অর্থনীতি
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার থেকে পিছিয়ে আসা যাবে না
সাজ্জাদ জহির
সাজ্জাদ জহির
প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ | ১০:৫৪
সম্প্রতি সংসদে চলতি অর্থবছরের বাজেট সম্পর্কে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট অনুধাবনের তাগিদ দিয়েছেন। তবে যেসব প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা সেই গণঅভ্যুত্থানকে ত্বরান্বিত করেছিল, তা বোঝা বেশি জরুরি। এটি আশাব্যঞ্জক যে, মানুষ এখন ব্যাপকভাবে এটি উপলব্ধি করছে, ব্যক্তি মূলত একটি ব্যবস্থারই ফসল, আর সেই ব্যবস্থাটিই গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে।
ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাগুলো বাস্তব হলেও বিদেশি আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট ‘জাতীয়তাবাদ’ স্বৈরতন্ত্রকে উস্কে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। আর জাতীয়তাবাদকে উগ্র রূপ গ্রহণ থেকে বিরত রাখতে প্রয়োজন সক্রিয় জাতি গঠন প্রক্রিয়া, যেখানে রাষ্ট্র নাগরিকদের স্বার্থ সমুন্নত রাখবে; নিয়মভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং স্বচ্ছ আইন কার্যকর করবে। তবে এই নিবন্ধে মূলত অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কাঠামোগত পর্যালোচনা ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণেরই চেষ্টা করেছি, যাতে প্রকৃত জাতি গঠনের লক্ষ্যে জরুরি প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতি-সংস্কারের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা যায়।
এ বিষয়ে প্রথমেই আসে পুঁজিবাজারে কারসাজির কথা। প্রভাবশালী ও জবাবদিহিহীন মহলের নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে শেয়ারবাজারে সাধারণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দ্বিতীয়ত, স্ব-মালিকানাধীন আবাসনপ্রত্যাশী শহরবাসী এবং রেমিট্যান্স প্রেরণকারী অনিবাসী বাংলাদেশিরা অসাধু ডেভেলপারদের দ্বারা প্রতারিত হয়েছেন। এসব অসাধু ডেভেলপার/বিল্ডারের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে হাত মিলিয়েছেন করবহির্ভূত বা কালো টাকার মালিকরা। কেউ কেউ অসাধু ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ইতোমধ্যে বিক্রি হয়ে যাওয়া ফ্ল্যাটের ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ বা মালিকানা হস্তান্তরের আইনি ক্ষমতাকে জামানত হিসেবে ব্যবহার করে ব্যাংক থেকে ঋণ হাতিয়ে নিয়েছে। তৃতীয়ত, নিয়ন্ত্রণহীন এমএলএম সংস্থা, বহুমুখী সমবায় সমিতি এবং পঞ্জি স্কিমগুলোর মাধ্যমে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীরা নিয়মিত প্রতারিত হয়েছেন। চতুর্থত, দরিদ্র ও দুর্বলদের কাছ থেকে আমানত নিয়ে ঋণের নামে ধনী ও ক্ষমতাবানদের কাছে আর্থিক সম্পদ স্থানান্তরে ব্যাংকগুলো ভূমিকা রেখেছে।
অন্যদিকে ব্যাংকিং কাঠামোর প্রতিটি স্তরে সুশাসনের অভাব দেখা গেছে। সম্ভবত সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অধ্যাদেশের জটিল সমীকরণে গড়ে ওঠা স্বার্থান্বেষী ‘শেয়ারহোল্ডার-মালিক’দের দৌরাত্ম্য এবং আমানতকারীদের অর্থের সুরক্ষায় অপর্যাপ্ত ব্যবস্থার ফলে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর শীর্ষ ব্যবস্থাপক ও চেয়ারম্যান পছন্দসই পর্ষদ নিয়ে অবাধ ক্ষমতাচর্চার সুযোগ পায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার বিন্যাস-সংক্রান্ত বিধিমালার অস্পষ্টতা বহিরাগত স্বার্থান্বেষী মহলকে ক্ষমতার অলিগলি ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত প্রভাবিত (বা বাধাগ্রস্ত) করার সুযোগ করে দেয়। এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক কার্যক্রমকে ‘প্রকল্পভিত্তিক’ (প্রজেক্টাইজেশন) করার প্রবণতা স্পন্সর (পৃষ্ঠপোষক) ও বিদেশি ঋণদাতাদের জন্য ব্যাংকিং কার্যক্রম নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে সাজানোর সুযোগ তৈরি করে দেয়, যা অনেক সময় ‘বৈশ্বিক সর্বোত্তম চর্চা’র অন্তরালে করা হয়। পঞ্চমত, নিবন্ধীকরণের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশে নিবাসী নাগরিক (দেশি), অনিবাসী বাংলাদেশি নাগরিক (যারা এনআরবি হিসেবে পরিচিত), স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে অবস্থানরত কর্মরত বিদেশি নাগরিক ও তাদের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তি এবং বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিদেশি নাগরিকদের (ফরেন সিটিজেনস অব বাংলাদেশ অরিজিন-এফসিবিও) সঠিকভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয় না। দ্বৈত পরিচিতিসম্পন্ন ব্যক্তিরা প্রায়ই বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে স্থানীয় সম্পদ আহরণ করেন। অথচ কর প্রদানের ক্ষেত্রে নিজেদের দায়বদ্ধতা গোপন রাখেন।
এই গোষ্ঠী প্রায়ই বাংলাদেশের সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে দায়বদ্ধহীনতা, অব্যবস্থাপনা ও আর্থিক অস্বচ্ছতা বিস্তৃত করেছে। সাম্প্রতিক বাজেটবিষয়ক আলোচনার সময় এসব দুর্বলতা মোকাবিলার লক্ষ্যে তিনটি গঠনমূলক নীতি-প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে ক্ষমতাসীন কর্তৃপক্ষ সেগুলোকে বাতিল করে বা পাশ কাটিয়ে যায়। যেমন:
১. দলিলের মাধ্যমে সম্পত্তির যে মূল্য দেখানো হয় তা প্রকৃত বাজারমূল্যের চেয়ে কম হলে সরকার রাজস্ব হারায়। পাশাপাশি বিক্রেতারা অবৈধ আয়ের উৎস গোপন করেন এবং ক্রেতারা তাদের অর্থের উৎস প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকার সুযোগ পান। এ অন্যায় সুবিধা বহাল রাখতে নীতিনির্ধারকরা সম্পত্তির সরকারি নিবন্ধনের মূল্যকে ‘মৌজা দর’-এর সঙ্গে যুক্ত রাখার সিদ্ধান্তই বহাল রেখেছেন। এর ফলে বস্তুত আবাসন খাত থেকে উদ্ভূত অপসংস্কৃতি ও মিথ্যাচারের প্রবণতাকে স্বীকৃতি দেওয়া হলো এবং কালো টাকার আধিপত্য মেনে নিয়ে দুর্নীতিপরায়ণ মধ্যস্বত্বভোগীদের অসাধু কর্মকাণ্ডকে পরোক্ষ বৈধতা দেওয়া হলো।

২. দ্বিতীয় আশাব্যঞ্জক প্রস্তাবটি ছিল ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন সংযুক্ত করা। দুর্ভাগ্যবশত, এটি ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্বল্পবিত্তের আমানতকারীদের সুরক্ষার অজুহাতে বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে মূলত বিত্তবান অভিজাত শ্রেণিই সুরক্ষা পেল, যারা তাদের অপ্রদর্শিত কর ফাঁকি দেওয়া আয়সহ সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ গোপন রাখে। একই সঙ্গে শনাক্ত না হওয়ার ফলে বিদেশি কর্তৃপক্ষের প্রতি আনুগত্য প্রকাশকারী একাধিক নাগরিক-পরিচিতির ব্যক্তিরাও রাজস্ব বলয়ে অধরা রয়ে যাবে! সনদনির্ভর পরিচিতি যাচাইয়ের পরিবর্তে আমানত ও লেনদেনের সীমার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট হিসাবকে আওতামুক্ত রাখার নীতিসহ একটি সংশোধিত প্রস্তাব গ্রহণ করা হলে ‘কালো টাকা’র বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসার পথে আমাদের সমাজ এগিয়ে যেতে পারে। সেই সঙ্গে ব্যাংক খাতের অনেক অনিয়মও এ পদক্ষেপের ফলে হ্রাস পাবে।
৩. যথাযথ আর্থিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হলে আবাসন (রেসিডেন্সি) ও নাগরিকত্বের বিষয়টি কঠোরভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা প্রয়োজন। যেহেতু বাণিজ্যিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমেই অর্থনৈতিক লেনদেন পরিচালিত হয়, তাই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার যোগ্যতা নির্ণয়ে একজন ব্যক্তির আইনি আবাসন ও কর্মসংস্থান সংক্রান্ত অবস্থানের প্রতিফলন থাকা আবশ্যক। বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের অধিকার, স্থানীয় উৎস থেকে ঋণ গ্রহণের সুযোগ এবং পেনশন বা অর্জিত অর্থ বিদেশে স্থানান্তর বিষয়ে সুষ্ঠু নীতিমালা প্রণয়ন ও কার্যকর করার জন্য স্থানীয় বাসিন্দা ও অনিবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে এফসিবিও ব্যক্তিদের পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি।
স্মরণ করা যেতে পারে, স্থানীয় ব্যাংকিং খাতের সংকটে গভীর সম্পৃক্ততা থাকা সত্ত্বেও এস. আলম পরিবার তাদের সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব এবং দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তির সুযোগ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাংকের আইসিএসআইডিতে আন্তর্জাতিক সালিশি মামলা দায়ের করেছে। আরও উল্লেখ্য, প্রাতিষ্ঠানিক শ্রেণিবিন্যাস স্পষ্ট না থাকলে ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পরিবর্তে রাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণ বা কঠোরতর বিধিনিষেধ আরোপের হাতিয়ার হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ব্যাংক খাতের কাঠামোগত সমস্যার চটজলদি সমাধান আশা করা যায় না। তবে বৈশ্বিক অর্থবাজারের পরিবর্তনের ধারাপ্রকৃতি গুনতিতে নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের উদ্দেশ্যে গঠনমূলক পর্যালোচনা একান্তই জরুরি, যেখানে পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বশীল জবাবদিহিমূলক শাসনকার্য গুরুত্ব পাবে। জাতি গঠনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতি সংস্কারের আলোচিত ক্ষেত্রগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জরুরি ভিত্তিতে বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করার জন্য নীতিনির্ধারক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এই সংস্কার ও তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া থেকে সরে এলে সাম্য ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে জাতি গঠনের উদ্যোগ অঙ্কুরেই বিনষ্ট হবে। সঠিক সময়ে সঠিক নীতিমালা প্রণয়ন ও কার্যকর করা না হলে আমরা ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন করতে পারব না এবং রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দুরাশাই রয়ে যাবে।
সাজ্জাদ জহির: অর্থনীতিবিদ; নির্বাহী পরিচালক, ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপ (ইআরজি)
[email protected]