শিক্ষা
নতুন চার পাঠ্যবই এবং শিক্ষাক্রমের প্রশ্ন
মোশাররফ তানসেন
প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ | ১০:৫০
আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে চারটি নতুন পাঠ্যবই– খেলাধুলা, বাংলাদেশের সংস্কৃতি, আমার কারিগরি শিক্ষা এবং আনন্দময় শিখন (লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস) প্রবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিশুদের খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী করে তোলা, দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করানো, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি এবং মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা জোরদার– এ সবই সময়োপযোগী উদ্যোগ। তবে ইতোমধ্যে ২০২৬ সালের সাত মাস প্রায় অতিক্রান্ত। জুলাইয়ের মাঝামাঝিতেও যদি নতুন বইগুলোর কাঠামো চূড়ান্ত না হয়, তাহলে বাকি প্রায় সাড়ে পাঁচ মাসের মধ্যে এসব বই লেখা, সম্পাদনা, পর্যালোচনা, অলংকরণ, মুদ্রণ এবং দেশের প্রতিটি বিদ্যালয়ে বিতরণ– সবকিছু কতটা বাস্তবসম্মত?
সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এখনও নতুন বইগুলোর কাঠামো ও বিষয়বস্তু চূড়ান্তকরণে কাজ করছে। অর্থাৎ বই তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো– বিষয়বস্তু লেখা, বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনা, ভাষা সম্পাদনা, শিক্ষণ পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান, চিত্রায়ণ, প্রুফ দেখা, মুদ্রণ ও বিতরণ এখনও বাকি। এর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথা শিক্ষক নির্দেশিকা প্রস্তুতকরণ এবং শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ।
একটি মানসম্মত পাঠ্যবই তৈরি কোনো যান্ত্রিক বা তড়িঘড়ি সম্পন্ন করার কাজ নয়। একটি বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়কে শিক্ষাক্রমের লক্ষ্য, শিক্ষার্থীর বয়স, শেখার মনোবিজ্ঞান এবং শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হয়। সময়ের চাপে এই প্রক্রিয়া সংকুচিত হলে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বইয়ের গুণগত মান।
বাংলাদেশ অতীতেও পাঠ্যবই মুদ্রণ ও বিতরণে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। অনেক সময় শেষ পর্যন্ত বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছেছে ঠিকই; কিন্তু প্রশ্ন হলো, সময়মতো বই পৌঁছানোই কি শিক্ষাক্রম সংস্কারের একমাত্র সাফল্য? নাকি আরও বড় প্রশ্ন, বইগুলো কি সত্যিই শিক্ষার্থীদের অর্থবহ শেখার সুযোগ তৈরি করতে পারছে?
আনন্দময় শিখন তথা লার্নিং উইথ হ্যাপিনেসের কথা বলা যাক। ধারণাটি নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। প্রতিটি শিক্ষকই জানেন, শিশুরা সবচেয়ে ভালো শেখে তখনই, যখন তারা নিরাপদ, আনন্দিত, কৌতূহলী এবং আত্মবিশ্বাসী বোধ করে। আনন্দময় পরিবেশ শেখাকে সহজ, অর্থবহ এবং দীর্ঘস্থায়ী করে। কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস কি আসলেই একটি আলাদা পাঠ্যবইয়ের বিষয় হতে পারে?
