্ম নেয়।
তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির এই যুগে অপরাধ দমনের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তা হতে হবে আইনের শাসন ও নাগরিক অধিকারের সুরক্ষাকে অক্ষুণ্ন রেখে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রাইভেসির অধিকার রক্ষা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তল্লাশি ক্ষমতার যৌক্তিক সীমা নির্ধারণে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা আবশ্যক।
প্রথমত, বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের পক্ষ থেকে একটি সুনির্দিষ্ট বিচারিক নির্দেশিকা জারি করা প্রয়োজন, যেখানে স্পষ্ট করা হবে– রাস্তায় সুনির্দিষ্ট ওয়ারেন্ট বা সুনির্দিষ্ট অপরাধের অকাট্য প্রমাণ ছাড়া কোনো নাগরিকের মোবাইল ফোন বা অন্য কোনো ডিজিটাল ডিভাইস তল্লাশি করা সম্পূর্ণ বেআইনি। দ্বিতীয়ত, সাইবার নিরাপত্তা আইনের বিতর্কিত ধারাগুলো সংশোধন করে ডিভাইস তল্লাশি ও জব্দের ক্ষেত্রে বিচারিক নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের আধুনিক অপরাধ তদন্ত এবং মানবাধিকারের আইনি সীমানা সম্পর্কে সংবেদনশীল ও পেশাদার প্রশিক্ষণ দিতে হবে। রাস্তায় তল্লাশির সময় ক্যামেরা ব্যবহার করে নাগরিকের অসম্মতিতে ভিডিও ধারণ এবং তা সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
ডিজিটাল বাংলাদেশে প্রযুক্তির অগ্রগতি যেন নাগরিকদের দাসত্বের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়, বরং তা যেন মানুষের স্বাধীনতা ও প্রাইভেসির অধিকারকে আরও সুরক্ষিত করে
মো. আসাদুজ্জামান; সহকারী অধ্যাপক, আইন ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি