ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

আন্তর্জাতিক

ট্রাম্পকে থামাতে প্রার্থনাই কি একমাত্র ভরসা?

ট্রাম্পকে থামাতে প্রার্থনাই কি একমাত্র ভরসা?
×

ডোনাল্ট ট্রাম্প

সাইমন টিসডাল

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ | ১০:৪৭ | আপডেট: ২০ জুলাই ২০২৬ | ১১:০০

আনাড়ি ও অপটু ডোনাল্ট ট্রাম্প ইরানে হেরেছেন। যে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের সূচনা তিনি করেছেন, তা বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী আবারও ইরানে হামলা করেছে এবং দেশটির বেসামরিক অবকাঠামোকে নিশানা করে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে। তারা হামলা তীব্রতর করেছে এবং ইরানের মানুষদের দুর্ভোগ আমলেই নিচ্ছে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও আমেরিকার যুদ্ধমন্ত্রী জয়ের অসার গল্প ফাঁদছেন? এই সপ্তাহেই তিনি বড় জয় দাবি করেছেন। তবে কেউই তাঁকে বিশ্বাস করে না। 

ট্রাম্পের আগ্রাসনের কারণে হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কমেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি যুদ্ধ মেশিনের লক্ষ্য হলো ইরানের পরমাণু কর্মসূচির বিনাশ; আঞ্চলিকভাবে ইরানের যেসব প্রক্সি বাহিনী আছে, সেগুলোর শক্তি কমানো এবং রেজিম চেঞ্জ বা শাসন পরিবর্তন। কিন্তু এসব লক্ষ্য পূরণ আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে কঠিন হয়েছে। ট্রাম্পের দুর্বল নেতৃত্বের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীগুলোর অদক্ষতা বেড়েছে, কিন্তু ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের কিছুই হয়নি। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী ইরান যদি অস্তিত্ব সংকটে থাকত, তবে দেশটি তার দখলে থাকত।

জর্জ ডব্লিউ বুশ ২০০৩ সালে  ১ লাখ ৭০ হাজার সৈন্য পাঠিয়ে ইরাক দখলে সক্ষম হন। ট্রাম্প ইরানে এমন কিছু করার সাহস করবেন না। তাঁর এই ছোট্ট দয়ার জন্য অবশ্য বিশ্বকে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। যদিও তিনি কখনোই স্বীকার করবেন না– তিনি বেপরোয়া হয়ে এমন এক যুদ্ধের সূচনা করেছেন, যার সমাপ্তি তিনি করতে পারবেন না। তিনি বরং বেসামরিক নাগরিক ও মার্কিন সেনাদের এক অনন্ত যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিতে চান; উপসাগরীয় আরব মিত্রদের বিপদে ফেলতে চান; বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চান; উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি বাড়াতে চান; আন্তর্জাতিক আইনকে ধ্বংস করতে চান এবং রিপাবলিকান দলের নির্বাচনী সম্ভাবনাকে নষ্ট করতে চান।

ইরান নয়; ট্রাম্পের আত্মপ্রীতিই বিশ্বের এক নম্বর শত্রু। এই যুদ্ধ আবারও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে গতি পাওয়ার প্রধান কারণ তিনিই। তিনি এককভাবে এক মানবিক ধ্বংসাস্ত্র।

এখানে একটি পরিচিত ধারা দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্প কংগ্রেস, মার্কিন মিত্র বা আমেরিকার জনগণের সঙ্গে পরামর্শ না করেই যুদ্ধে জড়িয়েছেন। তাঁর কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা বা দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ছিল না। তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত বিজয়ের ভুয়া আশ্বাস গিলে ফেলেছিলেন। সামরিক ও আঞ্চলিক ঝুঁকি সম্পর্কে তাঁর অজ্ঞতার কারণে তিনি বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন উপেক্ষা করে যুদ্ধে অটল। আশ্চর্যজনক, ট্রাম্প আশা করেছিলেন, ইরান আত্মসমর্পণ করবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার আগে। যে কারণে ইরানের পাল্টা আক্রমণে উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে হামলায় তিনি ‘স্তম্ভিত’ হয়েছিলেন। অন্য কারও অবস্থা এমন হয়নি। এখন তিনি সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের একই গোঁয়ার্তুমি ও দায়িত্বহীনতা দেখা গেছে গত বছরের জাঁকজমকপূর্ণ ২০ দফা গাজা শান্তি পরিকল্পনায়। সেখানে আলোচিত গাজা পুনর্গঠন, আন্তর্জাতিক স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স, হামাসে নিরস্ত্রীকরণ তথা কোনো বিষয় আর এগোয়নি। এতে ট্রাম্পও আগ্রহ প্রায় হারিয়ে ফেলেছেন।

ট্রাম্প এখন দিশেহারা। এই সপ্তাহের উত্তেজনার মূল কারণ জুনের ‘সমঝোতা স্মারক’, যেখানে নাকি ৬০ দিনের জন্য সংঘাত স্থগিত রাখা হয়েছিল আলোচনার আশায়। ট্রাম্প একে ব্যক্তিগত বিজয় হিসেবে প্রচার করেছিলেন। কিন্তু তাঁর অনেক চুক্তির মতো এটিও মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ। এর পঞ্চম অনুচ্ছেদ কার্যত ইরানের হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণকে বৈধতা দিয়েছিল। ট্রাম্প এতে সম্মত হয়েছিলেন। এখন পরিণতি বুঝতে পেরেই তিনি পিছিয়ে যাচ্ছেন। তেহরান তাঁকে বিশ্বাস না করার মধ্যে বিস্ময়ের কিছু নেই! আসলে কে তাঁকে বিশ্বাস করে? ট্রাম্প আবারও ইরানে দৈনিক বোমা বর্ষণ শুরু করেছেন, যদিও আগের সব আক্রমণ কাঙ্ক্ষিত ফল আনতে ব্যর্থ হয়েছিল। যত বেশি তিনি বোমা ফেলেন, ততই ইরানের শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী হয়ে ওঠে; সংঘাত তীব্র ও বিস্তৃত হয়, আর পারমাণবিক ইস্যু সমাধানের সম্ভাবনা আরও দূরে সরে যায়। 

প্রশ্ন হলো, ট্রাম্পকে থামাবে কে? কংগ্রেস তাঁকে যুদ্ধ থামাতে বা আনুষ্ঠানিক অনুমোদন চাইতে বলেছে। তিনি তা উপেক্ষা করছেন। জনমত জরিপ বলছে, অধিকাংশ আমেরিকানই এই ১০০ বিলিয়ন ডলারের মুদ্রাস্ফীতি ঘটানো সংকটের বিপক্ষে। কিন্তু ট্রাম্প শুনতে নারাজ। তাঁর মিত্ররা হতবাক। পোপ লিও তাঁকে থামাতে জোর চেষ্টা করছেন। তারপরও এখন প্রার্থনাই কেবল বিকল্প।

সাইমন টিসডাল: গার্ডিয়ানের সাংবাদিক; গার্ডিয়ান থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর মাহফুজুর রহমান মানিক

আরও পড়ুন

×