কারণ লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস মূলত শিক্ষাদর্শন। এটি কোনো নির্দিষ্ট বিষয় নয়, বরং শেখানো ও শেখার একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। আনন্দময় শিক্ষা কেবল কৃতজ্ঞতা, বন্ধুত্ব বা সুস্থ জীবনযাপন নিয়ে কয়েকটি অধ্যায় পড়ানোর মাধ্যমে অর্জিত হয় না। বরং এটি তৈরি হয় পুরো শিক্ষা-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
যখন শিক্ষক মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে অনুসন্ধানভিত্তিক শিখন শেখান; যখন ভুলকে ব্যর্থতা নয়, শেখার সুযোগ হিসেবে দেখা হয়; যখন মূল্যায়ন শাস্তির বদলে উন্নয়নের সহায়ক হয়; যখন প্রত্যেক শিশু শ্রেণিকক্ষে সম্মান ও অংশগ্রহণের সুযোগ পায়, তখনই শেখা সত্যিকার অর্থে আনন্দময় হয়ে ওঠে। অর্থাৎ লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস কোনো একক বইয়ের বিষয় নয়। এটি হওয়া উচিত পুরো শিক্ষাক্রম, পাঠ্যপুস্তক, শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও শিক্ষকতার দর্শনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এ কারণেই প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টার বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস শুধু একটি বইয়ের বিষয় নয়। গণিত, বাংলা, ইতিহাস, ভূগোলসহ সব বিষয়ে এই দর্শনের প্রতিফলন থাকা উচিত। এ উপলব্ধিই প্রকৃতপক্ষে শিক্ষা সংস্কারের মূল দর্শন হওয়া উচিত।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষাক্রম সংস্কার কখনও শুধু বই পরিবর্তনের মাধ্যমে সফল হয় না। শিক্ষকই শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের কেন্দ্রীয় শক্তি। নতুন চারটি বিষয় কে পড়াবেন? খেলাধুলা শেখানোর জন্য কী প্রস্তুতি রয়েছে? সংস্কৃতি বিষয়ে শিক্ষকরা কতটা দক্ষ? কারিগরি শিক্ষার প্রাথমিক ধারণা কীভাবে দেওয়া হবে? আনন্দময় শিখন কীভাবে শ্রেণিকক্ষে বাস্তবায়িত হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর না থাকলে নতুন বই যোগ করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।
একইভাবে শিক্ষার জন্য শুধু বই-ই যথেষ্ট নয়। খেলাধুলার জন্য প্রয়োজন মাঠ ও সরঞ্জাম। সংস্কৃতি শেখাতে প্রয়োজন সংগীত, নাটক, জাদুঘর, স্থানীয় ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক চর্চার সঙ্গে সংযোগ। কারিগরি শিক্ষার জন্য প্রয়োজন হাতে-কলমে শেখার সুযোগ আর আনন্দময় শিক্ষার জন্য প্রয়োজন সহানুভূতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শ্রেণিকক্ষ।
এখনও সময় আছে এ উদ্যোগকে আরও কার্যকর করার। তার জন্য দ্রুততা নয়; গুণগত মানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অবাস্তব সময়সীমার মধ্যে পাঠ্যবই তৈরির চাপ দিলে ভালো উদ্দেশ্যও কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হতে পারে।
শিক্ষাক্রম সংস্কারের সাফল্য কয়েক মাসে নয়, কয়েক দশকে মূল্যায়িত হয়। একটি ভালো পাঠ্যবই অনেক বছর ধরে লাখো শিক্ষার্থীর শেখাকে প্রভাবিত করতে পারে। আবার তাড়াহুড়া করে তৈরি একটি বই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিভ্রান্তিরও কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় খেলাধুলা, সংস্কৃতি, কারিগরি শিক্ষা, সৃজনশীলতা এবং শিক্ষার্থীর সামগ্রিক বিকাশের ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন– এ নিয়ে দ্বিমত নেই। কিন্তু অর্থবহ শিক্ষা সংস্কার মানে শুধু নতুন বিষয় বা নতুন পাঠ্যবই যোগ করা নয়। এ জন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিত শিক্ষাক্রম, মানসম্মত পাঠ্যপুস্তক, দক্ষভাবে প্রস্তুত শিক্ষক, উপযুক্ত শিক্ষাসামগ্রী এবং বাস্তবসম্মত বাস্তবায়ন পরিকল্পনা।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি নতুন পাঠ্যবইয়ের প্রয়োজন আছে কিনা, সেটি নয়। অবশ্যই আছে। প্রশ্ন হলো, আগামী শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার আগে হাতে থাকা অল্প কয়েক মাসের মধ্যে আমরা কি সত্যিই এমন মানসম্পন্ন বই তৈরি করতে পারব, যা শিশুদের শেখাকে আরও আনন্দময়, অর্থবহ ও কার্যকর করে তুলবে?
মোশাররফ তানসেন: পিএইচডি গবেষক এবং মালালা ফান্ডের সাবেক কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ
- বিষয় :
- শিক্ষাবর্ষ